নদীর মাঝখানে সবুজে ঢাকা উঁচু জমি। পুরোটা বড় বড় গাছপালা, ঝোপঝাড় আর লতাগুল্মে ভরা। কোথাও চাষের জমি, কোথাও ঘাসে ঢাকা প্রান্তর। গাছের ডালে ডালে পাখির আনাগোনা। শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলনস্থলের এই ধাঁধার চর এখন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাবে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ধাঁধার চর মৌজায় ৪৫ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র করতে চান বিএনপির সাবেক এক নেতা। এ জন্য তিনি ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর খাসজমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত চেয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন। যার মধ্যে ৩০ একরের বেশি নদীর জায়গাও রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, আইন অনুযায়ী নদী কিংবা নাল শ্রেণির জমি ইজারা দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ ও ভূমির ব্যবহার বদল হলে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হতে পারে। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সম্ভাবনাময় চরের স্বাভাবিক প্রতিবেশও বদলে যেতে পারে।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তা সাননোভা এনার্জি ওপিসি নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যার পরিচালক কামাল জামান মোল্লা শিবচর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি হতে চান বলে এলাকায় আলোচনা আছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়নও পেয়েছিলেন তিনি। তবে মনোনয়ন দেওয়ার এক দিন পরই তা স্থগিত করা হয়। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে তৃতীয় হন কামাল জামান মোল্লা। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
জেলা প্রশাসনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাননোভা এনার্জির পক্ষে পরিচালক কামাল জামান মোল্লা গত ১৬ আগস্ট গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। আবেদনে অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫-এর আওতায় বিদেশি বিনিয়োগ ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত চাওয়া হয়।
আবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি এবং সবুজ শক্তি প্রসারের রূপকল্প বাস্তবায়নে সাননোভা এনার্জি ওপিসি অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে চায়। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ ও টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করতে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বৃহৎ প্রকল্প নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বৈদেশিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি কোরিয়া ও চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে গত ১৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বক্তব্য দানকালে ধাঁধার চরকে বিশেষ পর্যটন এলাকা গড়ে তোলার দাবি জানান গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মো. সালাহউদ্দিন আইয়ূবী। জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ সদস্য বলেন, ধাঁধার চরে কৃষকেরা চাষাবাদ করেন। সেখানে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র হলে গাছপালা কাটা পড়বে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পরিবেশের ওপর বড় ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়বে।
নদীর বুকে ছোট্ট দ্বীপ ধাঁধার চর
কাপাসিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ধাঁধার চর। শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলনস্থলের কাছাকাছি গড়ে ওঠা চরটি দূর থেকে নদীর বুকে ভেসে থাকা সবুজ দ্বীপের মতো মনে হয়। চারপাশে থইথই পানি, আর সেই পানির মধ্যে মাথা তুলে আছে চরটি।
১০ সেপ্টেম্বর সরেজমিন দেখা যায়, পুরো এলাকায় রয়েছে বড় বড় গাছপালা। কোথাও কোথাও স্থানীয় বাসিন্দারা কৃষিকাজ করছেন। চরের ভেতর দিয়ে হাঁটলে কোথাও চাষের জমি, কোথাও ঘাস-লতাগুল্মে ঢাকা জায়গা, আবার কোথাও ঝোপঝাড় দেখা যায়। এসব ঝোপঝাড় ও গাছপালায় ছুটে বেড়াচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি।
ধাঁধার চরের আশপাশের বাসিন্দারা বলছেন, এ ধরনের জায়গায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন না করে এলাকাটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
হামিদুল ইসলাম নামের এক বাসিন্দা বলেন, বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে বিপুল পরিমাণ জমি দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রকল্পের আওতায় চলে যাবে। এতে চরটির স্বাভাবিক পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
চরটি ঠিক কত দিন আগে জেগে উঠেছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। স্থানীয় কৃষক মো. সাখাওয়াত হোসেন (৩৫) বলেন, ‘আমার দাদার কাছ থেকেও শুনেছি, অনেক আগে থেকেই এখানে চর রয়েছে। তবে এটি ঠিক কত বছরের পুরোনো, তা আমরা জানি না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাননোভা এনার্জির পরিচালক কামাল জামান মোল্লা ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বলেন, সেখানে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। এতে তেল-গ্যাসের প্রয়োজন হবে না। পাশাপাশি সেখানে রিসোর্ট টাইপের কিছু করারও পরিকল্পনা আছে। তিনি আবেদন করেছেন, এখন সরকার যদি মনে করে দেওয়া যায়, তাহলে দেবে। তিনি নদীর জমি বা কৃষিজমি ইজারার জন্য আবেদন করেননি দাবি করে আরও বলেন, যেসব খাসজমি পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে, সেগুলোর জন্য আবেদন করেছেন।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, নদীর জমি ইজারা দেওয়া ঠিক নয়। জমি পড়ে আছে—এমন অজুহাতে সেটি কোনো ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা যাবে না। আইনেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
বেশির ভাগই ফসলি জমি
জেলা প্রশাসনের সূত্র জানায়, কাপাসিয়ার দুর্গাপুর ইউনিয়নের রাণীগঞ্জের ধাঁধার চর মৌজায় মোট খাসজমির পরিমাণ ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর। এর মধ্যে নদী শ্রেণির দুটি দাগে ৩০ দশমিক ৯৫ একর, বালুচর শ্রেণির তিনটি দাগে ১৩ দশমিক ৫৩ একর, সিকস্তি শ্রেণির ১০৬টি দাগে ৪৩ দশমিক শূন্য ৬ একর এবং নাল শ্রেণির ৯০টি দাগে ১৫২ দশমিক ৪৪ একর জমি রয়েছে।
উল্লেখ্য, সরকারি রেকর্ডে নদীর বুকে বালু জমে গড়ে ওঠা চরকে বালুচর শ্রেণির জমি বলা হয়। ভাঙনের ফলে নদীতে চলে যাওয়া জমিকে বলা হয় সিকস্তি এবং সমতলের ২ বা ৩ ফসলি আবাদি জমি নাল শ্রেণির জমি হিসেবে পরিচিত।
হিসাব অনুযায়ী, মোট জমির প্রায় ৬৩ শতাংশই নাল শ্রেণির। এরপর সিকস্তি ভূমি প্রায় ১৯ শতাংশ, নদীর জমি প্রায় ১৩ শতাংশ এবং বালুচর প্রায় ৬ শতাংশ।
কাপাসিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক বলেন, ধাঁধার চর মৌজার এক নম্বর খাস খতিয়ানের তথ্য অনুযায়ী ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর জমি রয়েছে। এসব জমির শ্রেণি নদী, সিকস্তি ভূমি, নালা, ছনখোলা, বালুচর ও লায়েক পতিত। প্রতিষ্ঠানটির ইজারার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা একটি প্রতিবেদন তৈরি করছেন।
আইনে কী বলা আছে
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫-এর ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্তের নীতিমালা সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদের (দ) নম্বরে কোন ধরনের অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া যাবে না, সে সম্পর্কে বলা হয়েছে। নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, খাস খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত জনগণের ব্যবহার্য রাস্তাঘাট, নদী, খাল, নালা, পয়ঃপ্রণালি, পুকুর, বাঁধ, কবরস্থান, শ্মশান, পার্ক, খেলার মাঠ ও ভূমি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের দপ্তরের এলাকাধীন জমি বন্দোবস্তের আওতায় আসবে না। এসব জমি ‘সংরক্ষণীয় তালিকায়’ রাখার বিষয়েও নীতিমালায় বলা রয়েছে।
গাজীপুরভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, ধাঁধার চরে ২৫ থেকে ৩০ প্রজাতির পাখি, বিভিন্ন সরীসৃপ, দেশীয় উদ্ভিদ ও লতাগুল্ম রয়েছে। পাশাপাশি কৃষিকাজও চলে। বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য বন্দোবস্ত দেওয়া হলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ধাঁধার চরকে বেসরকারি বন্দোবস্ত না দিয়ে প্রকৃতি ও নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূইয়া বলেন, ‘ধাঁধার চরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য জমি ইজারা চেয়ে আমাদের কাছে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনটি যাচাই-বাছাই করে জমিটি ইজারা দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’সূত্র: প্রথম আলো
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ধাঁধার চর মৌজায় ৪৫ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র করতে চান বিএনপির সাবেক এক নেতা। এ জন্য তিনি ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর খাসজমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত চেয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন। যার মধ্যে ৩০ একরের বেশি নদীর জায়গাও রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, আইন অনুযায়ী নদী কিংবা নাল শ্রেণির জমি ইজারা দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ ও ভূমির ব্যবহার বদল হলে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হতে পারে। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সম্ভাবনাময় চরের স্বাভাবিক প্রতিবেশও বদলে যেতে পারে।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তা সাননোভা এনার্জি ওপিসি নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যার পরিচালক কামাল জামান মোল্লা শিবচর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি হতে চান বলে এলাকায় আলোচনা আছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়নও পেয়েছিলেন তিনি। তবে মনোনয়ন দেওয়ার এক দিন পরই তা স্থগিত করা হয়। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে তৃতীয় হন কামাল জামান মোল্লা। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
জেলা প্রশাসনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাননোভা এনার্জির পক্ষে পরিচালক কামাল জামান মোল্লা গত ১৬ আগস্ট গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। আবেদনে অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫-এর আওতায় বিদেশি বিনিয়োগ ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত চাওয়া হয়।
আবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি এবং সবুজ শক্তি প্রসারের রূপকল্প বাস্তবায়নে সাননোভা এনার্জি ওপিসি অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে চায়। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ ও টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করতে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বৃহৎ প্রকল্প নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বৈদেশিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি কোরিয়া ও চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে গত ১৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বক্তব্য দানকালে ধাঁধার চরকে বিশেষ পর্যটন এলাকা গড়ে তোলার দাবি জানান গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মো. সালাহউদ্দিন আইয়ূবী। জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ সদস্য বলেন, ধাঁধার চরে কৃষকেরা চাষাবাদ করেন। সেখানে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র হলে গাছপালা কাটা পড়বে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পরিবেশের ওপর বড় ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়বে।
নদীর বুকে ছোট্ট দ্বীপ ধাঁধার চর
কাপাসিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ধাঁধার চর। শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলনস্থলের কাছাকাছি গড়ে ওঠা চরটি দূর থেকে নদীর বুকে ভেসে থাকা সবুজ দ্বীপের মতো মনে হয়। চারপাশে থইথই পানি, আর সেই পানির মধ্যে মাথা তুলে আছে চরটি।
১০ সেপ্টেম্বর সরেজমিন দেখা যায়, পুরো এলাকায় রয়েছে বড় বড় গাছপালা। কোথাও কোথাও স্থানীয় বাসিন্দারা কৃষিকাজ করছেন। চরের ভেতর দিয়ে হাঁটলে কোথাও চাষের জমি, কোথাও ঘাস-লতাগুল্মে ঢাকা জায়গা, আবার কোথাও ঝোপঝাড় দেখা যায়। এসব ঝোপঝাড় ও গাছপালায় ছুটে বেড়াচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি।
ধাঁধার চরের আশপাশের বাসিন্দারা বলছেন, এ ধরনের জায়গায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন না করে এলাকাটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
হামিদুল ইসলাম নামের এক বাসিন্দা বলেন, বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে বিপুল পরিমাণ জমি দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রকল্পের আওতায় চলে যাবে। এতে চরটির স্বাভাবিক পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
চরটি ঠিক কত দিন আগে জেগে উঠেছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। স্থানীয় কৃষক মো. সাখাওয়াত হোসেন (৩৫) বলেন, ‘আমার দাদার কাছ থেকেও শুনেছি, অনেক আগে থেকেই এখানে চর রয়েছে। তবে এটি ঠিক কত বছরের পুরোনো, তা আমরা জানি না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাননোভা এনার্জির পরিচালক কামাল জামান মোল্লা ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বলেন, সেখানে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। এতে তেল-গ্যাসের প্রয়োজন হবে না। পাশাপাশি সেখানে রিসোর্ট টাইপের কিছু করারও পরিকল্পনা আছে। তিনি আবেদন করেছেন, এখন সরকার যদি মনে করে দেওয়া যায়, তাহলে দেবে। তিনি নদীর জমি বা কৃষিজমি ইজারার জন্য আবেদন করেননি দাবি করে আরও বলেন, যেসব খাসজমি পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে, সেগুলোর জন্য আবেদন করেছেন।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, নদীর জমি ইজারা দেওয়া ঠিক নয়। জমি পড়ে আছে—এমন অজুহাতে সেটি কোনো ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা যাবে না। আইনেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
বেশির ভাগই ফসলি জমি
জেলা প্রশাসনের সূত্র জানায়, কাপাসিয়ার দুর্গাপুর ইউনিয়নের রাণীগঞ্জের ধাঁধার চর মৌজায় মোট খাসজমির পরিমাণ ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর। এর মধ্যে নদী শ্রেণির দুটি দাগে ৩০ দশমিক ৯৫ একর, বালুচর শ্রেণির তিনটি দাগে ১৩ দশমিক ৫৩ একর, সিকস্তি শ্রেণির ১০৬টি দাগে ৪৩ দশমিক শূন্য ৬ একর এবং নাল শ্রেণির ৯০টি দাগে ১৫২ দশমিক ৪৪ একর জমি রয়েছে।
উল্লেখ্য, সরকারি রেকর্ডে নদীর বুকে বালু জমে গড়ে ওঠা চরকে বালুচর শ্রেণির জমি বলা হয়। ভাঙনের ফলে নদীতে চলে যাওয়া জমিকে বলা হয় সিকস্তি এবং সমতলের ২ বা ৩ ফসলি আবাদি জমি নাল শ্রেণির জমি হিসেবে পরিচিত।
হিসাব অনুযায়ী, মোট জমির প্রায় ৬৩ শতাংশই নাল শ্রেণির। এরপর সিকস্তি ভূমি প্রায় ১৯ শতাংশ, নদীর জমি প্রায় ১৩ শতাংশ এবং বালুচর প্রায় ৬ শতাংশ।
কাপাসিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক বলেন, ধাঁধার চর মৌজার এক নম্বর খাস খতিয়ানের তথ্য অনুযায়ী ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর জমি রয়েছে। এসব জমির শ্রেণি নদী, সিকস্তি ভূমি, নালা, ছনখোলা, বালুচর ও লায়েক পতিত। প্রতিষ্ঠানটির ইজারার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা একটি প্রতিবেদন তৈরি করছেন।
আইনে কী বলা আছে
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫-এর ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্তের নীতিমালা সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদের (দ) নম্বরে কোন ধরনের অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া যাবে না, সে সম্পর্কে বলা হয়েছে। নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, খাস খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত জনগণের ব্যবহার্য রাস্তাঘাট, নদী, খাল, নালা, পয়ঃপ্রণালি, পুকুর, বাঁধ, কবরস্থান, শ্মশান, পার্ক, খেলার মাঠ ও ভূমি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের দপ্তরের এলাকাধীন জমি বন্দোবস্তের আওতায় আসবে না। এসব জমি ‘সংরক্ষণীয় তালিকায়’ রাখার বিষয়েও নীতিমালায় বলা রয়েছে।
গাজীপুরভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, ধাঁধার চরে ২৫ থেকে ৩০ প্রজাতির পাখি, বিভিন্ন সরীসৃপ, দেশীয় উদ্ভিদ ও লতাগুল্ম রয়েছে। পাশাপাশি কৃষিকাজও চলে। বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য বন্দোবস্ত দেওয়া হলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ধাঁধার চরকে বেসরকারি বন্দোবস্ত না দিয়ে প্রকৃতি ও নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূইয়া বলেন, ‘ধাঁধার চরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য জমি ইজারা চেয়ে আমাদের কাছে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনটি যাচাই-বাছাই করে জমিটি ইজারা দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’সূত্র: প্রথম আলো
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন