​নেপাল-চীনে নিহত বেড়ে ৭৯৭, নিখোঁজ ৩ হাজারের বেশি

আপলোড সময় : ৩১-০৮-২০২৬ ১১:৫৫:৪৭ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ৩১-০৮-২০২৬ ১১:৫৫:৪৭ পূর্বাহ্ন
নেপাল ও চীনে হিমবাহ ধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯৭ এ। উভয় দেশে নিখোঁজ রয়েছেন ৩০৪৮ জন। নিখোঁজদের উদ্ধার অভিযান আরো জোরদার করা হয়েছে। রোববারও (৩০ আগস্ট) দুই দেশের উদ্ধারকারী দল দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। তবে খারাপ আবহাওয়া, ভারী বৃষ্টি, নদীর পানি বেড়ে যাওয়া এবং বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে।

বুধবার (২৬ আগস্ট) হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসে পড়ার পর বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত পাহাড়ি উপত্যকা ও নদীর ওপর দিয়ে নেমে আসে। এতে নেপাল ও চীনের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। রেড ক্রসের হিসাবে, এই দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন। 

চীন জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে এই দুর্যোগের সম্পর্ক রয়েছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৭৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৫০২ জন। অন্যদিকে, চীনের গিরং কাউন্টিতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন আরো ৫৪৬ জন। এ ছাড়া তিব্বতে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে চীন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই শনিবার (২৯ আগস্ট) নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, ওয়াং ই এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে ভয়াবহ সীমান্তপারের দুর্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উদ্ধার অভিযান নজিরবিহীনভাবে কঠিন ও জটিল হয়ে পড়েছে। দুর্যোগকবলিত এলাকায় নতুন করে বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। 

নেপালের স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, গত কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ত্রিশূলী নদীর পানি বেড়ে গেছে। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের উঁচু এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার থেকে খারাপ আবহাওয়া ও বন্যার আশঙ্কার কারণে কয়েক দফা উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখতে হয়েছে।

দুর্যোগের পর নেপাল-চীন সীমান্তে একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। হ্রদটির পানি উপচে নেপালের লেন্দে খোলা ও ত্রিশূলী নদীতে পড়তে শুরু করলে নতুন করে বন্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সিসিটিভি জানিয়েছে, ভাটির এলাকার জন্য হুমকি হয়ে ওঠা হ্রদটির বেশির ভাগ পানি শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে বের হয়ে গেছে। তবে শনিবার রাতে ড্রোনে হ্রদের প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার ভাটিতে একটি ভূমিধসের সন্ধান পাওয়া যায়। ভূমিধসের কারণে সেখানে নতুন একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়েছে। ফলে ওই এলাকায় আবারও পানি জমতে শুরু করেছে। 

নেপালে এখন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যে আপার ত্রিশূলী প্রকল্পও রয়েছে। কর্তৃপক্ষ শুক্রবার জানিয়েছিল, প্রকল্পটির একটি সুড়ঙ্গে প্রায় ৩৫০ জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন।

তাদের উদ্ধারে রোববার দুর্গম এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে যায় নেপালের সেনাবাহিনী। উদ্ধারকারীরা একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে পৌঁছেছেন। সেখানে জমে থাকা কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ শুরু হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ নিরাপদ করা গেলে সেখানে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে। এরপর ক্যামেরা নিয়ে উদ্ধারকারী দল সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করবে। নেপালে প্রায় ১০ হাজার সেনা উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের সঙ্গে চীন ও ভারতের বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দলও কাজ করছে। 

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান ধরম রাজ উপ্রেতি বলেন, উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ সুড়ঙ্গের সামনে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে আছে। সেখানে পথ তৈরি করতে বিস্ফোরক ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

দুর্যোগের পর কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজছেন পরিবারের সদস্যরা। তারা হাসপাতাল, মর্গ ও ত্রাণকেন্দ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এর মধ্যে শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়া শত শত মরদেহ গণকবর দিতে শুরু করেছে নেপালের কর্তৃপক্ষ। মরদেহগুলো পচে যেতে শুরু করায় দ্রুত দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগকবলিত এলাকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ান জেলার দেবঘাটের একটি জঙ্গলে শত শত কবর খোঁড়া হয়েছে। বন্যার পানিতে ভেসে আসা মরদেহগুলো সেখানে দাফন করা হচ্ছে। চিতওয়ানের জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল বলেন, মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। এ কারণে মরদেহ দাফন করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় ছিল না। কর্তৃপক্ষ শনিবার শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এমন ৯৬টি মরদেহ দাফন করেছে। রবিবার আরো ১০০টির বেশি মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

একই সময়ে উদ্ধারকারী দল নদী ও ধ্বংসাবশেষের মধ্য থেকে আরো মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পরিবারগুলো যাতে পরে মরদেহ শনাক্ত করতে পারে, সে জন্য ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। কোন মরদেহ কোথায় দাফন করা হয়েছে, সেই তথ্যও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। নেপালের পুলিশ কর্মকর্তা অনিল থাপা বলেন, এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা মরদেহের অর্ধেকের বেশি শনাক্ত করার মতো অবস্থায় নেই। তিনি বলেন, অনেক মরদেহের মুখ চেনার উপায় নেই। কোথাও শুধু হাত বা পা পাওয়া গেছে। আবার কোথাও শরীরের শুধু কিছু অংশ পাওয়া গেছে। 

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী জানিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে সুড়ঙ্গ থেকে আটকে পড়াদের উদ্ধার, ডিএনএ পরীক্ষা, মরদেহ সংরক্ষণের জন্য হিমায়িত ব্যবস্থা এবং পচে যাওয়া মরদেহ শনাক্ত করতে ফরেনসিক পরীক্ষা।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে হিমবাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার সঙ্গে এই দুর্যোগের সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিব্বত মালভূমিতে হিমবাহ ও বরফনির্ভর প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চীনা বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে সিসিটিভি জানিয়েছে, নেপালের দিক থেকে আসা কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত গিরং সীমান্ত এলাকায় পৌঁছাতে মাত্র ছয় থেকে সাত মিনিট সময় নিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দুর্যোগের ভয়াবহতা দেখা গেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনা গ্রাস করছে। এ সময় মানুষ প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ স্থানে ছুটে যাচ্ছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, দেশটি ২ হাজার ১০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে। ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান বা প্রায় ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। চীন দুর্গম এলাকায় কাজ করা উদ্ধারকারীদের কাছে আকাশপথে সরঞ্জাম ও ত্রাণসামগ্রী পাঠাচ্ছে। নিখোঁজ মানুষদের খুঁজতে দেশটির সেনাবাহিনী জীবন শনাক্ত করার বিশেষ যন্ত্রও ব্যবহার করছে। নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে আবহাওয়ার অবনতি, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং নতুন ভূমিধসের আশঙ্কায় উদ্ধারকারীদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :