গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকা থেকে গলেছে ১২.৫ ট্রিলিয়ন টন বরফ

আপলোড সময় : ১৭-০৯-২০২৬ ০৩:৪০:৩৪ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৭-০৯-২০২৬ ০৩:৪০:৩৪ অপরাহ্ন
গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকা থেকে গত ৪৭ বছরে ১২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন টন বরফ গলেছে। এই বরফ গলে যে পরিমাণ পানি তৈরি হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডজুড়ে প্রায় ৫ ফুট বা ১ দশমিক ৫ মিটার গভীর পানির স্তর তৈরি করতে পারত। বরফ গলার কারণে ১৯৭৯ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ১ সেন্টিমিটার।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সায়েন্টিফিক ডেটা সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষকেরা বলছেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের দুই প্রধান বরফভূমি থেকে বরফ হারানোর হারও বাড়ছে। এর বড় অংশের জন্য উষ্ণ বাতাস দায়ী নয়। উষ্ণ সমুদ্রের পানি বরফের নিচ ও পাশের অংশ ক্ষয় করায় হিমবাহ দ্রুত সাগরের দিকে চলে যাচ্ছে।

গবেষণার প্রধান লেখক ইনেস ওতোসাকা বলেন, ১৯৭০, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফের পরিমাণ তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। এরপর বরফ গলার হার বাড়তে শুরু করে। ২০১০-এর দশকে এই প্রবণতা আরো স্পষ্ট হয়।

গবেষণার সহলেখক ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আরভাইনের বরফবিজ্ঞানী এরিক রিগনট বলেন, বরফভূমিগুলো দ্রুত গলে যাচ্ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এতে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর ঝুঁকিও বাড়বে।

গবেষণার হিসাবে, ১৯৭৯ সাল থেকে গলে যাওয়া বরফের পরিমাণ প্রায় ৩ কোয়াড্রিলিয়ন গ্যালন বা ১১ দশমিক ৩ কোয়াড্রিলিয়ন লিটার পানির সমান। এর প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে ৩ দশমিক ১ সেন্টিমিটার। এর বাইরে জলবায়ু পরিবর্তনের আরো কয়েকটি কারণ সমুদ্রের উচ্চতা বাড়াচ্ছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের এই বৃদ্ধি যে মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে, তা বোঝাতে গবেষণার প্রধান লেখক ওতোসাকা বলেন, প্রতি এক সেন্টিমিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে বছরে অন্তত একবার বন্যার পানিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন আরো ২০ থেকে ৩০ লাখ মানুষ।

গ্রিনল্যান্ডের জ্যাকবশাভন হিমবাহের দ্রুত পশ্চাদপসরণও গবেষকদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ওতোসাকার হিসাবে, হিমবাহটি এখন দিনে সর্বোচ্চ ১৬৪ ফুট বা ৫০ মিটার পর্যন্ত পিছিয়ে যাচ্ছে।

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক একদল মেরু অঞ্চলের বিজ্ঞানী গবেষণাটি করেছেন। আগে তারা মূলত ১৯৯০-এর দশক থেকে উপগ্রহের তথ্য ব্যবহার করতেন। এবার নাসার উপগ্রহের তথ্যও যুক্ত করা হয়েছে। এতে অ্যান্টার্কটিকার বরফের পরিবর্তন ১৯৭৯ সাল এবং গ্রিনল্যান্ডের ১৯৭২ সাল পর্যন্ত পর্যালোচনা করা সম্ভব হয়েছে।

গবেষকেরা ৪৫টি স্বতন্ত্র জরিপ ও ২৭টি উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এতে দেখা গেছে, দশক থেকে দশকে বরফ হারানোর হার বাড়ছে। বিশেষ করে সাগরে বরফ চলে যাওয়ার হার দ্রুত বেড়েছে।

২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বরফ গলার এই দ্রুত প্রবণতায় সাময়িক বিরতি দেখা গিয়েছিল। তবে গবেষকেরা বলছেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়। স্বল্পমেয়াদি আবহাওয়াগত পরিবর্তনের কারণে ওই বিরতি দেখা যায়। গবেষণার তথ্য ২০২৩ সাল পর্যন্ত হলেও পরবর্তী পরিমাপেও বরফ গলার হার আবার বাড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অ্যান্টার্কটিকার পূর্বাঞ্চলে ওই সময়ে রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাত হয়েছিল। এতে তুলনামূলক স্থিতিশীল পূর্ব অ্যান্টার্কটিকা পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার দ্রুত বরফ গলার ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দেয়। রিগনট বলেন, তিন বছরের ওই বিরতি ছিল সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ কমার প্রবণতা স্পষ্ট।

তবে বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু ধীরে ধীরে বরফ গলা নয়। বরফভূমির ভেতরে দ্রুত ও সক্রিয় পরিবর্তনও ঘটছে। গবেষকেরা বলছেন, এই ধরনের পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে আকস্মিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির বরফবিজ্ঞানী ডেভিড হল্যান্ড বলেন, বরফ হারানোর বড় অংশই এই সক্রিয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হচ্ছে। বরফভূমির স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনার ক্ষেত্রে এটি উদ্বেগের বিষয়। গবেষণায় তিনি যুক্ত ছিলেন না।

নর্থামব্রিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক অ্যান্ড্রু শেফার্ড বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব কয়েক দশক পরও অব্যাহত থাকতে পারে। এমনকি পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ানো বন্ধ করা গেলেও বরফ গলার এই পরিবর্তন আরো কয়েক দশক চলতে পারে।

কলোরাডো ইউনিভার্সিটির বরফবিজ্ঞানী টেড স্ক্যামবসও সতর্ক করেছেন। তার মতে, অ্যান্টার্কটিকার বরফ হারানোর অনিশ্চিত বিষয়গুলো ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এর প্রভাব কয়েক দশক পর স্পষ্ট হলেও এটি মানবসমাজের জন্য বড় হুমকি তৈরি করতে পারে।

বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :