প্রাণঘাতী বন্যা ও হিমবাহ ধসের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’ এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে নেপাল। দেশটির দাবি, যে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট সৃষ্টিতে তাদের ভূমিকা প্রায় নেই বললেই চলে, সেই সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্য দিতে হচ্ছে নেপালের মানুষকে।
গত ২৬ আগস্ট নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে একটি হিমবাহের অংশ ধসে পড়ার পর ভয়াবহ পানি ও কাদার ঢল নেমে আসে। এতে নেপালের রাসুওয়া ও নুওয়াকোট অঞ্চল এবং চীনের তিব্বত অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এক হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ।
এই বিপর্যয়ের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। নেপাল সরকারের ভাষ্য, এমন দুর্যোগের জন্য দায়ী নয় এমন একটি দেশ হয়েও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে তাদের।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল গত সপ্তাহে বলেন, ‘‘যে বৈশ্বিক সংকট আমরা সৃষ্টি করিনি, তার চূড়ান্ত মূল্য আমাদের দিতে হচ্ছে।’’
বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, নেপালকে দেওয়া সহায়তাকে দান বা মানবিক সাহায্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটিকে জলবায়ু ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে হবে।
জাতিসংঘের কাছে দুই কোটি ডলার দাবি
সোমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নেপালের প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেলও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি একই ধরনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ নেপালসহ বিভিন্ন দেশের কণ্ঠস্বর শুধু শোনাই যথেষ্ট নয়; তাদের জন্য জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ও বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
এরই মধ্যে নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে জাতিসংঘের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় গঠিত জাতিসংঘের ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ থেকে দুই কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়েছে কাঠমান্ডু।
২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির কাঠামোর আলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার জন্য ২০২২ সালে এই তহবিল গঠন করা হয়।
তবে তহবিলটির নিজস্ব আর্থিক সংকটও রয়েছে। প্রথম দফার জলবায়ু পুনরুদ্ধার প্রকল্প অনুমোদনের প্রস্তুতির মধ্যেই জাতিসংঘের এই তহবিলে প্রায় ২৮০ কোটি ডলারের অর্থঘাটতি রয়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নে সামান্য ভূমিকা, ক্ষতির ভার বিপুল
নেপালের দাবি যে পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়, তার পক্ষে যথেষ্ট তথ্য রয়েছে। দেশটি বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কমের জন্য দায়ী। দেশটির অধিকাংশ বিদ্যুৎও উৎপাদিত হয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে।
কিন্তু হিমালয় অঞ্চলে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নেপাল জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।
গত কয়েক দশকে হিমালয় অঞ্চলে দ্রুত উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং হিমবাহ গলার হার বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও পাকিস্তানজুড়ে বিস্তৃত হিন্দুকুশ-হিমালয় পর্বতমালার হিমবাহগুলো ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে বরফ হারিয়েছে।
জাতিসংঘের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে প্রায় তিন দশকে নেপালের হিমবাহগুলো তাদের বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। বিশ্বের দুই বৃহৎ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত নেপাল এ কারণে বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
নেপালজুড়ে ক্ষোভ ও হতাশা
নেপালভিত্তিক জলবায়ু আন্দোলনকর্মী ও আইনজীবী তনুজা পান্ডে বলেন, জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি ঘিরে দেশটির মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্মিলিত ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে।
তার ভাষায়, জলবায়ু বিপর্যয় এমন পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত বিশ্ব সাধারণত নেপালের দিকে নজর দেয় না, যখন সেটি আর উপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না।
তিনি বলেন, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক শিরোনাম হলেও শেষ পর্যন্ত সেই মানবিক দুর্ভোগ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ তৈরি করতে পারে না। এ বিষয়টি নেপালের মানুষের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
২৮ বছর বয়সী নেপালি জলবায়ু আন্দোলনকর্মী শ্রেয়া কেসির বাড়ি পূর্ব নেপালের সোলুখুম্বু এলাকায়। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টও এই অঞ্চলে অবস্থিত।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক হিমবাহ ধসের পর তার এলাকার মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন যে, হিমালয় দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা এবং হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার কারণে এমন বিপর্যয় এখন নেপালের যেকোনও অঞ্চলে ঘটতে পারে।
শ্রেয়া কেসি জানান, নেপালে জলবিদ্যুৎ, বন সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সচেতনতা নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পে তিনি নিজেও কাজ করেছেন। তার অভিযোগ, অন্য দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নেপালের মানুষ।
তার কথায়, ‘‘যে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নেপাল দায়ী নয়, তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছি আমরা। তাই মানুষ এখন ন্যায়বিচার চায়।’’
জলবায়ু ন্যায়বিচার কী?
প্রাথমিক হিসাবে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বন্যায় দেশটির সম্পদ, আবাসন ও অবকাঠামো খাতে প্রায় ২৫৬ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
তবে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’-এর ভিত্তিতে আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষতিপূরণ আদায় সহজ হবে না বলে মনে করছেন নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও উন্নয়নবিষয়ক অধ্যাপক জোইতা গুপ্তা।
জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, জলবায়ু ন্যায়বিচার হলো এমন একটি নৈতিক ও নীতিগত ধারণা, যার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর পড়া অসম ও অতিরিক্ত প্রভাব মোকাবিলার চেষ্টা করা হয়।
অধ্যাপক গুপ্তা বলেন, নেপালের মতো স্বল্প নিঃসরণকারী দেশ যদি এমন একটি জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায়, যা তারা নিজেরা সৃষ্টি করেনি, তাহলে জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি জানানোর যথেষ্ট নৈতিক ভিত্তি তাদের রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবতায় ক্ষতিপূরণ আদায়ের পথ জটিল।
১৯৯০ সালের আগে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বড় দূষণকারী দেশগুলোর পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তিগুলোতে ‘ক্ষতিপূরণ’ শব্দটি গুরুত্ব হারায়। এর পরিবর্তে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পায়।
আইসিজের মতামত নতুন আশা দেখাচ্ছে
২০২৫ সালের জুলাইয়ে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দেওয়া এক পরামর্শমূলক মতামতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা আইসিজে বলেছে, উল্লেখযোগ্য জলবায়ু ক্ষতি প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সব দেশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
আদালতের ওই মতামতে আরও বলা হয়, কোনও রাষ্ট্র যদি তার আন্তর্জাতিক জলবায়ু সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ পূর্ণ প্রতিকার দিতে তাদের বাধ্য করা যেতে পারে।
যদিও আইসিজের এই পরামর্শমূলক মতামত সরাসরি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবুও এটি নেপালের জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবিকে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মধ্যে নতুন ভিত্তি দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘে জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি
নেপালের র্যাপার থেকে রাজনীতিক হওয়া প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ আগামী ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন তিনি।
ধারণা করা হচ্ছে, তার ভাষণের অন্যতম প্রধান বিষয় হবে নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক দাবি।
তবে জলবায়ু আন্দোলনকর্মীদের মতে, শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এখন যথেষ্ট নয়। নেপালের প্রয়োজন সরাসরি অর্থায়ন।
শ্রেয়া কেসি বলেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং দেশের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করা অর্থের একটি বড় অংশ এখন জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যয় করতে হচ্ছে।
তার মতে, বিশেষ করে উন্নত ও উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোকে জাতিসংঘের লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আরও বেশি অর্থ দিতে হবে। সেই অর্থ ঋণ হিসেবে নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া উচিত।
অভ্যন্তরীণ ন্যায়বিচার ছাড়া জলবায়ু ন্যায়বিচার নয়
তবে আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ দাবির পাশাপাশি নেপালের অভ্যন্তরীণ নীতি ও উন্নয়ন কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
জলবায়ু কর্মী তনুজা পান্ডে বলেন, নেপালে এই প্রথম কোনও জলবায়ু বিপর্যয় ঘটেনি। গত মার্চে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারও জাতীয় বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে যথেষ্ট অগ্রাধিকার দেয়নি বলে তার অভিযোগ।
তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি জানানো ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও একই সঙ্গে নেপালকে নিজের উন্নয়ন মডেল ও অবকাঠামো পরিকল্পনায় জলবায়ু সহনশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘‘দেশের অভ্যন্তরে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া প্রকৃত জলবায়ু ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।’’
তার মতে, নেপালের অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের জলবায়ু সহনশীলতাকে উন্নয়ন প্রকল্পের ঐচ্ছিক অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি সতর্ক করে বলেন, নেপালে টেকসই উন্নয়নে বিনিয়োগ ছাড়া অন্য কোনও বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে ভালো বিনিয়োগ হতে পারে না।
জাতীয় শোক, সামনে পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ
সোমবার সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় নিহতদের স্মরণে জাতীয় শোক দিবস পালন করেছে নেপাল। রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এক হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হলেও হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ।
জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, এটি বিভক্ত হওয়ার সময় নয়, একে অপরকে দোষারোপ করার সময়ও নয়। রাজনৈতিক বিরোধ ও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে এখন জাতীয় ঐক্য ও সংহতি প্রদর্শনের সময়।
তার ভাষায়, নেপালের সামনে এখন পুনর্গঠন, পুনর্বাসন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের সামনে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের একটি নজির প্রতিষ্ঠা করা।
কারণ, হিমবাহ ধসের এই বিপর্যয় হয়তো কেবল শুরু। ভবিষ্যতে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন, হিমবাহ গলন, বন্যা, ভূমিধস এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে নেপালসহ বহু উন্নয়নশীল দেশ আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়া ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোও একই ধরনের ক্ষতিপূরণের দাবি তুলতে পারে। বিশেষজ্ঞ জোইতা গুপ্তার মতে, ভবিষ্যতে এমন দাবি আরও বাড়তে পারে বলেই অনেক ধনী দেশ ক্ষতিপূরণের নীতি প্রতিষ্ঠায় অনাগ্রহী। কারণ একবার ক্ষতিপূরণের নজির তৈরি হলে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত বহু দেশ একই ধরনের দাবি নিয়ে সামনে আসবে।
তবে নেপালের বর্তমান বিপর্যয় বিশ্ববাসীর জন্য একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা বলেও মনে করছেন তিনি।
তার মতে, নেপালের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করছে যে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়া এখন আর শুধু পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি মানবিক ন্যায়বিচার ও বেঁচে থাকার প্রশ্ন। সূত্র: আল-জাজিরা
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে
গত ২৬ আগস্ট নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে একটি হিমবাহের অংশ ধসে পড়ার পর ভয়াবহ পানি ও কাদার ঢল নেমে আসে। এতে নেপালের রাসুওয়া ও নুওয়াকোট অঞ্চল এবং চীনের তিব্বত অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এক হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ।
এই বিপর্যয়ের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। নেপাল সরকারের ভাষ্য, এমন দুর্যোগের জন্য দায়ী নয় এমন একটি দেশ হয়েও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে তাদের।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল গত সপ্তাহে বলেন, ‘‘যে বৈশ্বিক সংকট আমরা সৃষ্টি করিনি, তার চূড়ান্ত মূল্য আমাদের দিতে হচ্ছে।’’
বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, নেপালকে দেওয়া সহায়তাকে দান বা মানবিক সাহায্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটিকে জলবায়ু ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে হবে।
জাতিসংঘের কাছে দুই কোটি ডলার দাবি
সোমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নেপালের প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেলও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি একই ধরনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ নেপালসহ বিভিন্ন দেশের কণ্ঠস্বর শুধু শোনাই যথেষ্ট নয়; তাদের জন্য জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ও বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
এরই মধ্যে নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে জাতিসংঘের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় গঠিত জাতিসংঘের ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ থেকে দুই কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়েছে কাঠমান্ডু।
২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির কাঠামোর আলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার জন্য ২০২২ সালে এই তহবিল গঠন করা হয়।
তবে তহবিলটির নিজস্ব আর্থিক সংকটও রয়েছে। প্রথম দফার জলবায়ু পুনরুদ্ধার প্রকল্প অনুমোদনের প্রস্তুতির মধ্যেই জাতিসংঘের এই তহবিলে প্রায় ২৮০ কোটি ডলারের অর্থঘাটতি রয়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নে সামান্য ভূমিকা, ক্ষতির ভার বিপুল
নেপালের দাবি যে পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়, তার পক্ষে যথেষ্ট তথ্য রয়েছে। দেশটি বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কমের জন্য দায়ী। দেশটির অধিকাংশ বিদ্যুৎও উৎপাদিত হয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে।
কিন্তু হিমালয় অঞ্চলে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নেপাল জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।
গত কয়েক দশকে হিমালয় অঞ্চলে দ্রুত উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং হিমবাহ গলার হার বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও পাকিস্তানজুড়ে বিস্তৃত হিন্দুকুশ-হিমালয় পর্বতমালার হিমবাহগুলো ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে বরফ হারিয়েছে।
জাতিসংঘের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে প্রায় তিন দশকে নেপালের হিমবাহগুলো তাদের বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। বিশ্বের দুই বৃহৎ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত নেপাল এ কারণে বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
নেপালজুড়ে ক্ষোভ ও হতাশা
নেপালভিত্তিক জলবায়ু আন্দোলনকর্মী ও আইনজীবী তনুজা পান্ডে বলেন, জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি ঘিরে দেশটির মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্মিলিত ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে।
তার ভাষায়, জলবায়ু বিপর্যয় এমন পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত বিশ্ব সাধারণত নেপালের দিকে নজর দেয় না, যখন সেটি আর উপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না।
তিনি বলেন, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক শিরোনাম হলেও শেষ পর্যন্ত সেই মানবিক দুর্ভোগ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ তৈরি করতে পারে না। এ বিষয়টি নেপালের মানুষের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
২৮ বছর বয়সী নেপালি জলবায়ু আন্দোলনকর্মী শ্রেয়া কেসির বাড়ি পূর্ব নেপালের সোলুখুম্বু এলাকায়। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টও এই অঞ্চলে অবস্থিত।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক হিমবাহ ধসের পর তার এলাকার মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন যে, হিমালয় দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা এবং হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার কারণে এমন বিপর্যয় এখন নেপালের যেকোনও অঞ্চলে ঘটতে পারে।
শ্রেয়া কেসি জানান, নেপালে জলবিদ্যুৎ, বন সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সচেতনতা নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পে তিনি নিজেও কাজ করেছেন। তার অভিযোগ, অন্য দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নেপালের মানুষ।
তার কথায়, ‘‘যে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নেপাল দায়ী নয়, তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছি আমরা। তাই মানুষ এখন ন্যায়বিচার চায়।’’
জলবায়ু ন্যায়বিচার কী?
প্রাথমিক হিসাবে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বন্যায় দেশটির সম্পদ, আবাসন ও অবকাঠামো খাতে প্রায় ২৫৬ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
তবে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’-এর ভিত্তিতে আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষতিপূরণ আদায় সহজ হবে না বলে মনে করছেন নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও উন্নয়নবিষয়ক অধ্যাপক জোইতা গুপ্তা।
জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, জলবায়ু ন্যায়বিচার হলো এমন একটি নৈতিক ও নীতিগত ধারণা, যার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর পড়া অসম ও অতিরিক্ত প্রভাব মোকাবিলার চেষ্টা করা হয়।
অধ্যাপক গুপ্তা বলেন, নেপালের মতো স্বল্প নিঃসরণকারী দেশ যদি এমন একটি জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায়, যা তারা নিজেরা সৃষ্টি করেনি, তাহলে জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি জানানোর যথেষ্ট নৈতিক ভিত্তি তাদের রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবতায় ক্ষতিপূরণ আদায়ের পথ জটিল।
১৯৯০ সালের আগে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বড় দূষণকারী দেশগুলোর পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তিগুলোতে ‘ক্ষতিপূরণ’ শব্দটি গুরুত্ব হারায়। এর পরিবর্তে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পায়।
আইসিজের মতামত নতুন আশা দেখাচ্ছে
২০২৫ সালের জুলাইয়ে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দেওয়া এক পরামর্শমূলক মতামতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা আইসিজে বলেছে, উল্লেখযোগ্য জলবায়ু ক্ষতি প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সব দেশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
আদালতের ওই মতামতে আরও বলা হয়, কোনও রাষ্ট্র যদি তার আন্তর্জাতিক জলবায়ু সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ পূর্ণ প্রতিকার দিতে তাদের বাধ্য করা যেতে পারে।
যদিও আইসিজের এই পরামর্শমূলক মতামত সরাসরি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবুও এটি নেপালের জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবিকে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মধ্যে নতুন ভিত্তি দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘে জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি
নেপালের র্যাপার থেকে রাজনীতিক হওয়া প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ আগামী ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন তিনি।
ধারণা করা হচ্ছে, তার ভাষণের অন্যতম প্রধান বিষয় হবে নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক দাবি।
তবে জলবায়ু আন্দোলনকর্মীদের মতে, শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এখন যথেষ্ট নয়। নেপালের প্রয়োজন সরাসরি অর্থায়ন।
শ্রেয়া কেসি বলেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং দেশের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করা অর্থের একটি বড় অংশ এখন জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যয় করতে হচ্ছে।
তার মতে, বিশেষ করে উন্নত ও উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোকে জাতিসংঘের লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আরও বেশি অর্থ দিতে হবে। সেই অর্থ ঋণ হিসেবে নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া উচিত।
অভ্যন্তরীণ ন্যায়বিচার ছাড়া জলবায়ু ন্যায়বিচার নয়
তবে আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ দাবির পাশাপাশি নেপালের অভ্যন্তরীণ নীতি ও উন্নয়ন কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
জলবায়ু কর্মী তনুজা পান্ডে বলেন, নেপালে এই প্রথম কোনও জলবায়ু বিপর্যয় ঘটেনি। গত মার্চে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারও জাতীয় বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে যথেষ্ট অগ্রাধিকার দেয়নি বলে তার অভিযোগ।
তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি জানানো ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও একই সঙ্গে নেপালকে নিজের উন্নয়ন মডেল ও অবকাঠামো পরিকল্পনায় জলবায়ু সহনশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘‘দেশের অভ্যন্তরে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া প্রকৃত জলবায়ু ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।’’
তার মতে, নেপালের অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের জলবায়ু সহনশীলতাকে উন্নয়ন প্রকল্পের ঐচ্ছিক অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি সতর্ক করে বলেন, নেপালে টেকসই উন্নয়নে বিনিয়োগ ছাড়া অন্য কোনও বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে ভালো বিনিয়োগ হতে পারে না।
জাতীয় শোক, সামনে পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ
সোমবার সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় নিহতদের স্মরণে জাতীয় শোক দিবস পালন করেছে নেপাল। রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এক হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হলেও হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ।
জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, এটি বিভক্ত হওয়ার সময় নয়, একে অপরকে দোষারোপ করার সময়ও নয়। রাজনৈতিক বিরোধ ও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে এখন জাতীয় ঐক্য ও সংহতি প্রদর্শনের সময়।
তার ভাষায়, নেপালের সামনে এখন পুনর্গঠন, পুনর্বাসন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের সামনে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের একটি নজির প্রতিষ্ঠা করা।
কারণ, হিমবাহ ধসের এই বিপর্যয় হয়তো কেবল শুরু। ভবিষ্যতে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন, হিমবাহ গলন, বন্যা, ভূমিধস এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে নেপালসহ বহু উন্নয়নশীল দেশ আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়া ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোও একই ধরনের ক্ষতিপূরণের দাবি তুলতে পারে। বিশেষজ্ঞ জোইতা গুপ্তার মতে, ভবিষ্যতে এমন দাবি আরও বাড়তে পারে বলেই অনেক ধনী দেশ ক্ষতিপূরণের নীতি প্রতিষ্ঠায় অনাগ্রহী। কারণ একবার ক্ষতিপূরণের নজির তৈরি হলে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত বহু দেশ একই ধরনের দাবি নিয়ে সামনে আসবে।
তবে নেপালের বর্তমান বিপর্যয় বিশ্ববাসীর জন্য একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা বলেও মনে করছেন তিনি।
তার মতে, নেপালের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করছে যে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়া এখন আর শুধু পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি মানবিক ন্যায়বিচার ও বেঁচে থাকার প্রশ্ন। সূত্র: আল-জাজিরা
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে