আজ ২২ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব গণ্ডার দিবস। পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নিবেদিত মানুষদের কাছে দিনটি কেবল একটি ডায়েরির তারিখ নয়, বরং এক বিশাল ও প্রাচীন প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষার শপথ নেওয়ার দিন। কোটি বছর ধরে পৃথিবীর মাটিতে নিজেদের রাজত্ব ধরে রাখা এই প্রাক-ঐতিহাসিক চেহারার স্তন্যপায়ী প্রাণীটি আজ মানুষেরই নির্মমতা, কদর্য লোভ এবং বাসস্থান সংকোচনের শিকার হয়ে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে।
এক সময় ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে স্বাধীনভাবে বিচরণ করত গণ্ডারের বিভিন্ন প্রজাতি। ২০ শতকের শুরুতেও আফ্রিকা ও এশিয়ার বনাঞ্চলে প্রায় ৫ লাখ গণ্ডার স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু মাত্র এক শতকের ব্যবধানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে আনুমানিক মাত্র ২৭ হাজারে।
বিশ্বে বর্তমানে গণ্ডারের ৫টি প্রজাতি বিদ্যমান–আফ্রিকান কালো ও সাদা গণ্ডার, এবং এশীয় এক-শিং বিশিষ্ট (ভারতীয়), সুমাত্রান ও জাভান গণ্ডার। এদের মধ্যে সুমাত্রান, জাভান এবং কালো গণ্ডারকে আইইউসিএন (IUCN) ‘মহাবিপন্ন’ (Critically Endangered) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংখ্যাগত দিক থেকে জাভান গণ্ডার বর্তমানে পৃথিবীতে ৭০টিরও কম বেঁচে রয়েছে এবং সুমাত্রান গণ্ডারের সংখ্যা মাত্র ৩৪ থেকে ৪৭টি। অন্যদিকে আফ্রিকার ‘উত্তরী সাদা গণ্ডার’ এবং ‘পশ্চিমা কালো গণ্ডার’ বনাঞ্চল থেকে ইতোমধ্যেই চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রজাতি দুটিকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা হিসেবে কেনিয়ার ‘ওল পেজেটা’ অভয়ারণ্যে পৃথিবীর শেষ দুটি নারী ‘উত্তরী সাদা গণ্ডার’কে ২৪ ঘণ্টা সশস্ত্র প্রহরায় রাখা হয়েছে।
গণ্ডার বিলুপ্তির প্রধান কারণ এদের শিংয়ের প্রতি মানুষের অন্ধ লোভ। বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে গণ্ডারের শিং গঠিত মূলত ‘কেরাটিন’ নামক প্রোটিন দিয়ে–যা মানুষের চুল ও নখের মূল উপাদান। এতে কোনো অলৌকিক বা ঔষধি গুণ নেই। তা সত্ত্বেও, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী ভুয়া চিকিৎসায় এবং সমাজিক আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে কোটি টাকায় বিক্রি হয় এই শিং।
তবে আশার আলোও রয়েছে। সংরক্ষণ প্রচেষ্টার এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়েছে ভারতীয় বা এক-শিং বিশিষ্ট গণ্ডার। ২০ শতকের শুরুতে যাদের সংখ্যা ২০০-র নিচে নেমে গিয়েছিল, কঠোর আইনি পদক্ষেপ, বন সংরক্ষণ ও স্থানীয় কমিউনিটির সহায়তায় ভারতে ও নেপালে আজ তাদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজারে।
বনের বাস্তুতন্ত্রের (Ecosystem) অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো গণ্ডার। বিশাল আকৃতির এই প্রাণীটি বনের লতাপাতা ও ঘাস খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে চারণভূমি বজায় রাখে এবং বীজের বিস্তারে ভূমিকা রাখে। গণ্ডার বেঁচে থাকলে রক্ষা পায় পুরো বনের জীববৈচিত্র্য।
গণ্ডার নিয়ে কিছু মজার তথ্য
১. বিশ্বে ৫ প্রজাতির গণ্ডার রয়েছে
এর মধ্যে দুই প্রজাতি আফ্রিকান–কালো (Black) ও সাদা (White) গণ্ডার। বাকি তিন প্রজাতি এশিয়ান, যার মধ্যে রয়েছে ভারতীয় বা বড় এক-শিং বিশিষ্ট (Greater One-Horned), সুমাত্রান (Sumatran) ও জাভান (Javan) গণ্ডার। সুমাত্রান, জাভান ও কালো গণ্ডারকে আইইউসিএন (IUCN) 'মহাবিপন্ন' (Critically Endangered) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ধারণা করা হয়, বর্তমানে ৭০টিরও কম জাভান গণ্ডার এবং ৩৪ থেকে ৪৭টির মতো সুমাত্রান গণ্ডার বেঁচে রয়েছে, যা বনাঞ্চলে তাদের বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আফ্রিকা জুড়ে আনুমানিক ৬,৪৮৭টি কালো গণ্ডার রয়েছে। সাদা গণ্ডারকে ১৬,৮০৩টি সংখ্যা নিয়ে 'সংকটাপন্ন হওয়ার কাছাকাছি' (Near Threatened) এবং ভারতীয় এক-শিং বিশিষ্ট গণ্ডারকে ৪,০১৪টি সংখ্যা নিয়ে 'ঝুঁকিপূর্ণ' (Vulnerable) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
২. গণ্ডারের ওজন ৩ টনেরও বেশি হতে পারে
সব প্রজাতির গণ্ডারের মধ্যে সুমাত্রান গণ্ডার আকারে সবচেয়ে ছোট, তবুও এদের ওজন ৬০০ কেজি (প্রায় ৯৫ স্টোন) পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে, সাদা গণ্ডার হলো সবচেয়ে বড় প্রজাতির, যাদের ওজন ৩,৫০০ কেজি পর্যন্ত হয়। এটি ৫৫০ স্টোনেরও বেশি বা ৩ টনেরও বেশি–যা তাদের মূল খাদ্য কেবল ঘাস ও পাতা হওয়া সত্ত্বেও বেশ প্রভাবশালী!
৩. কালো ও সাদা গণ্ডার–উভয়েই মূলত ধূসর রঙের
কালো ও সাদা গণ্ডারের নামগুলো কিছুটা বিভ্রান্তিকর; কারণ দুটিই আসলে ধূসর রঙের। বলা হয়ে থাকে, আফ্রিকান ভাষা 'আফ্রিকাফান্স'-এর চওড়া ('wyd') শব্দ থেকে সাদা (White) গণ্ডারের নাম এসেছে, যা দিয়ে তাদের চওড়া ও চারকোনা ঠোঁটকে বোঝানো হতো (এর বিপরীতে কালো গণ্ডারের ওপরের ঠোঁটটি সুচালো হয়)। প্রাথমিক যুগের ইংরেজ অভিযাত্রীরা এই 'wyd' শব্দটিকে 'White' বা সাদা মনে করেন এবং সে অনুযায়ী এই প্রজাতির নাম 'সাদা গণ্ডার' রাখেন। পরে পার্থক্য বোঝাতে অপর প্রজাতিটির নাম দেন 'কালো গণ্ডার'।
৪. এদের ষাঁড় (Bull) ও গাভী (Cow) বলা হয়
পুরুষ গণ্ডারকে 'ষাঁড়' (Bull) এবং স্ত্রী গণ্ডারকে 'গাভী' (Cow) বলা হয়। এদের বাচ্চাদের বলা হয় 'বাছুর' (Calves)। একা একা থাকা ও নিজেদের এলাকা রক্ষা করা পুরুষ গণ্ডারের চেয়ে স্ত্রী গণ্ডাররা সাধারণত বেশি সামাজিক হয়ে থাকে। গণ্ডারের দলকে একসঙ্গে বলা হয় 'ক্র্যাশ' (Crash)।
৫. গণ্ডারের শিং কী দিয়ে তৈরি? আমাদের হাতের নখ যে উপাদানে তৈরি, এটিও তা-ই
গণ্ডারের শিং কেরাটিন (Keratin) নামক প্রোটিন দিয়ে তৈরি–যে উপাদান দিয়ে আমাদের চুল ও নখ গঠিত হয়। জাভান ও ভারতীয় এক-শিং বিশিষ্ট গণ্ডারের একটিই শিং থাকে, অন্যদিকে বাকি প্রজাতিগুলোর থাকে দুটি করে শিং। জীবনজুড়ে এদের শিং ক্রমাগত বাড়তেই থাকে–সাদা গণ্ডারের শিং বছরে ৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং রেকর্ড অনুযায়ী সবচেয়ে লম্বা শিংয়ের দৈর্ঘ্য ছিল ১৫০ সেন্টিমিটার!
৬. গণ্ডারের দৃষ্টিশক্তি বেশ দুর্বল
গণ্ডারের দৃষ্টিশক্তি খুব একটা ভালো নয়–৩০ মিটার দূরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোনো মানুষকে স্পষ্ট দেখতে এদের কষ্ট হয়। তাই এরা মূলত তীব্র ঘ্রাণশক্তির ওপর নির্ভর করে।
৭. জাভান গণ্ডার কেবল একটি ছোট্ট স্থানেই পাওয়া যায়
ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট 'উজুং কুলোন জাতীয় উদ্যান' (Ujung Kulon National Park) হলো পৃথিবীর শেষ অবশিষ্ট বন্য জাভান গণ্ডারদের আবাসস্থল। তবে এটি বসবাসের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ একটি জায়গা। সেখান থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। তা ছাড়া আগামী ১০০ বছরের মধ্যে সেখানে ১০ মিটার উঁচু সুনামি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা উজুং কুলোন জাতীয় উদ্যানে থাকা ৮০% গণ্ডারের বাসস্থান ধ্বংস করে দিতে পারে। এই কারণেই ইন্দোনেশিয়ায় জাভান গণ্ডারের অন্য একটি দলের জন্য নিরাপদ স্থান তৈরি করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
৮. এরা গর্জন, হাঁচি এবং মলমূত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ করে
একে অপরের সাথে যোগাযোগের সময় গণ্ডার নানা ধরনের মজার শব্দ তৈরি করে। মুখোমুখি সংঘাতের সময় এরা গর্জন করে ও ট্রাম্পেটের মতো আওয়াজ তোলে। কালো গণ্ডার রাগের সময় ফোঁস করে, বিপদের সতর্কবার্তা হিসেবে হাঁচির মতো শব্দ করে, ভয় পেলে চিৎকার করে এবং শান্ত থাকলে 'হাঁস-সদৃশ' (mmwonk) শব্দ করে। গণ্ডারেরা তাদের মল ও মূত্রের মাধ্যমেও যোগাযোগ করে। যখন কোনো গণ্ডার নির্দিষ্ট কোনো স্থানে (যা 'ল্যাট্রিন' বা শৌচাগার নামে পরিচিত) অন্য গণ্ডারের সঙ্গে মলত্যাগ করে, তখন তারা অন্যদের মলমূত্রের ঘ্রাণ শুঁকে বুঝতে পারে ওই এলাকায় কে কে এসেছে।
৯. এরা কাদামাটি পছন্দ করে
গণ্ডারদের প্রায়ই কাদামাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেখা যায়। এটি তাদের গায়ে কাদামাটির একটি সুরক্ষাকবচ তৈরি করে, যা শরীর ঠান্ডা রাখে, পোকামাকড়ের কামড় থেকে বাঁচায় এবং পরজীবী দূর করতে সাহায্য করে। এশীয় গণ্ডারেরা চমৎকার সাঁতারুও বটে, এরা খুব সহজেই নদী পার হতে পারে। কিন্তু তাদের আফ্রিকান আত্মীয়রা সাঁতার কাটায় বেশ কাঁচা এবং গভীর পানিতে ডুবেও যেতে পারে–তাই শরীর ঠান্ডা রাখতে এরা মূলত কাদায় পড়ে থাকাকেই বেছে নেয়।
১০. গণ্ডাররা চরম হুমকির মুখে
২০০৮ সাল থেকে গণ্ডার শিকারের সংকট বাড়তে শুরু করে এবং ২০১৫ সালে আফ্রিকা জুড়ে সর্বোচ্চ ১,৩৪৯টি গণ্ডার অবৈধভাবে হত্যা করা হয়। নিবেদিত সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ফলে শিকারের সংখ্যা কিছুটা কমলেও হুমকি এখনো মারাত্মক। ২০২২ সালে আফ্রিকা জুড়ে ৪৪৮টি গণ্ডার অবৈধভাবে মারা হয়েছে–যার অর্থ প্রতিদিন একের বেশি গণ্ডার হত্যা! চোরাশিকারি চক্রগুলো এখন আরও আধুনিক হয়ে উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে গণ্ডারের অবস্থান শনাক্ত করতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয় এবং বন্দুক বা ড্রাগের শট দিয়ে গণ্ডারগুলোকে কাবু করার পর চেইনস' (Chainsaw) দিয়ে তাদের শিং কেটে উড়োজাহাজে করে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রমাণিত কোনো ভেষজ গুণ না থাকা সত্ত্বেও এশীয় ঐতিহ্যবাহী ওষুধে ক্যান্সার থেকে শুরু করে হ্যাংওভার কাটানো সহ নানা রোগের চিকিৎসায় গণ্ডারের গুঁড়ো শিং ব্যবহার করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে ভিয়েতনামে এই শিংকে আভিজাত্য বা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও গণ্য করা হচ্ছে। মানব জনসংখ্যা ও অবকাঠামোর প্রসারের ফলে গণ্ডারের আবাসন ধ্বংস ও জনসংখ্যা খণ্ডিত হওয়াও এদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সাথে জলবায়ু পরিবর্তন এবং খরা ও বন্যার মতো চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগও প্রাণীটির অস্তিত্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
আজকের এই বিশেষ দিনে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতার কথা বলাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন চোরাশিকারীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কঠোর পদক্ষেপ, কুসংস্কার দূরীকরণ এবং বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল সংরক্ষণ। পৃথিবী যদি তার এই প্রাচীন প্রজাতিকে হারিয়ে ফেলে, তবে তা কেবল গণ্ডারের ক্ষতি হবে না, বরং তা হবে মানব সভ্যতার এক অপূরণীয় পরাজয়। আসুন, প্রকৃতির এই শান্ত ও দৃঢ় রাজপুত্রদের রক্ষা করতে আমরা একজোটে আওয়াজ তুলি। সূত্র: সংবাদ
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে
এক সময় ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে স্বাধীনভাবে বিচরণ করত গণ্ডারের বিভিন্ন প্রজাতি। ২০ শতকের শুরুতেও আফ্রিকা ও এশিয়ার বনাঞ্চলে প্রায় ৫ লাখ গণ্ডার স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু মাত্র এক শতকের ব্যবধানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে আনুমানিক মাত্র ২৭ হাজারে।
বিশ্বে বর্তমানে গণ্ডারের ৫টি প্রজাতি বিদ্যমান–আফ্রিকান কালো ও সাদা গণ্ডার, এবং এশীয় এক-শিং বিশিষ্ট (ভারতীয়), সুমাত্রান ও জাভান গণ্ডার। এদের মধ্যে সুমাত্রান, জাভান এবং কালো গণ্ডারকে আইইউসিএন (IUCN) ‘মহাবিপন্ন’ (Critically Endangered) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংখ্যাগত দিক থেকে জাভান গণ্ডার বর্তমানে পৃথিবীতে ৭০টিরও কম বেঁচে রয়েছে এবং সুমাত্রান গণ্ডারের সংখ্যা মাত্র ৩৪ থেকে ৪৭টি। অন্যদিকে আফ্রিকার ‘উত্তরী সাদা গণ্ডার’ এবং ‘পশ্চিমা কালো গণ্ডার’ বনাঞ্চল থেকে ইতোমধ্যেই চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রজাতি দুটিকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা হিসেবে কেনিয়ার ‘ওল পেজেটা’ অভয়ারণ্যে পৃথিবীর শেষ দুটি নারী ‘উত্তরী সাদা গণ্ডার’কে ২৪ ঘণ্টা সশস্ত্র প্রহরায় রাখা হয়েছে।
গণ্ডার বিলুপ্তির প্রধান কারণ এদের শিংয়ের প্রতি মানুষের অন্ধ লোভ। বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে গণ্ডারের শিং গঠিত মূলত ‘কেরাটিন’ নামক প্রোটিন দিয়ে–যা মানুষের চুল ও নখের মূল উপাদান। এতে কোনো অলৌকিক বা ঔষধি গুণ নেই। তা সত্ত্বেও, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী ভুয়া চিকিৎসায় এবং সমাজিক আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে কোটি টাকায় বিক্রি হয় এই শিং।
তবে আশার আলোও রয়েছে। সংরক্ষণ প্রচেষ্টার এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়েছে ভারতীয় বা এক-শিং বিশিষ্ট গণ্ডার। ২০ শতকের শুরুতে যাদের সংখ্যা ২০০-র নিচে নেমে গিয়েছিল, কঠোর আইনি পদক্ষেপ, বন সংরক্ষণ ও স্থানীয় কমিউনিটির সহায়তায় ভারতে ও নেপালে আজ তাদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজারে।
বনের বাস্তুতন্ত্রের (Ecosystem) অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো গণ্ডার। বিশাল আকৃতির এই প্রাণীটি বনের লতাপাতা ও ঘাস খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে চারণভূমি বজায় রাখে এবং বীজের বিস্তারে ভূমিকা রাখে। গণ্ডার বেঁচে থাকলে রক্ষা পায় পুরো বনের জীববৈচিত্র্য।
গণ্ডার নিয়ে কিছু মজার তথ্য
১. বিশ্বে ৫ প্রজাতির গণ্ডার রয়েছে
এর মধ্যে দুই প্রজাতি আফ্রিকান–কালো (Black) ও সাদা (White) গণ্ডার। বাকি তিন প্রজাতি এশিয়ান, যার মধ্যে রয়েছে ভারতীয় বা বড় এক-শিং বিশিষ্ট (Greater One-Horned), সুমাত্রান (Sumatran) ও জাভান (Javan) গণ্ডার। সুমাত্রান, জাভান ও কালো গণ্ডারকে আইইউসিএন (IUCN) 'মহাবিপন্ন' (Critically Endangered) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ধারণা করা হয়, বর্তমানে ৭০টিরও কম জাভান গণ্ডার এবং ৩৪ থেকে ৪৭টির মতো সুমাত্রান গণ্ডার বেঁচে রয়েছে, যা বনাঞ্চলে তাদের বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আফ্রিকা জুড়ে আনুমানিক ৬,৪৮৭টি কালো গণ্ডার রয়েছে। সাদা গণ্ডারকে ১৬,৮০৩টি সংখ্যা নিয়ে 'সংকটাপন্ন হওয়ার কাছাকাছি' (Near Threatened) এবং ভারতীয় এক-শিং বিশিষ্ট গণ্ডারকে ৪,০১৪টি সংখ্যা নিয়ে 'ঝুঁকিপূর্ণ' (Vulnerable) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
২. গণ্ডারের ওজন ৩ টনেরও বেশি হতে পারে
সব প্রজাতির গণ্ডারের মধ্যে সুমাত্রান গণ্ডার আকারে সবচেয়ে ছোট, তবুও এদের ওজন ৬০০ কেজি (প্রায় ৯৫ স্টোন) পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে, সাদা গণ্ডার হলো সবচেয়ে বড় প্রজাতির, যাদের ওজন ৩,৫০০ কেজি পর্যন্ত হয়। এটি ৫৫০ স্টোনেরও বেশি বা ৩ টনেরও বেশি–যা তাদের মূল খাদ্য কেবল ঘাস ও পাতা হওয়া সত্ত্বেও বেশ প্রভাবশালী!
৩. কালো ও সাদা গণ্ডার–উভয়েই মূলত ধূসর রঙের
কালো ও সাদা গণ্ডারের নামগুলো কিছুটা বিভ্রান্তিকর; কারণ দুটিই আসলে ধূসর রঙের। বলা হয়ে থাকে, আফ্রিকান ভাষা 'আফ্রিকাফান্স'-এর চওড়া ('wyd') শব্দ থেকে সাদা (White) গণ্ডারের নাম এসেছে, যা দিয়ে তাদের চওড়া ও চারকোনা ঠোঁটকে বোঝানো হতো (এর বিপরীতে কালো গণ্ডারের ওপরের ঠোঁটটি সুচালো হয়)। প্রাথমিক যুগের ইংরেজ অভিযাত্রীরা এই 'wyd' শব্দটিকে 'White' বা সাদা মনে করেন এবং সে অনুযায়ী এই প্রজাতির নাম 'সাদা গণ্ডার' রাখেন। পরে পার্থক্য বোঝাতে অপর প্রজাতিটির নাম দেন 'কালো গণ্ডার'।
৪. এদের ষাঁড় (Bull) ও গাভী (Cow) বলা হয়
পুরুষ গণ্ডারকে 'ষাঁড়' (Bull) এবং স্ত্রী গণ্ডারকে 'গাভী' (Cow) বলা হয়। এদের বাচ্চাদের বলা হয় 'বাছুর' (Calves)। একা একা থাকা ও নিজেদের এলাকা রক্ষা করা পুরুষ গণ্ডারের চেয়ে স্ত্রী গণ্ডাররা সাধারণত বেশি সামাজিক হয়ে থাকে। গণ্ডারের দলকে একসঙ্গে বলা হয় 'ক্র্যাশ' (Crash)।
৫. গণ্ডারের শিং কী দিয়ে তৈরি? আমাদের হাতের নখ যে উপাদানে তৈরি, এটিও তা-ই
গণ্ডারের শিং কেরাটিন (Keratin) নামক প্রোটিন দিয়ে তৈরি–যে উপাদান দিয়ে আমাদের চুল ও নখ গঠিত হয়। জাভান ও ভারতীয় এক-শিং বিশিষ্ট গণ্ডারের একটিই শিং থাকে, অন্যদিকে বাকি প্রজাতিগুলোর থাকে দুটি করে শিং। জীবনজুড়ে এদের শিং ক্রমাগত বাড়তেই থাকে–সাদা গণ্ডারের শিং বছরে ৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং রেকর্ড অনুযায়ী সবচেয়ে লম্বা শিংয়ের দৈর্ঘ্য ছিল ১৫০ সেন্টিমিটার!
৬. গণ্ডারের দৃষ্টিশক্তি বেশ দুর্বল
গণ্ডারের দৃষ্টিশক্তি খুব একটা ভালো নয়–৩০ মিটার দূরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোনো মানুষকে স্পষ্ট দেখতে এদের কষ্ট হয়। তাই এরা মূলত তীব্র ঘ্রাণশক্তির ওপর নির্ভর করে।
৭. জাভান গণ্ডার কেবল একটি ছোট্ট স্থানেই পাওয়া যায়
ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট 'উজুং কুলোন জাতীয় উদ্যান' (Ujung Kulon National Park) হলো পৃথিবীর শেষ অবশিষ্ট বন্য জাভান গণ্ডারদের আবাসস্থল। তবে এটি বসবাসের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ একটি জায়গা। সেখান থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। তা ছাড়া আগামী ১০০ বছরের মধ্যে সেখানে ১০ মিটার উঁচু সুনামি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা উজুং কুলোন জাতীয় উদ্যানে থাকা ৮০% গণ্ডারের বাসস্থান ধ্বংস করে দিতে পারে। এই কারণেই ইন্দোনেশিয়ায় জাভান গণ্ডারের অন্য একটি দলের জন্য নিরাপদ স্থান তৈরি করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
৮. এরা গর্জন, হাঁচি এবং মলমূত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ করে
একে অপরের সাথে যোগাযোগের সময় গণ্ডার নানা ধরনের মজার শব্দ তৈরি করে। মুখোমুখি সংঘাতের সময় এরা গর্জন করে ও ট্রাম্পেটের মতো আওয়াজ তোলে। কালো গণ্ডার রাগের সময় ফোঁস করে, বিপদের সতর্কবার্তা হিসেবে হাঁচির মতো শব্দ করে, ভয় পেলে চিৎকার করে এবং শান্ত থাকলে 'হাঁস-সদৃশ' (mmwonk) শব্দ করে। গণ্ডারেরা তাদের মল ও মূত্রের মাধ্যমেও যোগাযোগ করে। যখন কোনো গণ্ডার নির্দিষ্ট কোনো স্থানে (যা 'ল্যাট্রিন' বা শৌচাগার নামে পরিচিত) অন্য গণ্ডারের সঙ্গে মলত্যাগ করে, তখন তারা অন্যদের মলমূত্রের ঘ্রাণ শুঁকে বুঝতে পারে ওই এলাকায় কে কে এসেছে।
৯. এরা কাদামাটি পছন্দ করে
গণ্ডারদের প্রায়ই কাদামাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেখা যায়। এটি তাদের গায়ে কাদামাটির একটি সুরক্ষাকবচ তৈরি করে, যা শরীর ঠান্ডা রাখে, পোকামাকড়ের কামড় থেকে বাঁচায় এবং পরজীবী দূর করতে সাহায্য করে। এশীয় গণ্ডারেরা চমৎকার সাঁতারুও বটে, এরা খুব সহজেই নদী পার হতে পারে। কিন্তু তাদের আফ্রিকান আত্মীয়রা সাঁতার কাটায় বেশ কাঁচা এবং গভীর পানিতে ডুবেও যেতে পারে–তাই শরীর ঠান্ডা রাখতে এরা মূলত কাদায় পড়ে থাকাকেই বেছে নেয়।
১০. গণ্ডাররা চরম হুমকির মুখে
২০০৮ সাল থেকে গণ্ডার শিকারের সংকট বাড়তে শুরু করে এবং ২০১৫ সালে আফ্রিকা জুড়ে সর্বোচ্চ ১,৩৪৯টি গণ্ডার অবৈধভাবে হত্যা করা হয়। নিবেদিত সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ফলে শিকারের সংখ্যা কিছুটা কমলেও হুমকি এখনো মারাত্মক। ২০২২ সালে আফ্রিকা জুড়ে ৪৪৮টি গণ্ডার অবৈধভাবে মারা হয়েছে–যার অর্থ প্রতিদিন একের বেশি গণ্ডার হত্যা! চোরাশিকারি চক্রগুলো এখন আরও আধুনিক হয়ে উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে গণ্ডারের অবস্থান শনাক্ত করতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয় এবং বন্দুক বা ড্রাগের শট দিয়ে গণ্ডারগুলোকে কাবু করার পর চেইনস' (Chainsaw) দিয়ে তাদের শিং কেটে উড়োজাহাজে করে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রমাণিত কোনো ভেষজ গুণ না থাকা সত্ত্বেও এশীয় ঐতিহ্যবাহী ওষুধে ক্যান্সার থেকে শুরু করে হ্যাংওভার কাটানো সহ নানা রোগের চিকিৎসায় গণ্ডারের গুঁড়ো শিং ব্যবহার করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে ভিয়েতনামে এই শিংকে আভিজাত্য বা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও গণ্য করা হচ্ছে। মানব জনসংখ্যা ও অবকাঠামোর প্রসারের ফলে গণ্ডারের আবাসন ধ্বংস ও জনসংখ্যা খণ্ডিত হওয়াও এদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সাথে জলবায়ু পরিবর্তন এবং খরা ও বন্যার মতো চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগও প্রাণীটির অস্তিত্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
আজকের এই বিশেষ দিনে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতার কথা বলাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন চোরাশিকারীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কঠোর পদক্ষেপ, কুসংস্কার দূরীকরণ এবং বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল সংরক্ষণ। পৃথিবী যদি তার এই প্রাচীন প্রজাতিকে হারিয়ে ফেলে, তবে তা কেবল গণ্ডারের ক্ষতি হবে না, বরং তা হবে মানব সভ্যতার এক অপূরণীয় পরাজয়। আসুন, প্রকৃতির এই শান্ত ও দৃঢ় রাজপুত্রদের রক্ষা করতে আমরা একজোটে আওয়াজ তুলি। সূত্র: সংবাদ
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে