গরুর গোবর একসময় ছিল গ্রামের বাড়ির কাছে পড়ে থাকা নিছক বর্জ্য। সেই গোবরই এখন হয়ে উঠেছে রান্নার জ্বালানি, আবার একই সঙ্গে মিলছে জৈব সার। বগুড়ার ১২ উপজেলায় ৪০৮টি বায়োগ্যাস প্লান্টে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ জীবনের চিত্র। প্রতিদিন এসব প্লান্টে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৬২ হাজার ঘনফুট গ্যাস, সঙ্গে হাজার হাজার কেজি জৈব সার। ফলে কমছে কাঠ ও এলপিজির ওপর নির্ভরতা, আর কৃষিজমিতে বাড়ছে জৈব সারের ব্যবহার।
বর্তমান প্রযুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি ও কৃষি উৎপাদনের সম্পদে পরিণত হয়ে উঠেছে গরুর গোবর। এই গোবর থেকে সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহযোগিতা ও ঋণের মাধ্যমে বগুড়ার প্রত্যন্ত এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে বায়োগ্যাস প্রযুক্তি।
জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় ইতোমধ্যে ৪০৮টি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দাবি, সারা দেশের মধ্যে বগুড়াতেই সবচেয়ে বেশি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন হয়েছে। এসব প্লান্ট থেকে রান্নার গ্যাসের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ জৈব সারও উৎপাদিত হচ্ছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহাবুদ্দিন সরদার বলেন, বগুড়া জেলায় ইতোমধ্যে ৪০৮টি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। সারা বাংলাদেশের যেকোনো জেলার তুলনায় এ সংখ্যা সর্বোচ্চ বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, এসব বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে গ্রামীণ পরিবারের নারী সদস্যরা ব্যয়সাশ্রয়ী, স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদভাবে জ্বালানির চাহিদা পূরণ করতে পারছেন। একই সঙ্গে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির বর্জ্য ব্যবস্থাপনারও একটি কার্যকর সমাধান হচ্ছে।
শাহাবুদ্দিন সরদার বলেন, কোনো খামারির তিনটি গরু অথবা ৫০০টি মুরগি থাকলেও তিনি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি স্বল্প সার্ভিস চার্জে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
গোবর থেকে রান্নার গ্যাস, সঙ্গে জৈব সার বায়োগ্যাস প্লান্টে নির্দিষ্ট পরিমাণ গোবর ও পানি ডাইজেস্টারে দেওয়া হয়। বায়ুশূন্য পরিবেশে জৈব বর্জ্য পচনের মাধ্যমে মিথেনসমৃদ্ধ গ্যাস তৈরি হয়। পরে পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই গ্যাস পৌঁছে দেওয়া হয় রান্নাঘরে। প্রয়োজন অনুযায়ী ভালভের মাধ্যমে গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
প্লান্টে গ্যাস উৎপাদনের পর অবশিষ্ট বর্জ্য থেকে তৈরি হয় জৈব সার। এই সার কৃষিজমিতে ব্যবহার করা যায়। ফলে একই সঙ্গে রান্নার জ্বালানি ও কৃষির উপকরণ পাওয়া যায়।
জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, বগুড়ার ১২ উপজেলায় বায়োগ্যাস প্রকল্পের আওতায় ৪০৮টি প্লান্ট চালু রয়েছে। এসব প্লান্ট থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬১ হাজার ৯৬০ ঘনফুট গ্যাস, ৪৭ হাজার ৬৫৩ কেজি জৈব সার এবং ১৫ হাজার ৩০০ কেজি বায়ো কেমিক্যাল উৎপাদন হচ্ছে। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ৬৪০ জনকে প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে ৫ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
বগুড়ায় এখন পর্যন্ত তিনটি বায়োগ্যাস পল্লি গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ধুনট উপজেলার পাঁচথুপী ও গোসাইবাড়ী এবং গাবতলী উপজেলার জামিরবাড়িয়া গ্রামে এসব কার্যক্রম চলছে। গাবতলীর জামিরবাড়িয়া গ্রামে ৩৬টি পরিবার নিজেদের গবাদিপশুর গোবর ব্যবহার করে রান্নার গ্যাস উৎপাদন করছে। একই প্লান্ট থেকে পাওয়া জৈব সার ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষিজমিতে।
খামারীদের ভাষ্য, আগে রান্নার জন্য কাঠ, খড়সহ বিভিন্ন জ্বালানি সংগ্রহ করতে হতো। এখন বাড়ির গরুর গোবর থেকেই তৈরি হচ্ছে গ্যাস। এতে রান্নার কাজে সময় ও অর্থ দুটিই সাশ্রয় হচ্ছে।
জামিরবাড়িয়া গ্রামের গৃহবধূ হামিলা বেগম বলেন, আগে প্রতিদিন রান্নার জন্য কাঠ ও খড় সংগ্রহ করতে হতো। এখন বায়োগ্যাস ব্যবহার করায় রান্নার কাজ অনেক সহজ হয়েছে।
একই গ্রামের উদ্যোক্তা মরিয়ম খাতুন বলেন, আগে গরুর গোবরের তেমন কোনো ব্যবহার ছিল না। এখন সেই গোবর থেকেই গ্যাস তৈরি হচ্ছে। আবার প্লান্ট থেকে পাওয়া জৈব সার জমিতে ব্যবহার করে ভালো ফলনও পাওয়া যাচ্ছে।
ধুনটে সমন্বিত গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগেও বায়োগ্যাস কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় প্রায় ৮০ থেকে ১০০টি প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে প্লান্ট স্থাপনে কারিগরি সহযোগিতা, মিস্ত্রি ও আনুষঙ্গিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্লান্ট স্থাপনের পর পাঁচ বছর পর্যন্ত তা দেখভালের ব্যবস্থাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
সমন্বিত গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার মাঠকর্মী সোহেল বলেন, গত দুই বছরে সারা দেশে প্রায় দুই হাজার বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। ২১টি জেলায় আমাদের কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে বগুড়ার ধুনট উপজেলায় প্রায় ৮০ থেকে ১০০টি প্লান্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের কর্মীরা প্রতি মাসে প্লান্টগুলো পরিদর্শন করেন। পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি দেওয়া আছে। কোনো সমস্যা হলে গ্রাহক ফোন করলেই আমাদের কর্মীরা সেখানে যান। প্লান্ট থেকে বায়োগ্যাসের পাশাপাশি জৈব সারও পাওয়া যায়। জমিতে এই সার ব্যবহার করলে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, প্লান্ট স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় রড, সিমেন্টসহ কাঁচামালের ব্যবস্থা করা হয়। আমরা মিস্ত্রি নিয়ে গিয়ে প্লান্ট তৈরি ও সেটিংস করে দিই।
ধুনটের বায়োগ্যাসের সুবিধাভোগী সাজেদা বেগম বলেন, আমরা অনেক সুবিধা পাই। খড়ি থেকে বাঁচায়, অনেক সাশ্রয় হয়। ধোঁয়া লাগে না, রান্না করতে সুবিধা হয়। হাঁড়িতে কালি পড়ে না। দুই বছর আগে নিয়েছি। আগে মাসে দুটি সিলিন্ডার লাগত, এখন লাগে না। এতে আমাদের অনেক সুবিধা হচ্ছে।
ধুনটের আরেক সুবিধাভোগী ও গরুর খামারি রবিউল ইসলাম পেশায় একজন নন এমপিও শিক্ষক। তার খামারে রয়েছে পাঁচটি গরু। সমন্বিত গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে তিনি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করেন।
রবিউল ইসলাম বলেন, আমি গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার কাছ থেকে বায়োগ্যাস সম্পর্কে জানতে পারি। পরে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমার পাঁচটি গরু আছে এবং খামার রয়েছে। তারা এসে খামার পরিদর্শন করে আমাকে বায়োগ্যাস সম্পর্কে আরও উৎসাহিত করেন।
তিনি বলেন, প্লান্ট স্থাপনের জন্য আমি শুধু ইট, বালি ও সিমেন্টের ব্যবস্থা করেছি। সংস্থাটি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে প্লান্ট স্থাপন করে দেয়। প্রায় দুই বছর ধরে আমি এই বায়োগ্যাস ব্যবহার করছি। এই সময়ে আমাকে কখনো খড়ি দিয়ে রান্না করতে হয়নি, সিলিন্ডারও কিনতে হয়নি। পরিবারের সব রান্না এই বায়োগ্যাস দিয়েই হচ্ছে।
রবিউল ইসলাম আরও বলেন, বায়োগ্যাস প্লান্টের বর্জ্য কৃষিজমিতে ব্যবহার করছি। এতে অনেক লাভবান হচ্ছি। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারও অনেক কমাতে পারছি। বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে আমার পরিবারের সচ্ছলতা বাড়াতে সক্ষম হয়েছি।
দেশে দীর্ঘদিন ধরেই প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট রয়েছে। আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ সীমিত থাকার পাশাপাশি শিল্পকারখানাগুলোতেও প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ নিয়ে সংকট রয়েছে। চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্যদিকে অনেক পরিবারের জন্য এলপিজির ব্যয়ও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এ অবস্থায় গবাদিপশু পালন বেশি এমন গ্রামীণ এলাকায় রান্নার জ্বালানি হিসেবে বায়োগ্যাসের গুরুত্ব বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বায়োগ্যাসকে বিবেচনা করার সুযোগ না থাকলেও গ্রামীণ পরিবারের জন্য এটি কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প হতে পারে। এর মাধ্যমে এলপিজির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানির পাশাপাশি ফিরছে জমির প্রাণ:
বায়োগ্যাসের অন্যতম বড় সুবিধা হলো, গ্যাস উৎপাদনের পর অবশিষ্ট অংশ থেকে জৈব সার পাওয়া যায়। কৃষিজমিতে এই সার ব্যবহারের ফলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব বলে কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহাবুদ্দিন সরদার বলেন, গরু, ছাগল, হাঁস মুরগির বর্জ্য কাজে লাগিয়ে একদিকে জ্বালানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে সেই বর্জ্য থেকেই জৈব সার উৎপাদিত হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যসম্মত ফসল উৎপাদনে সহযোগিতা করার পাশাপাশি কৃষকের সারের পেছনে ব্যয়ও কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, আমরা বগুড়া জেলার খামারিদের আহ্বান জানাচ্ছি কারও তিনটি গরু অথবা ৫০০টি মুরগি থাকলে তিনি উপজেলা বা জেলা উপপরিচালকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে পারেন। আমাদের মাধ্যমে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি স্বল্প সার্ভিস চার্জে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
সংকটের সময়ে সম্ভাবনার নতুন দরজা:
প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট কিংবা এলপিজির বাড়তি খরচ কোনোটিরই একক সমাধান নয় বায়োগ্যাস। তবে যেখানে গরু আছে, সেখানে গোবর আছে, আর সেই গোবরকে প্রযুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি ও সারে রূপান্তর করা সম্ভব।
বগুড়ার গ্রামগুলোতে গড়ে ওঠা বায়োগ্যাস পল্লিগুলো সেই সম্ভাবনারই বাস্তব উদাহরণ। রান্নার চুলা থেকে কৃষিজমি একটি প্লান্টের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পরিবারের অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবেশে। জ্বালানি সংকটের সময়ে তাই গ্রামের ছোট ছোট বায়োগ্যাস প্লান্ট দেখাচ্ছে বড় এক সম্ভাবনার পথ। বর্জ্য নয়, গোবরও হতে পারে সম্পদ।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
বর্তমান প্রযুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি ও কৃষি উৎপাদনের সম্পদে পরিণত হয়ে উঠেছে গরুর গোবর। এই গোবর থেকে সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহযোগিতা ও ঋণের মাধ্যমে বগুড়ার প্রত্যন্ত এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে বায়োগ্যাস প্রযুক্তি।
জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় ইতোমধ্যে ৪০৮টি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দাবি, সারা দেশের মধ্যে বগুড়াতেই সবচেয়ে বেশি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন হয়েছে। এসব প্লান্ট থেকে রান্নার গ্যাসের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ জৈব সারও উৎপাদিত হচ্ছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহাবুদ্দিন সরদার বলেন, বগুড়া জেলায় ইতোমধ্যে ৪০৮টি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। সারা বাংলাদেশের যেকোনো জেলার তুলনায় এ সংখ্যা সর্বোচ্চ বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, এসব বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে গ্রামীণ পরিবারের নারী সদস্যরা ব্যয়সাশ্রয়ী, স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদভাবে জ্বালানির চাহিদা পূরণ করতে পারছেন। একই সঙ্গে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির বর্জ্য ব্যবস্থাপনারও একটি কার্যকর সমাধান হচ্ছে।
শাহাবুদ্দিন সরদার বলেন, কোনো খামারির তিনটি গরু অথবা ৫০০টি মুরগি থাকলেও তিনি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি স্বল্প সার্ভিস চার্জে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
গোবর থেকে রান্নার গ্যাস, সঙ্গে জৈব সার বায়োগ্যাস প্লান্টে নির্দিষ্ট পরিমাণ গোবর ও পানি ডাইজেস্টারে দেওয়া হয়। বায়ুশূন্য পরিবেশে জৈব বর্জ্য পচনের মাধ্যমে মিথেনসমৃদ্ধ গ্যাস তৈরি হয়। পরে পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই গ্যাস পৌঁছে দেওয়া হয় রান্নাঘরে। প্রয়োজন অনুযায়ী ভালভের মাধ্যমে গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
প্লান্টে গ্যাস উৎপাদনের পর অবশিষ্ট বর্জ্য থেকে তৈরি হয় জৈব সার। এই সার কৃষিজমিতে ব্যবহার করা যায়। ফলে একই সঙ্গে রান্নার জ্বালানি ও কৃষির উপকরণ পাওয়া যায়।
জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, বগুড়ার ১২ উপজেলায় বায়োগ্যাস প্রকল্পের আওতায় ৪০৮টি প্লান্ট চালু রয়েছে। এসব প্লান্ট থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬১ হাজার ৯৬০ ঘনফুট গ্যাস, ৪৭ হাজার ৬৫৩ কেজি জৈব সার এবং ১৫ হাজার ৩০০ কেজি বায়ো কেমিক্যাল উৎপাদন হচ্ছে। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ৬৪০ জনকে প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে ৫ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
বগুড়ায় এখন পর্যন্ত তিনটি বায়োগ্যাস পল্লি গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ধুনট উপজেলার পাঁচথুপী ও গোসাইবাড়ী এবং গাবতলী উপজেলার জামিরবাড়িয়া গ্রামে এসব কার্যক্রম চলছে। গাবতলীর জামিরবাড়িয়া গ্রামে ৩৬টি পরিবার নিজেদের গবাদিপশুর গোবর ব্যবহার করে রান্নার গ্যাস উৎপাদন করছে। একই প্লান্ট থেকে পাওয়া জৈব সার ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষিজমিতে।
খামারীদের ভাষ্য, আগে রান্নার জন্য কাঠ, খড়সহ বিভিন্ন জ্বালানি সংগ্রহ করতে হতো। এখন বাড়ির গরুর গোবর থেকেই তৈরি হচ্ছে গ্যাস। এতে রান্নার কাজে সময় ও অর্থ দুটিই সাশ্রয় হচ্ছে।
জামিরবাড়িয়া গ্রামের গৃহবধূ হামিলা বেগম বলেন, আগে প্রতিদিন রান্নার জন্য কাঠ ও খড় সংগ্রহ করতে হতো। এখন বায়োগ্যাস ব্যবহার করায় রান্নার কাজ অনেক সহজ হয়েছে।
একই গ্রামের উদ্যোক্তা মরিয়ম খাতুন বলেন, আগে গরুর গোবরের তেমন কোনো ব্যবহার ছিল না। এখন সেই গোবর থেকেই গ্যাস তৈরি হচ্ছে। আবার প্লান্ট থেকে পাওয়া জৈব সার জমিতে ব্যবহার করে ভালো ফলনও পাওয়া যাচ্ছে।
ধুনটে সমন্বিত গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগেও বায়োগ্যাস কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় প্রায় ৮০ থেকে ১০০টি প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে প্লান্ট স্থাপনে কারিগরি সহযোগিতা, মিস্ত্রি ও আনুষঙ্গিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্লান্ট স্থাপনের পর পাঁচ বছর পর্যন্ত তা দেখভালের ব্যবস্থাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
সমন্বিত গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার মাঠকর্মী সোহেল বলেন, গত দুই বছরে সারা দেশে প্রায় দুই হাজার বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। ২১টি জেলায় আমাদের কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে বগুড়ার ধুনট উপজেলায় প্রায় ৮০ থেকে ১০০টি প্লান্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের কর্মীরা প্রতি মাসে প্লান্টগুলো পরিদর্শন করেন। পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি দেওয়া আছে। কোনো সমস্যা হলে গ্রাহক ফোন করলেই আমাদের কর্মীরা সেখানে যান। প্লান্ট থেকে বায়োগ্যাসের পাশাপাশি জৈব সারও পাওয়া যায়। জমিতে এই সার ব্যবহার করলে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, প্লান্ট স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় রড, সিমেন্টসহ কাঁচামালের ব্যবস্থা করা হয়। আমরা মিস্ত্রি নিয়ে গিয়ে প্লান্ট তৈরি ও সেটিংস করে দিই।
ধুনটের বায়োগ্যাসের সুবিধাভোগী সাজেদা বেগম বলেন, আমরা অনেক সুবিধা পাই। খড়ি থেকে বাঁচায়, অনেক সাশ্রয় হয়। ধোঁয়া লাগে না, রান্না করতে সুবিধা হয়। হাঁড়িতে কালি পড়ে না। দুই বছর আগে নিয়েছি। আগে মাসে দুটি সিলিন্ডার লাগত, এখন লাগে না। এতে আমাদের অনেক সুবিধা হচ্ছে।
ধুনটের আরেক সুবিধাভোগী ও গরুর খামারি রবিউল ইসলাম পেশায় একজন নন এমপিও শিক্ষক। তার খামারে রয়েছে পাঁচটি গরু। সমন্বিত গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে তিনি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করেন।
রবিউল ইসলাম বলেন, আমি গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার কাছ থেকে বায়োগ্যাস সম্পর্কে জানতে পারি। পরে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমার পাঁচটি গরু আছে এবং খামার রয়েছে। তারা এসে খামার পরিদর্শন করে আমাকে বায়োগ্যাস সম্পর্কে আরও উৎসাহিত করেন।
তিনি বলেন, প্লান্ট স্থাপনের জন্য আমি শুধু ইট, বালি ও সিমেন্টের ব্যবস্থা করেছি। সংস্থাটি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে প্লান্ট স্থাপন করে দেয়। প্রায় দুই বছর ধরে আমি এই বায়োগ্যাস ব্যবহার করছি। এই সময়ে আমাকে কখনো খড়ি দিয়ে রান্না করতে হয়নি, সিলিন্ডারও কিনতে হয়নি। পরিবারের সব রান্না এই বায়োগ্যাস দিয়েই হচ্ছে।
রবিউল ইসলাম আরও বলেন, বায়োগ্যাস প্লান্টের বর্জ্য কৃষিজমিতে ব্যবহার করছি। এতে অনেক লাভবান হচ্ছি। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারও অনেক কমাতে পারছি। বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে আমার পরিবারের সচ্ছলতা বাড়াতে সক্ষম হয়েছি।
দেশে দীর্ঘদিন ধরেই প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট রয়েছে। আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ সীমিত থাকার পাশাপাশি শিল্পকারখানাগুলোতেও প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ নিয়ে সংকট রয়েছে। চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্যদিকে অনেক পরিবারের জন্য এলপিজির ব্যয়ও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এ অবস্থায় গবাদিপশু পালন বেশি এমন গ্রামীণ এলাকায় রান্নার জ্বালানি হিসেবে বায়োগ্যাসের গুরুত্ব বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বায়োগ্যাসকে বিবেচনা করার সুযোগ না থাকলেও গ্রামীণ পরিবারের জন্য এটি কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প হতে পারে। এর মাধ্যমে এলপিজির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানির পাশাপাশি ফিরছে জমির প্রাণ:
বায়োগ্যাসের অন্যতম বড় সুবিধা হলো, গ্যাস উৎপাদনের পর অবশিষ্ট অংশ থেকে জৈব সার পাওয়া যায়। কৃষিজমিতে এই সার ব্যবহারের ফলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব বলে কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহাবুদ্দিন সরদার বলেন, গরু, ছাগল, হাঁস মুরগির বর্জ্য কাজে লাগিয়ে একদিকে জ্বালানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে সেই বর্জ্য থেকেই জৈব সার উৎপাদিত হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যসম্মত ফসল উৎপাদনে সহযোগিতা করার পাশাপাশি কৃষকের সারের পেছনে ব্যয়ও কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, আমরা বগুড়া জেলার খামারিদের আহ্বান জানাচ্ছি কারও তিনটি গরু অথবা ৫০০টি মুরগি থাকলে তিনি উপজেলা বা জেলা উপপরিচালকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে পারেন। আমাদের মাধ্যমে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি স্বল্প সার্ভিস চার্জে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
সংকটের সময়ে সম্ভাবনার নতুন দরজা:
প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট কিংবা এলপিজির বাড়তি খরচ কোনোটিরই একক সমাধান নয় বায়োগ্যাস। তবে যেখানে গরু আছে, সেখানে গোবর আছে, আর সেই গোবরকে প্রযুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি ও সারে রূপান্তর করা সম্ভব।
বগুড়ার গ্রামগুলোতে গড়ে ওঠা বায়োগ্যাস পল্লিগুলো সেই সম্ভাবনারই বাস্তব উদাহরণ। রান্নার চুলা থেকে কৃষিজমি একটি প্লান্টের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পরিবারের অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবেশে। জ্বালানি সংকটের সময়ে তাই গ্রামের ছোট ছোট বায়োগ্যাস প্লান্ট দেখাচ্ছে বড় এক সম্ভাবনার পথ। বর্জ্য নয়, গোবরও হতে পারে সম্পদ।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন