মধুমতি নদীর ভাঙনের মুখে ফরিদপুরের দুই গ্রাম

আপলোড সময় : ১২-১০-২০২৬ ০৪:১১:১০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১২-১০-২০২৬ ০৪:১১:১০ অপরাহ্ন
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় মধুমতি নদীর ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে বুড়াইচ ইউনিয়নের চরখোলাবাড়িয়া ও পাশের গোপালপুর ইউনিয়নের দিগনগর গ্রাম। গত ২০ জুলাই থেকে এ ভাঙন শুরু হয়ে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। কখনো ভাঙনের গতি বাড়ছে, আবার কখনো কমছে।

ভাঙন রোধে এবং ওই এলাকায় স্থায়ীভাবে নদীর তীর সংরক্ষণ কাজের দাবিতে এলাকাবাসী পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন, মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করেছেন। কিন্তু গত তিন মাসে এ নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সম্প্রতি চরখোলাবাড়িয়া ও দিগনগর গ্রাম সরেজমিনে ঘুরে ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিগনগর গ্রামটি উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নে এবং চরখোলাবাড়িয়া গ্রামটি বুড়াইচ ইউনিয়নে অবস্থিত।

চরখোলাবাড়িয়া গ্রামের প্রায় তিনশ পরিবার নদীভাঙনের আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অপরদিকে দিগনগর গ্রামের ২০০ থেকে ২২০টি পরিবার ভাঙনের আতঙ্কে রয়েছে।

চলতি বছর চরখোলাবাড়িয়া গ্রামে ভাঙনের শিকার হয়ে খোকন মিয়া, হান্নান মিয়া, রোকন মিয়া, জিন্না মিয়া, ওসমান মিয়া, লিয়াকত মিয়া, সত্তার মিয়া, আহাম্মদ মিয়া, শহিদুল মিয়া, শাহজাহান মিয়া, মুন্নু মিয়া, হাজী জয়নাল মিয়া, শহীদ মিয়া, উসমান মিয়াসহ প্রায় ষাটটি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

অপরদিকে দিগনগর গ্রামে এ বছর শরিফুল, শফিকুল, বালাম, কামাল, হান্নান, মিলন, খাইরুল, রুহুল মিয়া, ফেলা মিয়াসহ প্রায় ৫০টি বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

চরখোলাবাড়িয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ আল আমিন মিয়া(৪৫) জানান, মধুমতি নদী ভাঙতে ভাঙতে ওই গ্রামের এনবিডিসি আলহেরা দাখিল মাদ্রাসা, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি সাব পোস্ট অফিস, একটি এতিমখানা থেকে প্রায় একশ গজ দূরে চলে এসেছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে মিয়াপাড়া জামে মসজিদ, ওই মসজিদ থেকে মধুমতি নদী ১৫০ গজ দূরে অবস্থান করছে।

চরখোলাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন জানান, ১৯৯৪ সালে স্থাপিত এ বিদ্যালয়ে একটি সেমিপাকা ভবন, সীমানাপ্রাচীর, ওয়াশ ব্লক রয়েছে। এ বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী রয়েছে ৭৫ জন। নদী ভাঙতে ভাঙতে স্কুলের সীমানার ২০০ গজের মধ্যে চলে এসেছে।

আলহেরা দাখিল মাদ্রাসাটি এক একর জায়গার ওপর ১৯৯১ সালে চরখোলাবাড়িয়া গ্রামে স্থাপিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে মধুমতি নদী আনুমানিক দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছিল। বর্তমানে ভাঙতে ভাঙতে ওই দূরত্ব প্রায় ১০০ মিটারে নেমে এসেছে। মাদ্রাসাটিতে ১৪ জন শিক্ষক ও ৩৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এ মাদ্রাসায় দুটি কক্ষবিশিষ্ট একতলা একটি ভবন, আটটি কক্ষবিশিষ্ট তিনটি সেমিপাকা ভবন ও চারটি কক্ষবিশিষ্ট একটি টিনের ঘর রয়েছে।

আলহেরা দাখিল মাদ্রাসার সুপার আব্দুর রব বলেন, ভাঙনের কারণে আমরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। এ মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা শঙ্কিত।

‘দ্রুত ভাঙন রোধে বাঁধ নির্মাণ করা না হলে মানচিত্র থেকে চরখোলাবাড়িয়া গ্রামটি বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে’—মন্তব্য করে বুড়াইচ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহাব ওরফে পান্নু মিয়া বলেন, প্রতিনিয়তই তো গ্রামের অংশবিশেষ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। স্থায়ীভাবে নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ করা না গেলে এ ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

গোপালপুর ইউনিয়নের দিগনগর গ্রামের বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম (৩৮) জানান, দিগনগর জামে মসজিদ এবং দিগনগর গোরস্থান থেকে প্রায় ১৫০ গজ দূর এবং দিগনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০ গজ দূরে চলে এসেছে মধুমতি নদী। এর পাশাপাশি দিগনগর গ্রামের প্রায় ২০০ থেকে ২২০টি পরিবার নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. সাইফুল খান বলেন, এই এলাকা ফরিদপুরের শেষ সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় সব সময় এই এলাকার লোক অবহেলিত। জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন। তা না হলে এলাকাবাসীর বাড়িঘর, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, মধুমতির ভয়াল গ্রাসে প্রতিনিয়ত ছোট হয়ে আসছে এলাকার জনবসতি। ভাঙন রোধে দ্রুত স্থায়ী ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এলাকার মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে চরখোলাবাড়িয়া ও দিগনগর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো। গৃহহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে শত শত পরিবারের।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বলেন, মধুমতি নদীর ভাঙন পরিস্থিতি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নজরে রয়েছে। নদীতে এখন অনেক পানি। পদ্মা নদীতে পানি কমতে শুরু করলেও মধুমতি নদীতে তার প্রভাব পড়েনি। মধুমতি নদীর পানি কমলে পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :