ঈদে মিলাদুন্নবীতে কোন আমল জরুরি, কী বলে কোরআন-হাদিস

আপলোড সময় : ২৪-০৮-২০২৬ ০৬:৪৫:২০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৪-০৮-২০২৬ ০৮:০১:৪৪ অপরাহ্ন
আগামী বুধবার (২৬ আগস্ট) বাংলাদেশে ধর্মীয় উৎসব আবহ ও পূর্ণ মর্যাদায় পালিত হতে যাচ্ছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। এটি বিশ্ব মানবতার শান্তির দূত ও সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের ঐতিহাসিক স্মারক ১২ রবিউল আউয়াল।

পবিত্র এই দিনটিকে কেন্দ্র করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের একাংশের মনে দীর্ঘদিনের একটি সাধারণ জিজ্ঞাসা জাগে ঈদে মিলাদুন্নবীতে মূলত কোন ইবাদত বা আমলগুলো সম্পাদন করা প্রয়োজন? এদিনের বিশেষত্ব হিসেবে নির্দিষ্ট কোনো নামাজ, বিশেষ রোজা কিংবা নির্দিষ্ট সংখ্যক ইবাদতের তাগিদ রয়েছে কি না?

কোরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়ের মূল বক্তব্য অনুধাবন করা জরুরি। ১২ রবিউল আউয়াল তারিখটিকে কেন্দ্র করে আলাদা কোনো ফরজ, ওয়াজিব, নির্দিষ্ট দোয়ার ফ্রেমওয়ার্ক কিংবা নির্ধারিত সংখ্যায় জিকির ও দরুদ শরিফ পাঠের স্বতন্ত্র হুকুম শরিয়তে পাওয়া যায় না। তবে আখিরাতের নাজাত লাভ ও নবীজির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের উপায় হিসেবে দরুদ পাঠ, কোরআন তিলওয়াত, দান-সদকা ও তাঁর আদর্শ অনুশীলনের গুরুত্ব ইসলামে সার্বক্ষণিক। ফলে এই ঐতিহাসিক দিনেও এসব শুভ কাজ পালনে বাধা নেই।

মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ ও সুমহান আদর্শ অনুসরণ

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সর্বশ্রেষ্ঠ এবং প্রকৃত প্রমাণ হলো নিজের সমগ্র জীবনে তাঁর রেখে যাওয়া সুন্নাহ ও শিক্ষাকে পুরোপুরি ধারণ করা।

পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, মুমিনদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সত্তাই হচ্ছে একমাত্র সুনিশ্চিত উত্তম আদর্শ। একইভাবে সূরা আলে ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতে জানানো হয়েছে, মহানবীর অনুকরণ ও অনুসরণের মাধ্যমেই আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দরবারের ভালোবাসা অর্জন করা সম্ভব। কেবল একটি বিশেষ দিন বা নির্দিষ্ট সময়সীমায় নবীজিকে স্মরণ করা যথেষ্ট নয়; বরং তাঁর সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমাশীলতা, সাম্য এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যকে প্রতিদিনের জীবনব্যবস্থায় প্রয়োগ করাই সুন্নাহর আসল উদ্দেশ্য।

দরুদ ও সালাম পাঠের আবহ তৈরি

রাসূল (সা.)-এর প্রতি প্রতিনিয়ত দরুদ ও সালাম প্রেরণের তাগিদ স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন দিয়েছেন। সূরা আল-আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে ইমানদারদের সুনির্দিষ্টভাবে নবীজির ওপর দরুদ ও সালাম প্রেরণের আদেশ প্রদান করা হয়েছে।

হাদিস শরিফেও দরুদ পাঠের অসীম ফজিলত তুলে ধরা হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক রেওয়ায়েতে মহানবী (সা.) উল্লেখ করেন, যে ব্যক্তি তাঁর প্রতি একবার দরুদ পাঠ করবে, বিনিময়ে মহান আল্লাহ সেই বান্দার ওপর ১০টি রহমত নাজিল করবেন। সুতরাং ঈদে মিলাদুন্নবীর সুযোগে ইবাদতের নিয়তে বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পেশ করা উত্তম। তবে এই দিনের জন্য দরুদের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা বিশেষ নিয়ম নির্দিষ্ট করা অনুচিত।

মহানবী (সা.)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনী (সিরাত) চর্চা

রবিউল আউয়াল মাসটি মহানবী (সা.)-এর বর্ণাঢ্য জীবন ও তাঁর রেখে যাওয়া অতুলনীয় আদর্শ সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের একটি চমৎকার উপলক্ষ হতে পারে। এই সময়ে তাঁর সিরাত গ্রন্থ পাঠ করা, পরিবারের সদস্যদের ও নতুন প্রজন্মকে তাঁর অমূল্য নীতিগুলো জানানো অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ।

রাসূলুল্লাহ (সা.) পরিবার, প্রতিবেশী, অনগ্রসর জাতি, অসহায়, নারী ও শিশুদের সঙ্গে যে অতুলনীয় মানবিক আচরণ প্রদর্শন করেছিলেন, তা জানা ও বাস্তব জীবনে রূপ দেওয়াই তাঁর প্রতি ভালোবাসার সঠিক বহিঃপ্রকাশ। জাতীয় পর্যায়ে আয়োজিত কর্মসূচিতেও নবীজির সুমহান জীবন, বিশ্বশান্তি, সৌহার্দ্য ও মানবাধিকার চর্চার নানা ইতিবাচক দিক নিয়ে আলোকপাত করা হয়ে থাকে।

তিলওয়াত, জিকির ও সার্বিক দোয়ার ধারাবাহিকতা

পবিত্র কোরআন তিলওয়াত, ইস্তিগফার, জিকির ও আল্লাহর কাছে মোনাজাত করা একজন মুসলমানের জন্য সর্বাবস্থায় উত্তম আমল। তাই এই দিনেও যেকোনো সময় এসব নফল ইবাদত করা যেতে পারে।

এ সময় নিজের ও স্বজনদের হেদায়াত চাওয়ার পাশাপাশি দেশ ও মুসলিম উম্মাহর সার্বিক কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা করা যায়। তবে স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, ‘মিলাদুন্নবীর বিশেষ দোয়া’ নামে আলাদা কোনো সুনির্দিষ্ট দোয়ার উল্লেখ কোরআন বা সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না। সুতরাং ধর্মীয় কোনো ইবাদত পালন বা প্রচারের পূর্বে তার তথ্যসূত্র শতভাগ নির্ভরযোগ্য কি না, তা যাচাই করা আবশ্যক।

দান-সদকা ও ক্ষুধার্তের মাঝে খাদ্য বিতরণ

দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের সহায়তা করা এবং মানুষকে খাদ্য দান করা ইসলামের মূল সৌন্দর্যগুলোর একটি। মিসরের রাষ্ট্রীয় ফতোয়া প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘দারুল ইফতা’ এক মতামতে জানিয়েছে, মহানবীর জন্মস্মৃতি উপলক্ষে কোরআন পাঠ, জিকির ও মানুষকে খাবার খাওয়ানোর মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে শোকর আদায় করা ও আনন্দ প্রকাশ করা বৈধ ও গ্রহণযোগ্য একটি পন্থা। অবশ্য এই মানবিক কাজগুলো কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনের ফ্রেমে সীমাবদ্ধ না রেখে বছরের যেকোনো দিন ও সময়ে সম্পাদন করা অত্যন্ত সাওয়াবের কাজ।

১২ রবিউল আউয়ালে বিশেষ রোজা পালনের বিধান কী?

এ প্রসঙ্গে সহিহ মুসলিমের একটি সুপরিচিত হাদিসের কথা প্রায়শই আলোচনায় আসতে দেখা যায়। হজরত আবু কাতাদা আল-আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.)-কে প্রতি সোমবার রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দেন, এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এবং এই দিনেই তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়েছে।

লক্ষ্য করার বিষয় হলো, বর্ণিত হাদিসটির মূল বিষয়বস্তু ছিল প্রতি সপ্তাহের ‘সোমবারের নফল রোজা’। তাই নির্দিষ্ট কোনো তারিখের ওপর ভিত্তি করে প্রতি বছর ১২ রবিউল আউয়ালে বিশেষভাবে রোজা রাখা সুন্নতে সুনির্দিষ্ট এমন ভাবনার বৈজ্ঞানিক বা শরয়ি ভিত্তি দুর্বল।

বিশেষত বাংলাদেশে এ বছর ১২ রবিউল আউয়াল বুধবার (২৬ আগস্ট) পালিত হচ্ছে। তাই সোমবারের রোজা সম্পর্কিত হাদিসটিকে সরাসরি বুধবারের ১২ রবিউল আউয়ালের জন্য বিশেষ রোজা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তবে কেউ চাইলে সাধারণ নফল রোজা হিসেবে এদিন রোজা রাখতে পারেন।

উদ্‌যাপনের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে শীর্ষ আলেমদের অবস্থান

ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে পৃথক কোনো অনুষ্ঠান কিংবা বার্ষিক উদযাপনের ধর্মীয় অনুশাসন নিয়ে আলেম সমাজের মধ্যে দুইটি মূলধারার মতামত পরিলক্ষিত হয়:

দারুল ইফতার মত: মিসরের প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান ‘দারুল ইফতা’র মতে, কোনো প্রকার অনৈসলামিক বা শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ডে না জড়িয়ে রাসুল (সা.)-এর জীবনী আলোচনা, জিকির, দরুদ পাঠ ও গরিবদের খাবার বিতরণের মাধ্যমে তাঁর জন্মকে উদযাপন করা ইসলামে সম্পূর্ণ বৈধ।

সউদী ঘরানার মতামত: অন্যদিকে সৌদি আরবের সাবেক শীর্ষ মুফতি শায়খ আবদুল আজিজ ইবন বাযসহ একদল বিশারদের মতে, রাসূল (সা.), তাঁর অনুসারী সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী তাবেঈনদের যুগে ১২ রবিউল আউয়াল ঘিরে এভাবে বার্ষিক উৎসব পালনের কোনো প্রচলন ছিল না। ফলে একে স্রেফ ধর্মীয় উৎসব মনে করে পালন করা পরিহার করাই শ্রেয়।

এই সকল মতভেদের উর্ধ্বে উঠে কোরআনের দুটি মৌলিক আদেশের ওপর সব আলেম একমত তা হলো মহানবী (সা.)-কে নিজের জীবনে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করা এবং তাঁর প্রতি আন্তরিকভাবে দরুদ ও সালাম পেশ করা।

তাহলে এই দিনে একজন মুসলিমের করণীয় কী?

ঈদে মিলাদুন্নবীর দিনটিতে একজন সচেতন মুসলিম তাঁর দৈনন্দিন ফরজ ইবাদতগুলো নিখুঁতভাবে আদায় করার পাশাপাশি বেশি করে দরুদ ও সালাম পাঠ করবেন। অবসর সময়ে কোরআন তিলওয়াত, জিকির ও নিজের পরকালের সুরক্ষায় মোনাজাত করতে পারেন। এর বাইরে নবীজির সীরত চর্চা, পরিবারকে তাঁর আদর্শে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা এবং যথাসাধ্য দান-সদকার মাধ্যমে অভাবীদের পাশে দাঁড়ানো যেতে পারে।

তবে ভিত্তিহীন কোনো বিশেষ নামাজ, তৈরি করা নির্দিষ্ট দোয়া কিংবা ১২ রবিউল আউয়ালের নাম দিয়ে কোনো বিশেষ রোজাকে শরিয়তের আবশ্যকিয়তা হিসেবে প্রচার করা থেকে বিরত থাকাই ঈমানের দাবি। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি প্রকৃত প্রেম বা ভালোবাসাকে কেবল একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতায় বাঁধাই করা সম্ভব নয়। কোরআন যে সুমহান আদর্শের কথা বলেছে, প্রতিদিনের কর্মক্ষেত্রে তাঁর প্রতিফলন ঘটানোর মধ্য দিয়েই সেই অকৃত্রিম নবীপ্রেম সার্থক হয়ে ওঠে।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচকে/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :