হতাশা থেকে সবুজ সাম্রাজ্য, সুমির ছাদবাগানে সাড়ে ৩ হাজার গাছ

আপলোড সময় : ১৯-০৯-২০২৬ ০২:৫৯:৩৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৯-০৯-২০২৬ ০২:৫৯:৩৩ অপরাহ্ন
 হতাশা আর একাকিত্ব কাটাতে ভাড়া বাসার ছাদে কয়েকটি গাছ লাগিয়েছিলেন বাগেরহাটের মোংলার নারী উদ্যোক্তা মুর্শিদা সুমি আলী। তখন ভাবেননি, শখের সেই বাগান একদিন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। সাত বছর পর সেই ছোট্ট বাগান পরিণত হয়েছে বিশাল এক সবুজ সাম্রাজ্যে। বাড়ির আঙিনা, সিঁড়ি, বারান্দা থেকে ছাদ—সবখানেই সবুজের সমারোহ। দেশি-বিদেশি মিলিয়ে তার সংগ্রহে রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার গাছ।

এই বাগান এখন সুমির পরিচয় ও আয়ের উৎস। অনলাইনে গাছ ও চারা বিক্রি করে মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। ছাদবাগান করে পেয়েছেন পুরস্কার ও স্বীকৃতি।

উপজেলার দিগরাজ এলাকায় সুমীর বাড়িতে ঢুকলেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক দৃশ্য। বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন গাছের দখলে। কোথাও বাহারি ফুল, কোথাও ফলজ গাছ, আবার কোথাও বনজ, ঔষধি ও মসলা জাতীয় গাছ। বাড়ির ছাদজুড়ে তৈরি হয়েছে সবুজের ছাউনি।

সুমি বললেন, ‘বাগান করার শুরুটা আসলে ব্যবসার জন্য ছিল না। নিজের হতাশা ও একাকিত্ব দূর করার জন্যই কয়েকটি গাছ লাগিয়েছিলাম। ধীরে ধীরে গাছের সঙ্গে একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। এখন প্রতিদিন গাছের পরিচর্যা না করলে মনে হয় দিনটাই অসম্পূর্ণ থেকে গেল। এই বাগান আমাকে মানসিক শান্তি দিয়েছে, পাশাপাশি স্বাবলম্বীও করেছে।’

তিনি জানান, করোনাকালে ভাড়া বাসায় গাছের সংখ্যা এতটাই বেড়ে যায় যে বাগানটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। গাছগুলোকে বাঁচাতেই ভাড়া বাসা ছেড়ে মোংলায় চলে আসেন সুমি। নিজের নির্মাণাধীন বাড়িকে ঘিরেই শুরু করেন নতুন করে বাগান তৈরির কাজ।

বাড়ির আঙিনা, সিঁড়ি, বারান্দা ও ছাদ—কোনো জায়গাই বাদ দেননি। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বিশাল এই বাগান।

তার বাগানের অন্যতম আকর্ষণ অর্কিড। ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা প্রায় ৩৬০ ধরনের অর্কিড রয়েছে তার কাছে।

উপকূলীয় মোংলায় এত বড় বাগান গড়ে তোলা সহজ নয়। লবণাক্ততা, অতিরিক্ত তাপ, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং পানির সংকট মোকাবিলা করেই বাগানটি ধরে রেখেছেন সুমি।

তিনি মন্তব্য করেন, গাছের টানে শহরের জীবন ছেড়ে মোংলায় নতুন করে ছাদবাগান শুরু করেছি। এখানে কাজটা খুবই চ্যালেঞ্জিং। বৃষ্টির পানি পুকুরে সংরক্ষণ করে বাগানে ব্যবহার করি। এটিই আমাদের প্রধান পানির উৎস। মাঝে মাঝে পানি কিনতে হয়।

তিনি জানিয়েছেন, শাকসবজি থেকে শুরু করে ফুল, ফল, বনজ, ঔষধি, মসলা ও বিরল প্রজাতির বিভিন্ন গাছ রয়েছে তার বাগানে। ভবিষ্যতে বাড়ির চারপাশজুড়ে আরও বড় পরিসরে সবুজায়নের স্বপ্ন দেখেন তিনি। 

সুমীর বাগান এখন স্থানীয়দের কাছেও পরিচিত। কেউ ভালোবেসে বাড়িটির নাম দিয়েছেন ‘বাগান বাড়ি’, কেউ বলেন ‘গাছ বাড়ি’। দূর-দূরান্ত থেকে গাছপ্রেমীরা এখানে আসেন। অনেকে নিজের বাড়িতে বাগান করার পরামর্শও নেন সুমীর কাছ থেকে।

স্থানীয় বাসিন্দা ইমন খান বললেন, ‘দূর থেকে দেখলে মনে হয় পুরো বাড়িটাই যেন একটা বাগান। যেদিকেই তাকাবেন, শুধু গাছ আর গাছ। ওপরে গাছের ছাউনি তৈরি হয়েছে। আমরা প্রায়ই এখানে আসি। মোংলায় এমন একটি বাগান আছে, যা আমাদের জন্য গর্বের।’

আরেক বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, মোংলার মতো এলাকায় এত বড় ও বৈচিত্র্যময় বাগান সত্যিই ব্যতিক্রমী। সুমীর বাগান দেখে তাদের মধ্যেও গাছ লাগানোর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ছাদকে কীভাবে সবুজ করা যায়, তার সুন্দর উদাহরণ এটি।

সাড়ে তিন হাজার গাছের পরিচর্যা একা করা সম্ভব নয়। পরিবারের সদস্যরাও ভাগ করে নিয়েছেন বিভিন্ন দায়িত্ব। কেউ গাছে পানি দেন, কেউ পরিচর্যা করেন, আবার কেউ অনলাইনে গাছ বিক্রির কাজে সহযোগিতা করেন।

বাগানের দেখাশোনায় সহযোগিতা করা সাদিয়া সুলতানা নীলা উল্লেখ করেন, বাসার কাজের পাশাপাশি বাগানের কাজও দেখতে হয়। সকালে বাসার কাজ দ্রুত শেষ করে বাগানের কাজ করি। অনেক সময় পুরো দিনই বাগানের কাজে লেগে যায়। রাতেও কাজ করতে হয়। গাছে পানি দেওয়া, কখন কী লাগবে, কোন গাছের কী পরিচর্যা দরকার—সবকিছুই নিয়মিত দেখতে হয়।

সুমীর ছেলে বললেন, ‘আম্মু অনেক পরিশ্রম করে এই বাগান গড়ে তুলেছেন। আমিও তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করি। স্থানীয়ভাবে ও অনলাইনে গাছ বিক্রির পাশাপাশি দেশের বাইরেও গাছ বিক্রির জন্য যোগাযোগ ও মার্কেটিংয়ের কাজে সহযোগিতা করি। বিভিন্ন গাছের বাজার বিশ্লেষণ করেও তাকে সহযোগিতা করি।’

বাগেরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন জানান, উপকূলীয় এলাকায় ছাদবাগান করতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যেও মুর্শিদা সুমি যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে বাগানটি ধরে রেখেছেন, তা প্রশংসনীয়। এ ধরনের উদ্যোগ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি অন্যদেরও ছাদ ও আঙিনায় গাছ লাগাতে উৎসাহিত করবে।

এ বিষয়ে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।

সুমির স্বপ্ন এখন আরও বড়। নিজের বাড়ির গণ্ডি পেরিয়ে গাছপ্রেমীদের জন্য একটি বড় সবুজ পরিসর তৈরি করতে চান তিনি। অন্যদেরও গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতে চান।

হতাশা কাটাতে গাছের আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই গাছই বদলে দিয়েছে তার জীবন। শখের সেই বাগান এখন তার পরিচয়, কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী হওয়ার পথ। মোংলার ‘বাগান বাড়ি’ তাই শুধু সাড়ে তিন হাজার গাছের সমাহার নয়—এটি একজন নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :