সবজি কিনতেই পকেট ফাঁকা, মাছ-মাংস নাগালের বাইরে

আপলোড সময় : ২৭-১০-২০২৬ ০৩:৩৪:৪০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৭-১০-২০২৬ ০৩:৩৪:৪০ অপরাহ্ন
সবজি কিনতেই বাজারের বড় অংশের টাকা শেষ, মাছ-মাংস কেনার সামর্থ্য থাকছে না অনেকের। শীতকালীন সবজি বাজারে উঠতে শুরু করলেও যশোরে দাম এখনো চড়া। সেই সঙ্গে মাছ, মাংস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। সংসারের খরচ সামলাতে কেউ কমাচ্ছেন মাছ-মাংস কেনা, কেউবা কাটছাঁট করছেন দৈনন্দিন বাজারের তালিকা। ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে নিয়মিত তদারকির অভাব ও ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে দাম কমছে না।

যশোর শহরের বড়বাজার, পালবাড়ি ও চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

ক্রেতাদের ভাষ্য, শীতের মৌসুমে এ সময়ে অনেক সবজির দাম কেজিপ্রতি ২০-৩০ টাকার মধ্যে থাকার কথা। কিন্তু এবার বেশিরভাগ সবজিই বিক্রি হচ্ছে এর চেয়ে বেশি দামে। কয়েক ধরনের সবজি কিনতেই বাজারের বড় অংশের টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে চাল, ডাল, মাছসহ অন্যান্য পণ্য কেনার ক্ষেত্রে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। ক্রেতাদের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতাদের কারসাজির কারণে দাম কমছে না।

শীতের আগমনী সবজি হিসেবে বাজারে উঠতে শুরু করেছে বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, মূলা ও গাজরসহ বিভিন্ন পণ্য। তবে মৌসুমের শুরুতেই এসব সবজি বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছু সবজির দাম বেড়েছে বলেও জানিয়েছেন ক্রেতারা। বাজারে প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল প্রায় ৬০ টাকা। এছাড়া বরবটি ৮০, টমেটো ১৪০, কচুর লতি ৬০, কাঁচকলা ৪০, পটল ৪০, বাঁধাকপি ৮০, আমড়া ৫০, ফুলকপি ১২০, ওল ৬০, উচ্ছে ১২০, করলা ৬০, কচুর মুখি ৬০, ঢেড়স ৬০, জলপাই ৬০ ও আলু ২৫ ও পুঁইশাকের আঁটি ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের দাম কেজিপ্রতি ১০০-১২০ টাকা এবং ধনেপাতা ১৫০ টাকা।

যশোর বড়বাজারের সবজি ব্যবসায়ী নিতাই চক্রবর্তী বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার সবজির দাম বেশি। তবে কিছু সবজির দাম ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তার ধারণা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মূলা, গাজর ও শিমের দাম সহসা খুব বেশি কমবে না।

মসলার বাজারে প্রতি কেজি আদা ২০০ টাকা, পেঁয়াজ ৫০-৬০, দেশি রসুন ১২০-১৪০ এবং আমদানি করা রসুন ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শুকনো মরিচের দাম কেজিপ্রতি ৪৫০ টাকা।

ডালের মধ্যে মুগ ১৮০, সরু মসুর ১৫০, মাঝারি মসুর ১০০, ছোলা ১২০ এবং বুটের ডাল ৬৫ টাকা কেজি। চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকা কেজিতে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের লিটার ১৯৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল কেজি ২০৫ টাকা।

তবে গত সপ্তাহের তুলনায় ডিমের দাম কিছুটা কমেছে। প্রতি ডিমে ৫০ পয়সা কমে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকায়।

পালবাড়ি কাঁচাবাজারের মুদি ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, তারা যে দামে পণ্য কেনেন, সে অনুযায়ী বিক্রি করেন। তার দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে।

মাছের পাশাপাশি মাংসের বাজারেও স্বস্তি নেই। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, কোনো কোনো সময় দাম উঠছে ২২০ টাকায়। সোনালি মুরগি ৩২০, লেয়ার মুরগি ৩৪০ এবং দেশি মুরগি ৬৫০ টাকা কেজি। পাতি হাঁস ৪০০, রাজহাঁস ৫০০ ও বেলজিয়াম হাঁস ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের কেজি ৭৮০-৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা। ফলে অনেক পরিবারের নিয়মিত খাদ্যতালিকা থেকে গরু ও খাসির মাংস বাদ পড়ছে।

বাজারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গরুর মাংসের কেজি ছিল ৬৫০-৭০০ টাকা, খাসির মাংস ১ হাজার টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৬০-১৭০ টাকা, সোনালি মুরগি ২৫০-৩০০ টাকা, লেয়ার মুরগি ৩৩০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৫০০ টাকা।

২০২৫ সালে গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে থেকে ৭০০-৭৫০ টাকা, খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৭০-১৮০ টাকা, সোনালি মুরগি ২৮০-২৯০ টাকা, লেয়ার মুরগি ৩০০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৫৫০ টাকা কেজি দরে।

গরুর মাংস বিক্রেতা ফজলুর রহমান বলেন, ভারত থেকে গরু আমদানি না হওয়ায় দাম বেশি। আরেক বিক্রেতা রনি হোসেনের ভাষ্য, ফসলি জমি কমে যাওয়ায় গবাদিপশুর ঘাস সহজে পাওয়া যায় না। গরু ও খাসি পালনে খরচ বেড়েছে। খামারিদের কাছ থেকে বেশি দামে পশু কিনতে হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

গৃহিণী জেবা রহমান বলেন, দাম বেশি হওয়ায় পারিবারিক অনুষ্ঠান বা উৎসব ছাড়া এখন আর আগের মতো গরু ও খাসির মাংস কেনা হয় না। পালবাড়ি এলাকার বাসিন্দা খায়ের মোল্লা বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই আয়ের সব টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। সংসার চালাতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

মাছ কিনতে গিয়েও বিপাকে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। বাজারে প্রতি কেজি সিলভার কার্প ২৩০ টাকা, রুই ৩২০, তেলাপিয়া ২২০, শিং মাছ ৩২০ থেকে ৪৫০, ছোট শোল ৪৫০, টাকি ৩৫০-৫২০, চিংড়ি ৮০০-১,৩০০, পাবদা ৩২০, পুঁটি ২৪০, দেশি কই ৯০০, গ্লাসকার্প ৩০০ এবং পাঙ্গাস ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেলে মাছের কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ফোলই মাছ ৬০০ টাকা।

মাছ কিনতে আসা দিনমজুর রহমত আলী বলেন, দাম বেশি হওয়ায় মাছ না কিনেই ফিরতে হয়েছে তাকে। সবজি কিনতেই টাকা শেষ হয়ে গেছে। মাছের দাম তার বাজেটের বাইরে।

মাছ বিক্রেতা রানা আহমেদ বলেন, বর্তমানে মাছের দাম কিছুটা বেশি। তবে বাজারে দেশি মাছের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যে দাম কমতে পারে বলে তিনি আশা করেন।

চালের বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৫৫ টাকা, বাসমতি ৮০, মিনিকেট ৬০, পাইজাম ৫০, আটাশ ৫৫, নাজিরশাইল ১০০ এবং জিরা মিনিকেট ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

যশোরের বড়বাজারে সবজি কিনতে আসা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী বকুল হোসেন বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকির অভাবে কিছু আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতা ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন বলে তার ধারণা। বাজারে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) যশোর জেলা শাখার সভাপতি আব্দুর রকিব সরদার অপু বলেন, এত বড় জেলায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে মাত্র ২ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। এ জনবল দিয়ে ভোক্তাদের অধিকার নিশ্চিত করা কঠিন। অভিযানে জরিমানা করা হলে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটে যাওয়াও ইতিবাচক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার অভিযোগ, সম্প্রতি যশোরে ক্যাবের প্রতিনিধিদের ওপরও মাংস ব্যবসায়ীরা চড়াও হয়েছিলেন।

তিনি বলেন, সিন্ডিকেট পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এজন্য সরকারকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি পাইকার, মধ্যস্বত্বভোগী, খুচরা ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যশোরের সহকারী পরিচালক মো. সেলিমুজ্জামান বলেন, এককভাবে অধিদপ্তরের পক্ষে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে নিয়মিত বাজার তদারকি চলছে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হচ্ছে।

যশোরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা বলেন, বাজারে পণ্যের দাম আগের তুলনায় বেশি। নিয়মিত তদারকি চলছে। জেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে বাজার তদারকি আরও জোরদার করা হবে।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :