চলছে ইলেক্ট্রিক ফিশিং, নদী দখল, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার

হাওরে মাছের আকাল, সংকটে জেলেরা

আপলোড সময় : ৩০-০৮-২০২৬ ০৩:২০:০৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ৩০-০৮-২০২৬ ০৩:২০:০৮ অপরাহ্ন
‘যারা নদী ডাইক্যা (ইজারা) আনে, তারাতো আমরারে নদীত মাছ ধরতে দেয় না। যারা নদী ডাইক্যা তারা ট্যাহা চায় ১৫ লাখ। আমরা গরিব মানুষ ১৫ লাখ ট্যাহা কই ফাইয়াম। ট্যাহা বাউ করতে ফারি না গাংগোও যাইতাম ফারি না। যাইগা ডাহা (ঢাকা)। যে যেডা ফারি হেইডা কইরা জীবন চালাই। ’  মাছের আকাল পড়ায় আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন  চংনোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ছায়া রাণী বর্মণ। 

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া ইউনিয়নের হাওরঘেরা এই গ্রামে ছিল শতাধিক জেলে পরিবারের বসবাস। মাছ ধরাই ছিল তাদের প্রধান পেশা। এই জেলেপল্লীতে এখন টিকে রয়েছে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি পরিবার। মাছ সংকটের পাশাপাশি হাওরের জলমহাল ইজারা ব্যবস্থাও তাদের জীবিকাকে কঠিন করে তুলেছে বলে জানান জেলেরা। স্থানীয় সূত্র জানায়, একসময় দিনরাত এক করে জাল-নৌকা নিয়ে হাওরের দিকে ছুটতেন চংনোয়াগাঁও গ্রামের জেলেরা। ফিরতেন মাছভর্তি নৌকা নিয়ে। মাছ ধরেই চলতো সংসার। হাওর ও নদী ছিল তাদের জীবনের প্রধান অবলম্বন।

কিন্তু এখন তাদের সেই রমরমা অবস্থা আর নেই। হাওরে মাছ কমে যাওয়ায় জেলেদের অনেকেই চলে গেছেন অন্য পেশায়। কেউ ঢাকার পোশাক কারখানায় কাজ করছেন, কেউ দিনমজুর; কেউ আবার হয়েছেন রিকশাচালক।

মাছের আকালের কথা বলতে গিয়ে সঞ্জয় বর্মণ তার ছোট নৌকাটিতে বসে বলেন, ‘আগে নদীত যে মাছ আছিন, অহন এই মাছ নাই। খালি দেখবাইন ফানি (পানি) আর ফানি, মাছ নাই। দিন-রাইত নৌকা লইয়া ঘুরি; জালো মাছ উডে না। ইজারাওয়ালারে যে ট্যাহা দিয়া গাঙ্গো নামি, হেই ট্যাহাই উডাতাম ফারি (পারি) না। সংসার চলে না, রেইন (ঋণ) ভাংতাম ফারি না। আমরা অহন কোন পথে যাইয়াম?’

জেলেরা জানান, আগে হাওরে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। একটি নৌকা নিয়ে হাওরে গেলে নৌকা ভরে যেত মাছে।  এখন দিনরাত জাল ফেলেও আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। এতে সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

জেলেদের অভিযোগ, হাওরের জলমহালগুলো সাধারণত প্রভাবশালী ও বিত্তবানরা ইজারা নেন। এরপর সেখানে মাছ ধরতে হলে ইজারাদারদের টাকা দিতে হয়। এতে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত গরিব জেলে পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

শুধু চংনোয়াগাঁও নয়, কিশোরগঞ্জের সব হাওরেই মাছ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন জেলেরা। এর প্রভাব পড়েছে জেলার অন্যতম বড় পাইকারি মাছের বাজার বালিখলা ও অন্যান্য বাজারে। কয়েক বছর আগেও ভোর হওয়ার আগেই শত শত জেলে নৌকা নিয়ে বালিখলা বাজারের ঘাটে ভিড় করতো। মাছের কেনাবেচায় জমজমাট থাকত পুরো বাজার। কিন্তু এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আগের তুলনায় বাজারে মাছের সরবরাহ অনেক কমে গেছে।

বালিখলা বাজারের কয়েকজন মাছ ব্যবসায়ী জানান, তিন-চার বছর আগেও বালিখলা বাজারে প্রতিদিন দুই থেকে তিন কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হতো। এখন অনেক দিন ৫০ লাখ টাকার মাছও বিক্রি হয় না। মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় জেলেদের পাশাপাশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন আড়ৎদার ও মাছ ব্যবসায়ীরাও।

মাছ ব্যবসায়ী ওমর ফারুক বলেন, ‘আগে যে পরিমাণ মাছ বাজারে আসতো, এখন তার ধারেকাছেও আসে না। মাছ কমে যাওয়ায় ব্যবসার পরিমাণও অনেক কমে গেছে। এতে বাজারের সঙ্গে জড়িত অনেক মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’ 

ওমর ফারুক আরো বলেন, ‘নির্বিচারে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে, ইলেকট্রিক ফিশিং (পানিতে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে মাছকে সাময়িক অবশ করে মাছ ধরা) করা হচ্ছে। নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে মাছ চলাচল করতে পারে না, বংশ বৃদ্ধি করতে পারে না। তাই দিন দিন দেশি মাছ কমে যাচ্ছে।’

জেলা মৎস্য অফিস বলছে, মাছের পরিমাণ কমার পাশাপাশি হাওরগুলোতে কমছে দেশি মাছের প্রজাতিও। একসময় জেলার হাওরগুলোতে ২৬০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত।  বর্তমানে এর বড় একটি অংশ বিলুপ্ত হয়েছে অথবা বিলুপ্তির পথে বা বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। 

সূত্র জানায়, মহাশোল, সরপুঁটি, রিটা, পাঙ্গাস, আইড়, চিতল, পাবদা, কালবাউশ, তিতপুঁটি, গাংমাগুর ও শালবাইমসহ বহু দেশি মাছ এখন বিপন্ন। ফলে শুধু জেলেদের জীবিকাই নয়, হাওরের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে।

মৎস্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাছ কমে যাওয়ার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। এগুলোর জলমহালের অপরিকল্পিত ইজারা, নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের ব্যবহার, ইলেকট্রিক ফিশিং, ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ নিধন, নদ-নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এর মধ্যে অন্যতম। এসব কারণে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জে বছরে মাছের চাহিদা ৭৩ হাজার ৮৭৩ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে জেলায় মোট মাছ উৎপাদন হয় এক লাখ সাত হাজার ১৪৭ মেট্রিক টন। এর মধ্যে খাল-বিল, প্লাবনভূমি ও পুকুর-ডোবায় উৎপাদন হয় ৭৭ হাজার ৮২৩ মেট্রিক টন মাছ। আর হাওর ও নদ-নদী থেকে পাওয়া যায় ২৯ হাজার ৩২৪ মেট্রিক টন মাছ।

মৎস্য বিভাগ জা‌নায়, জেলার মোট মাছ উৎপাদনের পরিমাণ সন্তোষজনক হলেও হাওরের প্রাকৃতিক মাছ উৎপাদন কমে গেছে। প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছের উৎপাদন ও বৈচিত্র ধরে রাখতে কার্যকর ব্যবস্থাপনা জরুরি।

কিশোরগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, শুধু অভিযান চালালেই সংকট যাবে না। মাছের প্রজনন ও বিচরণের জন্য পুরো বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করতে হবে। নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধের পাশাপাশি মাছের অভয়াশ্রম সংরক্ষণ ও  জলমহালের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। 

মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, জেলায় ২১টি অভয়াশ্রম রয়েছে। আরো ২৫টির জন্য নতুন করে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আর বর্তমানের ইজারা ব্যবস্থাপনার সংস্কার দরকার। আমরা মনে করি উৎপাদনভিত্তিক ইজারা প্রথা চালু করলে প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন বাড়বে। 
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :