হিমাগার নেই, কৃষকের স্বপ্ন ঝরে যায় মাঠেই

আপলোড সময় : ১৩-০৯-২০২৬ ০৩:১৬:৫৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৩-০৯-২০২৬ ০৩:১৬:৫৫ অপরাহ্ন
 চা-বাগানের সবুজে ঘেরা মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ। পাহাড়ি ঢাল, উর্বর মাটি আর অনুকূল আবহাওয়ায় এ অঞ্চলে বছরজুড়েই ফলমূল ও নানা জাতের মৌসুমি সবজি উৎপাদিত হয়। কিন্তু একটি হিমাগারের অভাবে হতাশ সেখানকার কৃষক।

কৃষকরা বলছেন, আলু, টমেটো, করলা, শিম, লেবু থেকে শুরু করে রসালো আনারস উৎপাদনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হচ্ছে এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি। এসব সবজি ও ফলমূল সংরক্ষনে দীর্ঘদিন ধরে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে হিমাগার স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। 

সরকারি পর্যায়ে একাধিকবার উদ্যোগ ও প্রস্তাবের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে এখনো দাবিটি পূরণ হয়নি।

ফলে মৌসুমে বাজারে সরবরাহ বাড়লে হঠাৎ দাম কমে যায়। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় পচে যাওয়ার আশঙ্কায় কৃষকদের অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ফসল বিক্রি করতে হয়।

কমলগঞ্জের আদমপুর, মাধবপুর, আলীনগর,ইসলামপুর, রহিমপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রচুর পরিমাণে সবজি ও ফলমূল উৎপাদিত হয়। একইভাবে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায়ও কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে কৃষিপণ্য উৎপাদন করছেন।

কমলগঞ্জের স্থানীয় টমেটোচাষি আব্দুল মতিন বলেন, ‘হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ফসল ফলাই। কিন্তু সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় বাজারে দাম কমে গেলে কিছু করার থাকে না। একটা হিমাগার থাকলে ফসল রেখে পরে ভালো দামে বিক্রি করতে পারতাম।’

আরেক চাষি করিম মিয়ার ভাষ্য, মৌসুমে একসঙ্গে অনেক টমেটো বাজারে আসে। তখন দাম পড়ে যায়। হিমাগার থাকলে সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি না করে কিছুদিন সংরক্ষণ করা যেত। এতে কৃষকও ন্যায্য দাম পেতেন।

শুধু সবজি ও ফলমূল নয়, হিমাগারের অভাবে আলুচাষিরাও বিপাকে রয়েছেন। তাদের অভিযোগ, উৎপাদিত আলুবীজ সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় প্রতি মৌসুমে অন্য জেলা থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ে, তেমনি বাইরের বাজারের ওপর নির্ভরশীলতাও তৈরি হয়।

কৃষকদের মতে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আলু সংরক্ষণ করা গেলে তা পরবর্তী মৌসুমে বীজ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বাজারে যখন দাম কম থাকে, তখন আলু সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ভালো দামে বিক্রি করা যাবে। এতে কৃষকের লোকসানের ঝুঁকিও কমবে।

কৃষিপণ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সময়ের সঙ্গে এর মূল্য দ্রুত কমে যেতে পারে। বিশেষ করে টমেটো, করলা, শিমসহ নরম ও পচনশীল সবজির ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরো বেশি। পরিবহন ও সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকলে উৎপাদনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই এসব পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হতে শুরু করে।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য না থাকায় উৎপাদনের মৌসুমে মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকারদের ওপর নির্ভর করে পণ্য বিক্রি করতে হয়। হিমাগার থাকলে কৃষকের হাতে কিছুটা সময় থাকবে; তখন বাজারদর বুঝে পণ্য বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে হিমাগার নির্মাণের বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। সম্ভাব্য জায়গা নির্বাচন এবং প্রস্তাব পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নানা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আটকে থাকা সেই উদ্যোগ এখনও বাস্তবে রূপ নেয়নি।

কৃষকদের মতে, হিমাগার শুধু কৃষিপণ্য সংরক্ষণের স্থাপনা নয়; এটি কৃষকের উৎপাদন, বাজার ও আয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। সরকারি উদ্যোগে আধুনিক হিমাগার স্থাপন করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমার পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

একটি হিমাগার নির্মিত হলে কৃষক শুধু ফসল সংরক্ষণের সুযোগই পাবে না, বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভালো দাম পাওয়ার সুযোগও সৃষ্টি হবে। কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, কৃষকের লোকসান কমবে এবং স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হতে পারে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘লেবু, আনারস ও মৌসুমি সবজি নষ্ট হয়ে কৃষক  ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। এরইমধ্যে শ্রীমঙ্গলে একটি হিমাগার স্থাপনের জন্য ঊর্ধ্বতন মন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘এই অঞ্চলের কৃষকদের জন্য একটি হিমাগার অত্যন্ত প্রয়োজন। বিষয়টি আমি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তারা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন বলে জানিয়েছেন।’

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, ‘কমলগঞ্জে একটি হিমাগার স্থাপনের জন্য বেশ কিছুদিন আগেই জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘কৃষকদের স্বার্থে মৌলভীবাজারে একটি হিমাগার স্থাপনের বিষয়ে আমরা বিভিন্ন ফোরামে সব সময় কথা বলে আসছি। এটি স্থাপন করা গেলে কৃষকদের জন্য অনেক উপকার হবে।’ 
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 
 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :