বগুড়ার শেরপুর, ধুনট ও শিবগঞ্জ উপজেলার গ্রামীণ নারীরা সংসারের কাজের ফাঁকে ক্রুশকাঠি ও চিকন সুতা দিয়ে নিপুণ হাতে জালি টুপি তৈরি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে এই টুপি এক বিশাল স্থান করে নিয়েছে, যার বর্তমান বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় গ্রামীণ নারীদের তৈরি এই টুপি দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে, যা থেকে আয় ৫০ কোটি টাকার মতো বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কারিগররা।
১৯৮৮ সালের দিকের ঘটনা। দেশজুড়ে তখন বন্যা। হাতে কাজ নেই। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর তখন ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার অদম্য চেষ্টা মানুষের ঘরে ঘরে। এরই মধ্যে একদিন স্বামী আজহার আলী বাজার থেকে ফিরে একটা সুতার টুপি আর কুরুজ-কাঁটা ধরিয়ে দিলেন ওয়াজেদা বেগমের হাতে। বললেন টুপি তৈরির চেষ্টা করতে। বছর দু-এক নিজেই বাড়িতে টুপি তৈরি করলেন। পরে সুই-সুতায় টুপি বুননের কাজটা শেখানোর কাজও শুরু করলেন অন্য নারীদের নিয়ে। একসময় গ্রামজুড়ে শুরু হয়ে গেলো জালি টুপি তৈরির কর্মযজ্ঞ। এ কাজ করে নিজেরা তো দারিদ্র্য জয় করলেনই, সচ্ছল-স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখালেন বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের চকধলি ও চককল্যাণী গ্রামের আরও অনেক নারীকে।
বগুড়া জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের গ্রাম চককল্যাণী ও চকধলি থেকে টুপি তৈরির কর্মজজ্ঞ এখন ছড়িয়ে পড়েছে শেরপুর ছাড়াও ধুনট, শাজাহানপুর, বগুড়া সদর, শিবগঞ্জ, শাজাহানপুর উপজেলার গ্রামে গ্রামে। এসব টুপি রফতানি হচ্ছে ভারত, সৌদি আরব, কাতার, দুবাইসহ বিশ্বের নানা দেশে। টুপিশিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এখানে রফতানি প্রক্রিয়াজাত কারখানা, টুপির উপযোগী সুতা তৈরি এবং ধোলাই কারখানা। রফতানিও হচ্ছে বিদেশের বাজারে। দেশীয় বাজারে টুপি যাচ্ছে উত্তরবঙ্গ ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাইকারি বাজারে। সারা বছরই টুপি তৈরির কাজ হয়, তবে মূল বাজার দুই ঈদের সময়ে।
এই বাড়তি চাহিদার বড় অংশই পূরণ করছেন বগুড়ার গ্রামীণ নারীরা। তাদের নিপুণ হাতে সুতা ও ক্রুশ কাঁটার মিলনে তৈরি জালি টুপি এখন দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিযোগী হাফেজ সালেহ আহমাদ তাকরীমের ব্যবহৃত ‘তাহফিজ টুপি’ বাজারে নতুন করে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ জালি টুপি অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এই টুপির বাজার ৫০ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
শেরপুর ও ধুনট উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের নারীরা সংসারের কাজের ফাঁকে দীর্ঘদিন ধরে টুপি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। অবসর সময়ে গল্প-আড্ডার পাশাপাশি তারা তৈরি করেন নানা নকশার জালি টুপি। তাদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও নিজের হাতখরচ জোগাতে টুপি তৈরি করছেন। এতে একজন মাসে দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি আয় করতে পারছেন।
শেরপুর উপজেলার কাশিয়াবালা, তালপুকুরিয়া, চকধলী, জয়লা-জুয়ান, জয়লা-আলাদি, কল্যাণী, চককল্যাণী ও গুয়াগাছী এবং ধুনট উপজেলার বোহালগাছা, চৌকিবাড়ি, ফড়িংহাটা, কুড়াহাটা, বিশ্বহরিগাছা, চাঁনদার, ভুবনগাতি, চালাপাড়া, পাঁচথুপি, থেউকান্দি ও বাটিকাবাড়িসহ অন্তত ৩০টি গ্রামে এই টুপি শিল্পের সঙ্গে পরিবারগুলো জড়িত।
ঘরে ঘরে নারীরা দিনরাত ব্যস্ত সুই-সুতা হাতে টুপি তৈরির কাজে। কাশিয়াবালা এলাকার বাসিন্দা রাজু আকন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই উপজেলায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত পাঁচ লাখ নারী এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। ঈদ এলে নতুন করে অনেকে এই পেশায় যুক্ত হন। দিনরাত নারীরা ব্যস্ত থাকেন এই কাজে।’
মাকড়শার জাল, জালি টুপি, বাটি ফুল, স্টার ফুল, বাদামি ফুল, ভি ফুল, বিস্কুট ফুল, কালারফুল, বকুলফুল, তালাচাবি। আনারস ও মৌচাক টুপি তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
বগুড়ার তৈরি রকমারি জালি টুপি ইতোমধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান, দুবাই, কাতার, ভারতসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। এসব টুপি তৈরির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন পাঁচ লাখের বেশি নারী শ্রমিক ও শিক্ষার্থী। কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন প্রায় ২০০ ব্যাপারী। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই জালি টুপি থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। তবে এবার সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী টুপি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।
শেরপুর উপজেলার খাঁনপুর ইউনিয়নের তালপুকুরিয়া গ্রামের শানু খাতুন, আলেয়া ও মর্জিনা বিবির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই তারা টুপি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। তাদের মতে, বাড়িতে কর্মহীন বসে থাকার চেয়ে কিছু একটা করে আয় করা ভালো। সেই ভাবনা এবং বংশীয় ঐতিহ্য ধরে রাখতেই তারা এই পেশায় রয়েছেন। পাশাপাশি ছাত্রীরাও এই কাজে যুক্ত হয়েছেন।
ছাতিয়ানি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিম সুলতানা এবং একই এলাকার শিক্ষার্থী সাবিনা ইয়াসমিন, সুবর্ণা ও শিউলি আক্তার জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি তারা টুপি তৈরি করেন। দিনে একটি করে টুপি তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি টুপি ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়। তাদের ভাষ্য, আগে ৬০ টাকায় সুতা পাওয়া গেলেও এখন একই সুতা কিনতে ৭৫ টাকা লাগছে।
কাশিয়াবালা গ্রামের গৃহবধূ ফরিদা পারভীন, শিউলি খাতুন, রুমি বেগম, জোছনা বেগম ও আছিয়া আক্তার জানান, সংসারের কাজের ফাঁকে তারা টুপি তৈরি করেন। বিশেষ করে রমজান মাসে গ্রামে গ্রামে টুপি তৈরির ব্যস্ততা বেড়ে যায়। বিভিন্ন এলাকার ব্যাপারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সুতা দিয়ে যান। সেই সুতা দিয়ে টুপি তৈরি করার পর তারা তা কিনে নেন এবং সুতার দাম বাদ দিয়ে পারিশ্রমিক পরিশোধ করেন।
টুপি ব্যাপারী সোহাগ মিয়া বলেন, ‘ঠিকমতো কাজ করলে দিনে সর্বোচ্চ চারটি টুপি বোনা সম্ভব। ৭৫ টাকা দামের এক ববিন সুতা দিয়ে ১২টি টুপি তৈরি করা যায়। এগুলো প্রায় ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। ব্যাপারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সুতার ববিন দিয়ে আসেন এবং টুপি তৈরি শেষ হলে নিজেরাই তা কিনে নেন। পরে ১২টি টুপির এক সেট পাইকারি বাজারে বিক্রি করা হয়। এসব টুপি বিভিন্ন মুসলিম দেশে যায়।’
বগুড়ার বাংলাদেশ জালি টুপি ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, প্রতিটি টুপির বাজারমূল্য গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। সেই হিসাবে গড়ে প্রতিদিন ৬০ লাখ টাকার টুপি তৈরি হয়। বছরে টুপি তৈরি হয় ২০০ কোটি টাকার। এর এক-তৃতীয়াংশ রফতানি হয়। বিদেশে রফতানি করছেন বগুড়ার অন্তত ১৫ জন রফতানিকারক।
বাংলাদেশ জালি টুপি ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জুয়েল আকন্দ বলেন, ‘টুপি বিক্রি করে প্রতি বছর ৫০ কোটি টাকার অধিক বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে। করোনার কারণে ব্যবসা থমকে গেলেও পরবর্তী সময়ে তাহফিজ টুপির প্রচুর চাহিদা সৃষ্টি হয়। বাজারে এই টুপির চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এই টুপিশিল্পে সরকার থেকে কোনও অনুদান বা সহযোগিতা পান না। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে পাশে দাঁড়াতে হবে। তাছাড়া এ শিল্প ধ্বংস হবে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হবে।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
১৯৮৮ সালের দিকের ঘটনা। দেশজুড়ে তখন বন্যা। হাতে কাজ নেই। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর তখন ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার অদম্য চেষ্টা মানুষের ঘরে ঘরে। এরই মধ্যে একদিন স্বামী আজহার আলী বাজার থেকে ফিরে একটা সুতার টুপি আর কুরুজ-কাঁটা ধরিয়ে দিলেন ওয়াজেদা বেগমের হাতে। বললেন টুপি তৈরির চেষ্টা করতে। বছর দু-এক নিজেই বাড়িতে টুপি তৈরি করলেন। পরে সুই-সুতায় টুপি বুননের কাজটা শেখানোর কাজও শুরু করলেন অন্য নারীদের নিয়ে। একসময় গ্রামজুড়ে শুরু হয়ে গেলো জালি টুপি তৈরির কর্মযজ্ঞ। এ কাজ করে নিজেরা তো দারিদ্র্য জয় করলেনই, সচ্ছল-স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখালেন বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের চকধলি ও চককল্যাণী গ্রামের আরও অনেক নারীকে।
বগুড়া জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের গ্রাম চককল্যাণী ও চকধলি থেকে টুপি তৈরির কর্মজজ্ঞ এখন ছড়িয়ে পড়েছে শেরপুর ছাড়াও ধুনট, শাজাহানপুর, বগুড়া সদর, শিবগঞ্জ, শাজাহানপুর উপজেলার গ্রামে গ্রামে। এসব টুপি রফতানি হচ্ছে ভারত, সৌদি আরব, কাতার, দুবাইসহ বিশ্বের নানা দেশে। টুপিশিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এখানে রফতানি প্রক্রিয়াজাত কারখানা, টুপির উপযোগী সুতা তৈরি এবং ধোলাই কারখানা। রফতানিও হচ্ছে বিদেশের বাজারে। দেশীয় বাজারে টুপি যাচ্ছে উত্তরবঙ্গ ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাইকারি বাজারে। সারা বছরই টুপি তৈরির কাজ হয়, তবে মূল বাজার দুই ঈদের সময়ে।
এই বাড়তি চাহিদার বড় অংশই পূরণ করছেন বগুড়ার গ্রামীণ নারীরা। তাদের নিপুণ হাতে সুতা ও ক্রুশ কাঁটার মিলনে তৈরি জালি টুপি এখন দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিযোগী হাফেজ সালেহ আহমাদ তাকরীমের ব্যবহৃত ‘তাহফিজ টুপি’ বাজারে নতুন করে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ জালি টুপি অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এই টুপির বাজার ৫০ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
শেরপুর ও ধুনট উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের নারীরা সংসারের কাজের ফাঁকে দীর্ঘদিন ধরে টুপি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। অবসর সময়ে গল্প-আড্ডার পাশাপাশি তারা তৈরি করেন নানা নকশার জালি টুপি। তাদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও নিজের হাতখরচ জোগাতে টুপি তৈরি করছেন। এতে একজন মাসে দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি আয় করতে পারছেন।
শেরপুর উপজেলার কাশিয়াবালা, তালপুকুরিয়া, চকধলী, জয়লা-জুয়ান, জয়লা-আলাদি, কল্যাণী, চককল্যাণী ও গুয়াগাছী এবং ধুনট উপজেলার বোহালগাছা, চৌকিবাড়ি, ফড়িংহাটা, কুড়াহাটা, বিশ্বহরিগাছা, চাঁনদার, ভুবনগাতি, চালাপাড়া, পাঁচথুপি, থেউকান্দি ও বাটিকাবাড়িসহ অন্তত ৩০টি গ্রামে এই টুপি শিল্পের সঙ্গে পরিবারগুলো জড়িত।
ঘরে ঘরে নারীরা দিনরাত ব্যস্ত সুই-সুতা হাতে টুপি তৈরির কাজে। কাশিয়াবালা এলাকার বাসিন্দা রাজু আকন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই উপজেলায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত পাঁচ লাখ নারী এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। ঈদ এলে নতুন করে অনেকে এই পেশায় যুক্ত হন। দিনরাত নারীরা ব্যস্ত থাকেন এই কাজে।’
মাকড়শার জাল, জালি টুপি, বাটি ফুল, স্টার ফুল, বাদামি ফুল, ভি ফুল, বিস্কুট ফুল, কালারফুল, বকুলফুল, তালাচাবি। আনারস ও মৌচাক টুপি তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
বগুড়ার তৈরি রকমারি জালি টুপি ইতোমধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান, দুবাই, কাতার, ভারতসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। এসব টুপি তৈরির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন পাঁচ লাখের বেশি নারী শ্রমিক ও শিক্ষার্থী। কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন প্রায় ২০০ ব্যাপারী। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই জালি টুপি থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। তবে এবার সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী টুপি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।
শেরপুর উপজেলার খাঁনপুর ইউনিয়নের তালপুকুরিয়া গ্রামের শানু খাতুন, আলেয়া ও মর্জিনা বিবির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই তারা টুপি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। তাদের মতে, বাড়িতে কর্মহীন বসে থাকার চেয়ে কিছু একটা করে আয় করা ভালো। সেই ভাবনা এবং বংশীয় ঐতিহ্য ধরে রাখতেই তারা এই পেশায় রয়েছেন। পাশাপাশি ছাত্রীরাও এই কাজে যুক্ত হয়েছেন।
ছাতিয়ানি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিম সুলতানা এবং একই এলাকার শিক্ষার্থী সাবিনা ইয়াসমিন, সুবর্ণা ও শিউলি আক্তার জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি তারা টুপি তৈরি করেন। দিনে একটি করে টুপি তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি টুপি ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়। তাদের ভাষ্য, আগে ৬০ টাকায় সুতা পাওয়া গেলেও এখন একই সুতা কিনতে ৭৫ টাকা লাগছে।
কাশিয়াবালা গ্রামের গৃহবধূ ফরিদা পারভীন, শিউলি খাতুন, রুমি বেগম, জোছনা বেগম ও আছিয়া আক্তার জানান, সংসারের কাজের ফাঁকে তারা টুপি তৈরি করেন। বিশেষ করে রমজান মাসে গ্রামে গ্রামে টুপি তৈরির ব্যস্ততা বেড়ে যায়। বিভিন্ন এলাকার ব্যাপারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সুতা দিয়ে যান। সেই সুতা দিয়ে টুপি তৈরি করার পর তারা তা কিনে নেন এবং সুতার দাম বাদ দিয়ে পারিশ্রমিক পরিশোধ করেন।
টুপি ব্যাপারী সোহাগ মিয়া বলেন, ‘ঠিকমতো কাজ করলে দিনে সর্বোচ্চ চারটি টুপি বোনা সম্ভব। ৭৫ টাকা দামের এক ববিন সুতা দিয়ে ১২টি টুপি তৈরি করা যায়। এগুলো প্রায় ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। ব্যাপারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সুতার ববিন দিয়ে আসেন এবং টুপি তৈরি শেষ হলে নিজেরাই তা কিনে নেন। পরে ১২টি টুপির এক সেট পাইকারি বাজারে বিক্রি করা হয়। এসব টুপি বিভিন্ন মুসলিম দেশে যায়।’
বগুড়ার বাংলাদেশ জালি টুপি ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, প্রতিটি টুপির বাজারমূল্য গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। সেই হিসাবে গড়ে প্রতিদিন ৬০ লাখ টাকার টুপি তৈরি হয়। বছরে টুপি তৈরি হয় ২০০ কোটি টাকার। এর এক-তৃতীয়াংশ রফতানি হয়। বিদেশে রফতানি করছেন বগুড়ার অন্তত ১৫ জন রফতানিকারক।
বাংলাদেশ জালি টুপি ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জুয়েল আকন্দ বলেন, ‘টুপি বিক্রি করে প্রতি বছর ৫০ কোটি টাকার অধিক বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে। করোনার কারণে ব্যবসা থমকে গেলেও পরবর্তী সময়ে তাহফিজ টুপির প্রচুর চাহিদা সৃষ্টি হয়। বাজারে এই টুপির চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এই টুপিশিল্পে সরকার থেকে কোনও অনুদান বা সহযোগিতা পান না। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে পাশে দাঁড়াতে হবে। তাছাড়া এ শিল্প ধ্বংস হবে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হবে।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন