ঝর্ণায় ফিরেছে যৌবন: পাহাড়ে বাড়ছে পর্যটক

আপলোড সময় : ২৮-০৮-২০২৬ ১১:২০:৪১ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৮-০৮-২০২৬ ১১:২০:৪১ পূর্বাহ্ন
বর্ষার বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে রাঙামাটির পাহাড়ি ঝর্ণাগুলো। বৃষ্টির পানিতে প্রাণ ফিরে পাওয়া ছোট-বড় ঝর্ণা ও জলপ্রপাতগুলো এখন হয়ে উঠেছে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। কাপ্তাই হ্রদ, পাহাড় ও সবুজ অরণ্যের পাশাপাশি ঝর্ণার সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই রাঙামাটিতে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা।

‎রাঙামাটির সুবলংয়ের বড় ও ছোট ঝর্ণা, কাউখালীর ঘাগড়া ঝর্ণা, বিলাইছড়ির ধুপপানি, মুপ্পোছড়া, গাছকাটাছড়া ও শতপাপড়িসহ বিভিন্ন পাহাড়ি ঝর্ণায় এখন দেখা মিলছে পর্যটকদের। বর্ষার টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা জলধারা এসব ঝর্ণাকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রার সৌন্দর্য।

‎‎কাপ্তাই হ্রদে নৌপথে সহজে পৌঁছানো যায় বলে সুবলং ঝর্ণা বরাবরই পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। অন্যদিকে বিলাইছড়ির দুর্গম পাহাড়ে অবস্থিত ধুপপানি, মুপ্পোছড়া ও গাছকাটার মতো ঝর্ণাগুলোতে যেতে পাড়ি দিতে হয় খাড়া পাহাড়ি পথ, ঝিরি ও পাথুরে পথ। ফলে এসব ঝর্ণা প্রকৃতিপ্রেমীদের পাশাপাশি অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদেরও আকর্ষণ করছে।

‎কাউখালীর ঘাগড়া ঝর্ণাতেও বর্ষাকে ঘিরে বাড়ছে পর্যটকের আনাগোনা। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পর্যটকরা ঝর্ণার পানিতে ভিজে পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছেন।

‎চট্টগ্রাম থেকে ঘাগড়া ঝর্ণায় ঘুরতে আসা শিক্ষার্থী আফিয়া খানম বলেন, এখানে মূলত পাহাড়ের সৌন্দর্য ও ঝর্ণা দেখতেই মানুষ আসে। আমি প্রতিবছরই চট্টগ্রাম থেকে আসি, যখন পানি বেশি থাকে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটকরা আসেন। আমিও এখানকার ঝর্ণা দেখতে আসি। ঝর্ণার মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে নিজেরও ভালো লাগে, মনটাও ভালো হয়ে যায়।

‎ঢাকা থেকে আসা পর্যটক জাহিদ হোসেন বলেন,  আমরা ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে দেখে রাঙামাটিতে এসেছি। রাঙামাটি খুবই সুন্দর একটি জায়গা। কিন্তু বর্ষার মৌসুমে রাঙামাটি যে এতটা সুন্দর হবে তা অকল্পনীয়। আজকে আমরা ঝর্ণায় আসলাম এবং ঝর্ণার পানিতে আমাদের মন জুড়িয়ে যাচ্ছে।

‎পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় চাঙা হয়ে উঠছে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসাও। পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা ও ছাড় দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন পর্যটনসংশ্লিষ্টরা।

‎‎রাঙামাটি ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বন কুমুস বড়ুয়া বাপ্পী বলেন, আমরা চেষ্টা করি এই সময়টাতে আমাদের পর্যটকদের জন্য বিশেষ কিছু সুবিধা দেওয়ার। যেমন, আমরা অলরেডি আমাদের পর্যটকদের জন্য ১০ থেকে ১৫ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট অফার করেছি। এ ছাড়া আরও যত রকম সুবিধা ও সেবা দেওয়া যায়, আমরা বছরের এই সময়টাতে আমাদের পর্যটকদের সেসব সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা চাই, বছরের এই সময়টিতে রাঙামাটিতে পর্যটক আসুক এবং রাঙামাটির আসল সৌন্দর্য উপভোগ করে যাক।

‎রাঙামাটি পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, এই বর্ষায় আগত ট্যুরিস্টদের জন্য আমরা আমাদের কটেজ, ঝুলন্ত ব্রিজ, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রস্তুত রেখেছি। সেইসঙ্গে আমরা ট্যুরিস্টদের জন্য বিভিন্ন কালচারাল প্রোগ্রামসহ বিশেষ আয়োজন করে থাকি।

‎তবে ঝর্ণাকেন্দ্রিক পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। দুর্গম ঝর্ণাগুলোতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইডের সহযোগিতা নেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য পরিবেশের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

‎জলবায়ু কর্মী ম্যামা চিং মং বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন ঝর্ণার আশপাশে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এসব প্লাস্টিক ঝর্ণার পানির সঙ্গে বিভিন্ন ফসলের জমিতে গিয়ে পড়ছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি কৃষকরাও বিপাকে পড়ছেন।

‎‎সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি ঝর্ণাসহ পর্যটন স্পটগুলোতে সচেতনতামূলক নির্দেশিকা স্থাপন, ক্যাম্পেইন পরিচালনা এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেয়, তাহলে কিছুটা হলেও পরিবেশ দূষণ রোধ করা সম্ভব হবে। তবে সবার আগে পর্যটকদের সচেতন হতে হবে। অন্যথায় এ দূষণ রোধ করা সম্ভব হবে না।

‎ট্যুরিস্ট পুলিশের রাঙামাটি জোনের উপপরিদর্শক উইলিয়াম ত্রিপুরা বলেন, বর্ষা মৌসুমে পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে পারে, সে কারণে ট্যুরিস্ট পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি এবং জেলার সব পর্যটনকেন্দ্রে আমাদের টহল কার্যক্রম জোরদার করেছি। এ ছাড়া সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না যাওয়া এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

‎‎সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্ষায় ঝর্ণাগুলোকে ঘিরে পর্যটকের আগমন বাড়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে নৌযান, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, গাইড ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন উপকৃত হচ্ছেন। পরিকল্পিতভাবে এসব পর্যটনকেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ঝর্ণাগুলোকে ঘিরে রাঙামাটির পর্যটন আরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

‎‎প্রকৃতির এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের। পর্যটকদের সচেতনতা, পরিবেশ সুরক্ষা ও প্রশাসনের নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে রাঙামাটির ঝর্ণাগুলো হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটন গন্তব্য।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :