প্রকৃতির নিয়মে ঋতুবদলের পালায় চলছে হেমন্ত। কার্তিকের মাঝামাঝি সময়েই প্রকৃতির রূপবদলের খেলা শুরু হয়েছে দেশের সর্ব উত্তরের জেলাগুলোতে। ভোরের হালকা কুয়াশা, রাতের শীতল বাতাস, শিশিরভেজা ঘাস আর খেজুরগাছের ডালে ডালে রস সংগ্রহের হাঁড়ি বাঁধার প্রস্তুতি জানান দিচ্ছে, দুয়ারে কড়া নাড়ছে শীত। আগমনী শীতের আমেজ ও চিরচেনা কাঞ্চনজঙ্ঘার নৈসর্গিক রূপ দেখতে দেশজুড়ে রূপপ্রেমী মানুষের ঢল নেমেছে এই সীমান্তঘেঁষা জনপদে।
ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়ের মতো দেশের সর্ব উত্তরের জেলাগুলোতে ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে আগেই অনুভূত হয়। এখন দিনের বেলায় রোদ থাকলেও সন্ধ্যা ও ভোরে আবহাওয়ায় আসে শীতলতার ছোঁয়া। ভোরের দিকে কুয়াশার দেখা মিলছে। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা কেটে গিয়ে দেখা দিচ্ছে ঝলমলে রোদ। তবে সন্ধ্যার পর আবারও অনুভূত হচ্ছে হালকা ঠান্ডা। সকালে বা সন্ধ্যায় ঘরের বাইরে বের হলে হালকা গরম পোশাক ব্যবহার করতে হচ্ছে। যদিও এখনো তীব্র শীত শুরু হয়নি, তবে প্রকৃতির এই পরিবর্তন জানান দিচ্ছে, দ্রুতই ধেয়ে আসছে শীতের দিন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে শীতের প্রভাব আরো স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে শীতের তীব্রতা বাড়তে পারে। তবে তাপমাত্রা ও শীতের প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ভর করবে আবহাওয়ার পরিবর্তনের ওপর।
কৃষিনির্ভর উত্তরের জনপদে এখন সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, হেমন্তের সময়েই উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। একদিকে চলছে আমন ধান কাটার উৎসব, অন্যদিকে বাজারে আসতে শুরু করেছে শীতকালীন সবজি। এ ছাড়া রবি ফসল চাষের প্রধান সময় শীতকাল। তাই উত্তরের কৃষকেরা রবি ফসলের চারা রোপণ ও বীজ বপনে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
কৃষিবিদ আলমগীর কবির বলেন, হেমন্তের এই আবহাওয়া উত্তরাঞ্চলের কৃষির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। হালকা শীত ও শিশিরভেজা মাটি আগাম শীতকালীন ফসলের ফলন বাড়াতে সাহায্য করে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবার অতিরিক্ত কুয়াশার মতো বড় কোনো জটিলতার সম্ভাবনা নেই। তাই আমরা আশা করছি, রবি মৌসুমে কৃষকেরা ভালো ফলন পাবেন।
শীতকে সামনে রেখে শীতকালীন পোশাক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রস্তুতিও চলছে বেশ জোরেশোরে। প্রসাধনীর দোকানগুলো সেজেছে মৌসুমি পণ্যে। স্থানীয় কাপড়ের দোকানগুলোতে উঠতে শুরু করেছে সোয়েটার, জ্যাকেট, চাদর ও কম্বলের মতো শীতকালীন পোশাক। শীত উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে বসতে শুরু করেছে অস্থায়ী মৌসুমি দোকান। হেমন্তের ঠান্ডা পরশ আসার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাকুরগাঁওয়ের ধুনকারদের (লেপ-তোশক তৈরির কারিগর) কাজের ব্যস্ততা তুঙ্গে উঠেছে। দোকানগুলোতে চলছে তুলা ধুনানো আর লাল কাপড় দিয়ে লেপ সেলাইয়ের কাজ। এখানকার পরিবারগুলোতেও শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। আলমারিতে তুলে রাখা লেপ-তোশক ও শীতের পোশাক বের করে রোদে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হালকা শীতের কাপড়ও ব্যবহার করছেন বাসিন্দারা।
ঠাকুরগাঁও জেলার কাপড় ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান বলেন, ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে চাহিদা অনুযায়ী প্রথম ধাপের শীতের সামগ্রী সরবরাহ করেছেন। হালকা শীতের কাপড়ের বেচাকেনাও শুরু হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী, গতবারের তুলনায় এবার শীতের পোশাকের দাম কিছুটা বেশি।
শীতকালে এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার পিঠাপুলি। শীত এলেই মোড়ে মোড়ে জমে ওঠে ধোঁয়া ওঠা পিঠাপুলির আয়োজন। এবারও চিরচেনা সেই রূপে সেজেছে এই অঞ্চলের শহর থেকে শুরু করে গ্রামীণ হাটবাজার। মোড়ে মোড়ে জমে উঠেছে ভাপা ও চিতই পিঠার দোকান। ফুটপাত ও দোকানগুলোতে বসানো ছোট ছোট চুলোয় চালের গুঁড়া, নতুন খেজুরের গুড় আর নারকেলের মিশ্রণে তৈরি হচ্ছে গরম-গরম ভাপা পিঠা। আর ধনেপাতা, সরিষা ও শুঁটকির ঝাল চাটনি দিয়ে পরিবেশন করা হচ্ছে গরম চিতই পিঠা।
পঞ্চগড় চৌরাস্তার বাসিন্দা মিলন ইসলাম জানান, কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় ধোঁয়া ওঠা পিঠার স্বাদ নিতে সন্ধ্যা হতেই এসব দোকানে ভিড় জমান সর্বস্তরের মানুষ। হেমন্ত বা শীতের হিমেল বাতাসে গরম পিঠার এই স্বাদ উত্তরের শীতের আমেজকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
শীতের আগমনে উত্তরের প্রকৃতি সেজেছে ভোরের শিশির আর কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহনীয় রূপে। ভোরের হালকা কুয়াশা, মৃদু হিমেল বাতাস ও পাতায় পাতায় শিশিরবিন্দুই প্রকৃতির বিশেষ অলংকার। সেই সঙ্গে হেমন্তের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্যমানতা। হেমন্তের মেঘমুক্ত নীল আকাশে সকালে সূর্য ওঠার পরপরই ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে দূর আকাশের বুকে ভেসে ওঠে বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। এরই মধ্যে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন। এতে স্থানীয় রিসোর্ট, হোটেল ও যানবাহন ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা বেড়েছে কয়েক গুণ।
পর্যটকেরা বলছেন, ভোরের আলো ফুটতেই হিমালয়ের বরফাচ্ছাদিত কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর সূর্যের সোনালি আলো এক অলৌকিক ক্যানভাস তৈরি করে। কাঞ্চনজঙ্ঘার এমন শুভ্র সৌন্দর্য আর ভোরের হিমেল বাতাস মন জুড়িয়ে দেয়।
শীতের এই আগমনী বার্তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ‘গাছ কাটা’ ও ‘রস সংগ্রহ’। এই জনপদের গ্রামীণ মেঠোপথ ধরে হাঁটলেই চোখে পড়ে খেজুরগাছ ঘিরে গাছিদের কর্মব্যস্ততা। শীতের কাঁপন পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই খেজুরগাছ প্রস্তুত বা চাঁচা-ছোলার কাজ শেষ হয়েছে। গাছের ডালে ডালে ঝুলতে শুরু করেছে মাটির হাঁড়ি। ভোরবেলায় গাছিরা হাঁড়িভর্তি মিষ্টি রস নামিয়ে আনছেন। কোথাও কোথাও আবার শুরু হয়ে গেছে সেই রসে গুড় ও পাটালি তৈরির উৎসব।
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ গাছি বিকাশ চন্দ্র জানান, হেমন্তের শুরুতে রসের মান খুব ভালো হয়। সূর্য ওঠার আগেই রস নামিয়ে বাজারে বিক্রি শুরু করি। শীত যত বাড়বে, রসের চাহিদা ও গুড় তৈরির ধুম তত বাড়বে।
প্রকৃতির আচরণের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে বাড়তে শুরু করেছে শিশু রোগীর সংখ্যা। সর্দি, কাশি ও হাঁপানিসহ বিভিন্ন ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আবু মো. রাজিব-উল-দোজা (তূর্য) বলেন, প্রতিবারই শীতের শুরু থেকে শিশু ও বৃদ্ধরা ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্তের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। এই সময় বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
প্রকৃতির নিয়ম মেনেই কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে উত্তরে শীত নামছে। কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপের জাদু, খেজুরের রসের মিষ্টি ঘ্রাণ আর সোনালি ধানের হাসিতে ঠাকুরগাঁও এখন উৎসবমুখর। ঋতুচক্রের এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকদের এই ভিড় প্রমাণ করে, উত্তরের হেমন্ত শুধু একটি ঋতু নয়, এটি গ্রামবাংলার এক প্রাণবন্ত উৎসবের নাম।
তবে রূপসী শীতের এই উৎসবের আড়ালে থেকে যায় কিছু বিষাদের সুরও। হিমেল হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে শীতকালীন রোগের প্রকোপ। কাজ কমে যাওয়া ও হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় দিনমজুর শ্রেণির মানুষের জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি তীব্র শীতে পর্যাপ্ত গরম পোশাকের অভাবে অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষদের পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। তাই এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসচেতনতা নিশ্চিত করাই হোক শীতের প্রকৃত সার্থকতা।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়ের মতো দেশের সর্ব উত্তরের জেলাগুলোতে ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে আগেই অনুভূত হয়। এখন দিনের বেলায় রোদ থাকলেও সন্ধ্যা ও ভোরে আবহাওয়ায় আসে শীতলতার ছোঁয়া। ভোরের দিকে কুয়াশার দেখা মিলছে। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা কেটে গিয়ে দেখা দিচ্ছে ঝলমলে রোদ। তবে সন্ধ্যার পর আবারও অনুভূত হচ্ছে হালকা ঠান্ডা। সকালে বা সন্ধ্যায় ঘরের বাইরে বের হলে হালকা গরম পোশাক ব্যবহার করতে হচ্ছে। যদিও এখনো তীব্র শীত শুরু হয়নি, তবে প্রকৃতির এই পরিবর্তন জানান দিচ্ছে, দ্রুতই ধেয়ে আসছে শীতের দিন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে শীতের প্রভাব আরো স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে শীতের তীব্রতা বাড়তে পারে। তবে তাপমাত্রা ও শীতের প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ভর করবে আবহাওয়ার পরিবর্তনের ওপর।
কৃষিনির্ভর উত্তরের জনপদে এখন সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, হেমন্তের সময়েই উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। একদিকে চলছে আমন ধান কাটার উৎসব, অন্যদিকে বাজারে আসতে শুরু করেছে শীতকালীন সবজি। এ ছাড়া রবি ফসল চাষের প্রধান সময় শীতকাল। তাই উত্তরের কৃষকেরা রবি ফসলের চারা রোপণ ও বীজ বপনে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
কৃষিবিদ আলমগীর কবির বলেন, হেমন্তের এই আবহাওয়া উত্তরাঞ্চলের কৃষির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। হালকা শীত ও শিশিরভেজা মাটি আগাম শীতকালীন ফসলের ফলন বাড়াতে সাহায্য করে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবার অতিরিক্ত কুয়াশার মতো বড় কোনো জটিলতার সম্ভাবনা নেই। তাই আমরা আশা করছি, রবি মৌসুমে কৃষকেরা ভালো ফলন পাবেন।
শীতকে সামনে রেখে শীতকালীন পোশাক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রস্তুতিও চলছে বেশ জোরেশোরে। প্রসাধনীর দোকানগুলো সেজেছে মৌসুমি পণ্যে। স্থানীয় কাপড়ের দোকানগুলোতে উঠতে শুরু করেছে সোয়েটার, জ্যাকেট, চাদর ও কম্বলের মতো শীতকালীন পোশাক। শীত উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে বসতে শুরু করেছে অস্থায়ী মৌসুমি দোকান। হেমন্তের ঠান্ডা পরশ আসার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাকুরগাঁওয়ের ধুনকারদের (লেপ-তোশক তৈরির কারিগর) কাজের ব্যস্ততা তুঙ্গে উঠেছে। দোকানগুলোতে চলছে তুলা ধুনানো আর লাল কাপড় দিয়ে লেপ সেলাইয়ের কাজ। এখানকার পরিবারগুলোতেও শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। আলমারিতে তুলে রাখা লেপ-তোশক ও শীতের পোশাক বের করে রোদে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হালকা শীতের কাপড়ও ব্যবহার করছেন বাসিন্দারা।
ঠাকুরগাঁও জেলার কাপড় ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান বলেন, ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে চাহিদা অনুযায়ী প্রথম ধাপের শীতের সামগ্রী সরবরাহ করেছেন। হালকা শীতের কাপড়ের বেচাকেনাও শুরু হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী, গতবারের তুলনায় এবার শীতের পোশাকের দাম কিছুটা বেশি।
শীতকালে এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার পিঠাপুলি। শীত এলেই মোড়ে মোড়ে জমে ওঠে ধোঁয়া ওঠা পিঠাপুলির আয়োজন। এবারও চিরচেনা সেই রূপে সেজেছে এই অঞ্চলের শহর থেকে শুরু করে গ্রামীণ হাটবাজার। মোড়ে মোড়ে জমে উঠেছে ভাপা ও চিতই পিঠার দোকান। ফুটপাত ও দোকানগুলোতে বসানো ছোট ছোট চুলোয় চালের গুঁড়া, নতুন খেজুরের গুড় আর নারকেলের মিশ্রণে তৈরি হচ্ছে গরম-গরম ভাপা পিঠা। আর ধনেপাতা, সরিষা ও শুঁটকির ঝাল চাটনি দিয়ে পরিবেশন করা হচ্ছে গরম চিতই পিঠা।
পঞ্চগড় চৌরাস্তার বাসিন্দা মিলন ইসলাম জানান, কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় ধোঁয়া ওঠা পিঠার স্বাদ নিতে সন্ধ্যা হতেই এসব দোকানে ভিড় জমান সর্বস্তরের মানুষ। হেমন্ত বা শীতের হিমেল বাতাসে গরম পিঠার এই স্বাদ উত্তরের শীতের আমেজকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
শীতের আগমনে উত্তরের প্রকৃতি সেজেছে ভোরের শিশির আর কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহনীয় রূপে। ভোরের হালকা কুয়াশা, মৃদু হিমেল বাতাস ও পাতায় পাতায় শিশিরবিন্দুই প্রকৃতির বিশেষ অলংকার। সেই সঙ্গে হেমন্তের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্যমানতা। হেমন্তের মেঘমুক্ত নীল আকাশে সকালে সূর্য ওঠার পরপরই ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে দূর আকাশের বুকে ভেসে ওঠে বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। এরই মধ্যে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন। এতে স্থানীয় রিসোর্ট, হোটেল ও যানবাহন ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা বেড়েছে কয়েক গুণ।
পর্যটকেরা বলছেন, ভোরের আলো ফুটতেই হিমালয়ের বরফাচ্ছাদিত কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর সূর্যের সোনালি আলো এক অলৌকিক ক্যানভাস তৈরি করে। কাঞ্চনজঙ্ঘার এমন শুভ্র সৌন্দর্য আর ভোরের হিমেল বাতাস মন জুড়িয়ে দেয়।
শীতের এই আগমনী বার্তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ‘গাছ কাটা’ ও ‘রস সংগ্রহ’। এই জনপদের গ্রামীণ মেঠোপথ ধরে হাঁটলেই চোখে পড়ে খেজুরগাছ ঘিরে গাছিদের কর্মব্যস্ততা। শীতের কাঁপন পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই খেজুরগাছ প্রস্তুত বা চাঁচা-ছোলার কাজ শেষ হয়েছে। গাছের ডালে ডালে ঝুলতে শুরু করেছে মাটির হাঁড়ি। ভোরবেলায় গাছিরা হাঁড়িভর্তি মিষ্টি রস নামিয়ে আনছেন। কোথাও কোথাও আবার শুরু হয়ে গেছে সেই রসে গুড় ও পাটালি তৈরির উৎসব।
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ গাছি বিকাশ চন্দ্র জানান, হেমন্তের শুরুতে রসের মান খুব ভালো হয়। সূর্য ওঠার আগেই রস নামিয়ে বাজারে বিক্রি শুরু করি। শীত যত বাড়বে, রসের চাহিদা ও গুড় তৈরির ধুম তত বাড়বে।
প্রকৃতির আচরণের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে বাড়তে শুরু করেছে শিশু রোগীর সংখ্যা। সর্দি, কাশি ও হাঁপানিসহ বিভিন্ন ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আবু মো. রাজিব-উল-দোজা (তূর্য) বলেন, প্রতিবারই শীতের শুরু থেকে শিশু ও বৃদ্ধরা ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্তের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। এই সময় বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
প্রকৃতির নিয়ম মেনেই কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে উত্তরে শীত নামছে। কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপের জাদু, খেজুরের রসের মিষ্টি ঘ্রাণ আর সোনালি ধানের হাসিতে ঠাকুরগাঁও এখন উৎসবমুখর। ঋতুচক্রের এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকদের এই ভিড় প্রমাণ করে, উত্তরের হেমন্ত শুধু একটি ঋতু নয়, এটি গ্রামবাংলার এক প্রাণবন্ত উৎসবের নাম।
তবে রূপসী শীতের এই উৎসবের আড়ালে থেকে যায় কিছু বিষাদের সুরও। হিমেল হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে শীতকালীন রোগের প্রকোপ। কাজ কমে যাওয়া ও হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় দিনমজুর শ্রেণির মানুষের জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি তীব্র শীতে পর্যাপ্ত গরম পোশাকের অভাবে অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষদের পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। তাই এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসচেতনতা নিশ্চিত করাই হোক শীতের প্রকৃত সার্থকতা।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন