কলাপাড়ার উপকূলে সবুজ দেয়াল গড়ে তুলছে বনবিভাগ

আপলোড সময় : ২৪-১০-২০২৬ ০৪:৫১:৪৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৪-১০-২০২৬ ০৪:৫১:৪৯ অপরাহ্ন
কুয়াকাটায় সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের তাণ্ডবে বিলীন হলেও ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনায়ন সৃজনে গঙ্গামতি ও কাউয়ার চর সৈকতে নতুন সবুজ দেয়াল তৈরির স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। লক লক করে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির ঝাউ, ছইলা, কেওড়া প্রজাতির গাছগুলো বেড়ে উঠেছে। ক্রমশ ধূ-ধূ বালুর চরে বিবর্ণ এলাকায় সবুজের আচ্ছাদন তৈরি হচ্ছে। গত আট বছরে অন্তত ৮৫ একর চরভূমিতে বেড়ে উঠেছে ঝাউসহ ম্যানগ্রোভ প্রজাতির হাজার হাজার গাছ। সাগরপাড়ের ওই এলাকার মানুষ বনাঞ্চল বিলীনের শঙ্কার মধ্যেও নতুন করে আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন।

ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের গ্রাসে থাকা জনপদ কলাপাড়ার উপকূলীয় মানুষ ঘুর্ণিঝড়ের সময় মূলত ম্যানগ্রোভ-ননম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনাঞ্চলকে অবলম্বন করে জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে রক্ষা পেয়ে আসছে। প্রাথমিকভাবে এই সবুজ দেয়াল জলোচ্ছ্বাসের ঝাপটা বাধাগ্রস্ত করে। প্রকৃতির বৈরি আচরণ; সাগরের বিক্ষুব্ধ তাণ্ডবে কুয়াকাটার গোটা সৈকতের প্রায় ৩৪ কিলোমিটার এলাকার দুই তৃতীয়াংশ ম্যানগ্রোভ প্রজাতির এই সবুজ দেয়াল বিলীন হয়ে গেছে। দীর্ঘ কুড়ি বছরে সাগরের জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডব গিলে খেয়েছে হাজার হাজার ম্যানগ্রোভ ননম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ। বলতে গেলে কুয়াকাটা, খাজুরা, ধুলাসার এবং গঙ্গামতির সংরক্ষিত বনাঞ্চল এখন চরম হুমকিতে রয়েছে। এরই মধ্যে গঙ্গামতির দক্ষিণ পূর্বদিকটায় ক্রমশ চর জেগে উঠেছে। রাবনাবাদের মোহনা থেকে বিস্তীর্ণ এলাকা চরভূমিতে পরিণত হচ্ছে। আর এই চরভূমিতে বনবিভাগের সৃজিত ঝাউ প্রজাতির  বনায়নের পরিধি ক্রমশ বাড়ছে। 

বনবিভাগ মহিপুর রেঞ্জের গঙ্গামতির বিট অফিসার আলমগীর হোসেন জানান, আটবছর আগে বনবিভাগের উদ্যোগে কাউয়ার চরে প্রায় ৩২ একর নতুন ঝাউবাগান করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন নদীতীরে ছইলা-কেওড়া ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছের চারা (মাউন্ট বাগান) আরও ৫০ একর ভূমিতে লাগানো হয়েছে। এসব গাছ এখন বেড়ে উঠেছে। এছাড়া ৭-৮ বছর আগে গঙ্গামতির তিনটি স্পটে প্রায় এক শ’ একর সবুজ বনায়ন করা হয়। ওইসব গাছ এখন বড় হয়ে গেছে। তবে আমফানে অনেকটা ক্ষতি হয়েছে, সেসব এলাকায় নতুন নতুন চারা লাগানো হয়েছিল। এছাড়াও কলাপাড়া ক্যাম্পের উদ্যোগে ৮ বছর আগে আন্ধারমানিক ও সোনাতলা নদী তীরে জেগে ওঠা চরে পাঁচটি লাইন করে প্রায় ৮৩ কিলোমিটার এলাকা ম্যানগ্রোভ প্রজাতির ছইলা, কেওড়া ও গোল গাছের চারা রোপন করা হয়েছে। 

উল্লেখ্য, কলাপাড়া উপজেলায় বনবিভাগের মোট আয়তন ১০ হাজার ১৭৭ দশমিক ১১ একর। এর মধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে তিন হাজার নয় শ’ ৭৮ দশমিক ৩৩ একর। যার মধ্যে কুয়াকাটা বিটে ১৯৩ একর। কুয়াকাটা ক্যাম্পের অধীন ১৮১৮ দশমিক ৯৩ একর। গঙ্গামতি ক্যাম্পে ১১২৮ একর। খাজুরা ক্যম্পে ৩৪৬ দশমিক ৮৭ একর এবং ধুলাসার ক্যম্পের অধীন ৪৬১ দশমিক ৫৩ একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকার কথা। এছাড়াও ফুলবুনিয়া, বালিয়াতলী ও লালুয়া বাগান কেন্দ্র করা হয়। যেখানে বনায়ন করা হয়।

বিভিন্ন তথ্যসূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ১৯৫৭ সাল থেকে সাগরপাড়ের এ জনপদে বনায়নের কাজ শুরু হয়। ম্যানগ্রোভ ও ননম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনায়নের কাজ চলতে থাকে। 

তথ্যমতে, ষাটের দশকের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত কৃষিকাজের স্বার্থে নদী ও সাগরের পাড় ঘিরে বেড়িবাঁধ করা হয়। লোনা পানির কবল থেকে মানুষ ও তার জীবন-সম্পদ রক্ষায় এ বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ভিতরের খালের সংযোগস্থলে করা হয় স্লুইসগেট। এরপরে বেড়িবাঁধের বাইরে সবচেয়ে বেশি করা হয় গোলগাছের বাগান। সবই ছিল ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বাগান। ওই সময় থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত হিসাব অনুসারে কলাপাড়ায় ৪৬ একর জমিতে সেগুন গাছ। নারিকেল ২১০ একর। গোলপাতা ২৭৯৪ একর। কড়ই বাগান ৬২৭ একর। গেওয়া বাগান ৩২০ একর। হোগলা পাতা ৪০ একর। সুন্দরী পশুর কেওড়া ১০৫ একর। এছাড়া ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ লাগানো হয় ১৯২৯ একর এবং ননম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ লাগানো হয় ৩১২ একর। পরবর্তীতে স্ট্রীপ সংযোগ সড়কে এবং স্ট্রিপ বাঁধ বাগান করা হয় অন্তত ১১৫ কিলোমিটার। এরপরে শত শত কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সামাজিক বনায়ন করা হয়। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। 

তবে নদী তীরের জেগে ওঠা চরভূমি বনবিভাগকে হস্তান্তর না করায় এসব বাগানের হাজার হাজার গাছ এক শ্রেণির বনদস্যুরা কেটে ফেলে। যেমন মধুখালী শাখা নদীর দুই দিকের প্রাচীন ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছগুলো বনদস্যুরা গিলে খেয়েছে। গোটা চরভূমি বনবিভাগকে হস্তান্তর প্রক্রিয়া ভূমি প্রশাসনের উদাসীনতায় বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো এসব চরভূমি চাষযোগ্য খাস জমি দেখিয়ে বন্দোবস্ত দেয়ায় বেহাত হয়ে গেছে। 

আর বনাঞ্চল হয়েছে বিরানভূমি। তবে নতুন করে কাউয়ার এবং গঙ্গামতির চরে এবং আন্ধারমানিক নদী তীরে যেভাবে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনায়ন করা হয়েছে তাতে সাগরপাড়ের মানুষ আবার নতুন করে সবুজ দেয়াল গড়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছেন।

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এইচবি/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :