৪০ কিলোমিটারজুড়ে তিস্তা নদীর বিস্তার কুড়িগ্রাম জেলায়। অথচ নেই কোনো মাছের অভয়াশ্রম। তার ওপর কারেন্ট শক আর চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে নির্বিচারে চলছে মাছ শিকার। এতে হারিয়ে গেছে অনেক দেশি প্রজাতির মাছ। জেলেরা বলছেন, গত দুই দশকে তিস্তায় অন্তত ১০ প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে চার-পাঁচটি প্রজাতির।
তাও সামান্য। এ নদীর বিখ্যাত বৈরালী মাছও এখন দুষ্প্রাপ্য। সারা রাত জাল টেনে কোনো কোনোদিন মিলছে না ১০০ টাকার মাছও। তাই তিস্তানির্ভর জেলেদের জীবনে চরম অভাব। ধার-দেনা আর দাদনের ফাঁদে পড়ে তারা দিশাহারা।
সরেজমিনে তিস্তাপারের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামের জেলে পল্লীতে গিয়ে জানা যায় জেলেদের জীবনের নানা সংকটের কথা। অনেক জেলে পেশা বদল করলেও তিস্তাপারের ১০ গ্রামের মধ্যে টিকে রয়েছে জেলে পল্লীটি। অর্ধশত জেলে পরিবারের বাস এখানে। তাও অন্তত ২০টি পরিবার বাস বাস করেন অন্যের দেওয়া জমিতে।
তিস্তার ভাঙনে সাতবার ভিটেমাটি হারিয়ে বর্তমানে বিদ্যানন্দ জেলেপাড়ায় বাস করছেন ষাটোর্ধ অতুল চন্দ্র দাস। নদীর কিনার ঘেঁষে ঘর বেঁধেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা রাজেন চন্দ্রের দেওয়া জমিতে তোলা জীর্ণ চালাঘর তার বসতি। তিন পুরুষের পেশা মাছধরা। তিস্তার বুকে জাল টেনে কেটেছে দীর্ঘজীবন। এখন শরীরে বয়সজনিত ক্লান্তি। মাঝেমধ্যে দুই ছেলের সঙ্গে জাল-নৌকা নিয়ে ছুটে যান তিস্তার টানে।
ছেলে সবুজ দাস ও রঞ্জিত দাস রাতভর তিস্তার বুকে ভেসে বেড়ান, কিন্তু মাছের আকালে এ পেশা হুমকির মুখে। তারা জানান, কোনো কোনো দিন এক কেজির বেশি মাছ পাওয়া যায় না। তাই কার্তিক থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত আধপেটা খেয়ে কাটাতে হয় ।
সবুজ ও রঞ্জিত আরো জানান, প্রতি হাজারে মাসে ১০০ টাকা সুদ দেওয়ার চুক্তিতে ১০ হাজার টাকা দাদন নিয়ে নৌকা মেরামত করেছেন এবার, কিন্তু নদীতে মাছের আকালে সুদ-আসল পরিশোধে বাড়ছে উদ্বেগ।
সবুজ চন্দ্র দাসের স্ত্রী সাধনা দাসের ভাষ্য, আয় কমে গেছে। তার ওপর দুই সন্তানের লেখাপড়া ও রোগব্যাধির চিকিৎসায় মহাজনের কাছে ২০ হাজার টাকা দাদন নিয়েছেন তারা, কিন্তু চার কিস্তি দিয়ে আর পরিশোধ করতে পারেননি। এরপর পূজার সময় নেন আরো ১০ হাজার টাকা। এইসব ঋণ এখন গলার কাঁটা হয়ে যাচ্ছে। খেদ নিয়ে সাধনা বলেন, ‘এলা তিস্তার ওপরা ভরসা করি হামার জীবন চলে না।’
প্রতিবেশী সন্দেশ দাস সুদে ৯০ হাজার টাকা দাদন নিয়ে এবছর নৌকা মেরামত ও নতুন জাল কিনেছেন, কিন্তু নদীতে মাছ না থাকায় টাকা শোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। খাবারের সংস্থান ছাড়াও প্রতিবছর নৌকা মেরামত ও জাল কেনা বাবদ মোটা অংকের টাকা খরচ হয় তাদের। তাই জেলে পরিবারের দায়-দেনা যায় না।
সন্দেশের স্ত্রী মুক্তা রানী দাস বলেন, ‘নদীততো মাছ নাই, প্যাটতো সেটা মানে না। সুদের ট্যাকা কেমন করি শোধ করমো, সেই চিন্তায় নিন্দ আইসে না।’
জেলেরা জানান, বছর দশেক আগে তিস্তায় রুই, কাতলা, আইর, বোয়াল, চিতল, চেলা, বৈরালী, উপুর চৌকা, ঢুরুয়া, বাইম, শোল, পুঁটি, টেংরা, ঘারুয়া, বাছা, চিংড়ি ও ইলিশসহ নানা প্রজাতির প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। ২০২২ সালের হরকা বানের ঘোলা পানিতে অনেক মাছ মরে যায়। এরপর মাছের উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও গত দুই বছর ধরে মাছের আকাল চরম আকার ধারণ করেছে। এখন অল্প পরিমাণে বৈরালী, চেলা, পুঁটি, টেংরা ছাড়া অন্য কোনো মাছের দেখা মেলে না।
বাহাদুর দাস নামের আরেক জেলে জানান, দুপুর ২টার পর জাল-নৌকা নিয়ে তিস্তায় নামেন তিনি। সারা রাত নদীতে মাছ ধরে সকালে ফেরেন ঘরে, কিন্তু সুবিধা হয় না। মাছ বিক্রি করে এমনও দিন যায় ১০০ টাকাও আয় হনি।
বৃদ্ধ জেলে বুদা দাসের ভাষ্য অনুযায়ী, ১০-১২ প্রজাতির মাছ নদী থেকে হারিয়ে গেছে। আগে চেচা, ঘাইয়াল, ব্যার, মুঠা, আউংটা জালের ব্যবহার হতো; এখন ব্যার আর চেচা জাল ছাড়া ব্যবহার করা হয় না। তিনি বলেন, ‘ওমারে প্যাট চলে না, মোক পোষে কেমন করি।’
জেলেদের অভিযোগ, চর এলাকায় অপেশাদার মাছ শিকারিরা ব্যাপকভাবে কারেন্ট জাল ব্যবহার করছে। এতে মাছের বংশ ধ্বংস হচ্ছে। জেলেরা এসব অমৎস্যজীবী ‘বাঙাল’ বা ‘ভাটিয়া’র ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। জীবন-জীবিকা হুমকিতে পড়লেও জেলেরা কখনো এসব নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করেন না। তাছাড়া জলভাগের একটা বড় অংশ ‘অমৎস্যজীবীরা’ দখল করে জেলেদের মাছ ধরতে বাধা দেয়। তাই মাছ ধরার জায়গাও তাদের জন্য ছোট হয়ে গেছে।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় আটটি মাছের অভয়াশ্রম রয়েছে। তবে এর একটিও তিস্তায় নেই। অথচ জেলায় তিস্তা নদী ৪০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। ব্রহ্মপুত্রে হাতিয়া ও শাখাহাতি ছাড়াও ছয়টি বিল ও ছড়ায় এই অভয়াশ্রমে দেশীয় মাছ সংরক্ষণ করে বংশ বিস্তারে সহায়তা করা হয়, কিন্তু তিস্তায় এ ধরনের কোনো মাছের অভয়াশ্রম নেই। তাই তিস্তায় বিচরণকারী মাছের প্রজাতি রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেই।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, দেশীয় মাছের প্রজাতি রক্ষায় তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রকেন্দ্রিক একটি বড় আকারের অভয়াশ্রম গড়ে তোলার প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
তাও সামান্য। এ নদীর বিখ্যাত বৈরালী মাছও এখন দুষ্প্রাপ্য। সারা রাত জাল টেনে কোনো কোনোদিন মিলছে না ১০০ টাকার মাছও। তাই তিস্তানির্ভর জেলেদের জীবনে চরম অভাব। ধার-দেনা আর দাদনের ফাঁদে পড়ে তারা দিশাহারা।
সরেজমিনে তিস্তাপারের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামের জেলে পল্লীতে গিয়ে জানা যায় জেলেদের জীবনের নানা সংকটের কথা। অনেক জেলে পেশা বদল করলেও তিস্তাপারের ১০ গ্রামের মধ্যে টিকে রয়েছে জেলে পল্লীটি। অর্ধশত জেলে পরিবারের বাস এখানে। তাও অন্তত ২০টি পরিবার বাস বাস করেন অন্যের দেওয়া জমিতে।
তিস্তার ভাঙনে সাতবার ভিটেমাটি হারিয়ে বর্তমানে বিদ্যানন্দ জেলেপাড়ায় বাস করছেন ষাটোর্ধ অতুল চন্দ্র দাস। নদীর কিনার ঘেঁষে ঘর বেঁধেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা রাজেন চন্দ্রের দেওয়া জমিতে তোলা জীর্ণ চালাঘর তার বসতি। তিন পুরুষের পেশা মাছধরা। তিস্তার বুকে জাল টেনে কেটেছে দীর্ঘজীবন। এখন শরীরে বয়সজনিত ক্লান্তি। মাঝেমধ্যে দুই ছেলের সঙ্গে জাল-নৌকা নিয়ে ছুটে যান তিস্তার টানে।
ছেলে সবুজ দাস ও রঞ্জিত দাস রাতভর তিস্তার বুকে ভেসে বেড়ান, কিন্তু মাছের আকালে এ পেশা হুমকির মুখে। তারা জানান, কোনো কোনো দিন এক কেজির বেশি মাছ পাওয়া যায় না। তাই কার্তিক থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত আধপেটা খেয়ে কাটাতে হয় ।
সবুজ ও রঞ্জিত আরো জানান, প্রতি হাজারে মাসে ১০০ টাকা সুদ দেওয়ার চুক্তিতে ১০ হাজার টাকা দাদন নিয়ে নৌকা মেরামত করেছেন এবার, কিন্তু নদীতে মাছের আকালে সুদ-আসল পরিশোধে বাড়ছে উদ্বেগ।
সবুজ চন্দ্র দাসের স্ত্রী সাধনা দাসের ভাষ্য, আয় কমে গেছে। তার ওপর দুই সন্তানের লেখাপড়া ও রোগব্যাধির চিকিৎসায় মহাজনের কাছে ২০ হাজার টাকা দাদন নিয়েছেন তারা, কিন্তু চার কিস্তি দিয়ে আর পরিশোধ করতে পারেননি। এরপর পূজার সময় নেন আরো ১০ হাজার টাকা। এইসব ঋণ এখন গলার কাঁটা হয়ে যাচ্ছে। খেদ নিয়ে সাধনা বলেন, ‘এলা তিস্তার ওপরা ভরসা করি হামার জীবন চলে না।’
প্রতিবেশী সন্দেশ দাস সুদে ৯০ হাজার টাকা দাদন নিয়ে এবছর নৌকা মেরামত ও নতুন জাল কিনেছেন, কিন্তু নদীতে মাছ না থাকায় টাকা শোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। খাবারের সংস্থান ছাড়াও প্রতিবছর নৌকা মেরামত ও জাল কেনা বাবদ মোটা অংকের টাকা খরচ হয় তাদের। তাই জেলে পরিবারের দায়-দেনা যায় না।
সন্দেশের স্ত্রী মুক্তা রানী দাস বলেন, ‘নদীততো মাছ নাই, প্যাটতো সেটা মানে না। সুদের ট্যাকা কেমন করি শোধ করমো, সেই চিন্তায় নিন্দ আইসে না।’
জেলেরা জানান, বছর দশেক আগে তিস্তায় রুই, কাতলা, আইর, বোয়াল, চিতল, চেলা, বৈরালী, উপুর চৌকা, ঢুরুয়া, বাইম, শোল, পুঁটি, টেংরা, ঘারুয়া, বাছা, চিংড়ি ও ইলিশসহ নানা প্রজাতির প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। ২০২২ সালের হরকা বানের ঘোলা পানিতে অনেক মাছ মরে যায়। এরপর মাছের উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও গত দুই বছর ধরে মাছের আকাল চরম আকার ধারণ করেছে। এখন অল্প পরিমাণে বৈরালী, চেলা, পুঁটি, টেংরা ছাড়া অন্য কোনো মাছের দেখা মেলে না।
বাহাদুর দাস নামের আরেক জেলে জানান, দুপুর ২টার পর জাল-নৌকা নিয়ে তিস্তায় নামেন তিনি। সারা রাত নদীতে মাছ ধরে সকালে ফেরেন ঘরে, কিন্তু সুবিধা হয় না। মাছ বিক্রি করে এমনও দিন যায় ১০০ টাকাও আয় হনি।
বৃদ্ধ জেলে বুদা দাসের ভাষ্য অনুযায়ী, ১০-১২ প্রজাতির মাছ নদী থেকে হারিয়ে গেছে। আগে চেচা, ঘাইয়াল, ব্যার, মুঠা, আউংটা জালের ব্যবহার হতো; এখন ব্যার আর চেচা জাল ছাড়া ব্যবহার করা হয় না। তিনি বলেন, ‘ওমারে প্যাট চলে না, মোক পোষে কেমন করি।’
জেলেদের অভিযোগ, চর এলাকায় অপেশাদার মাছ শিকারিরা ব্যাপকভাবে কারেন্ট জাল ব্যবহার করছে। এতে মাছের বংশ ধ্বংস হচ্ছে। জেলেরা এসব অমৎস্যজীবী ‘বাঙাল’ বা ‘ভাটিয়া’র ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। জীবন-জীবিকা হুমকিতে পড়লেও জেলেরা কখনো এসব নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করেন না। তাছাড়া জলভাগের একটা বড় অংশ ‘অমৎস্যজীবীরা’ দখল করে জেলেদের মাছ ধরতে বাধা দেয়। তাই মাছ ধরার জায়গাও তাদের জন্য ছোট হয়ে গেছে।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় আটটি মাছের অভয়াশ্রম রয়েছে। তবে এর একটিও তিস্তায় নেই। অথচ জেলায় তিস্তা নদী ৪০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। ব্রহ্মপুত্রে হাতিয়া ও শাখাহাতি ছাড়াও ছয়টি বিল ও ছড়ায় এই অভয়াশ্রমে দেশীয় মাছ সংরক্ষণ করে বংশ বিস্তারে সহায়তা করা হয়, কিন্তু তিস্তায় এ ধরনের কোনো মাছের অভয়াশ্রম নেই। তাই তিস্তায় বিচরণকারী মাছের প্রজাতি রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেই।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, দেশীয় মাছের প্রজাতি রক্ষায় তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রকেন্দ্রিক একটি বড় আকারের অভয়াশ্রম গড়ে তোলার প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন