বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি অনেকটাই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ওপর। শিল্পের উৎপাদন, কৃষির সেচ, পণ্য ও যাত্রী পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন—প্রায় প্রতিটি খাতেই জ্বালানি তেলের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। ফলে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মূল্য শুধু একটি বাণিজ্যিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, শিল্পের উৎপাদন খরচ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বাজারজাতকরণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরই প্রধান ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এ ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। তবে সময়ের সঙ্গে দেশের জ্বালানি চাহিদা বাড়ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা করছে এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার সরকারি উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবেই দেখতে হবে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ আয়োজিত এক সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিপণন ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে সরকার অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এর আওতায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো—এর মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে এর সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুফল হতে পারে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া। কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা সীমিতসংখ্যক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর পুরো আমদানি ব্যবস্থা নির্ভরশীল থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ক্রয়প্রক্রিয়া কিংবা সরবরাহে কোনো ধরনের বিলম্ব হলে তার প্রভাব দ্রুত পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। বিপরীতে একাধিক আমদানিকারক থাকলে বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে এবং একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যার কারণে পুরো বাজারে সংকট তৈরির ঝুঁকি কিছুটা কমবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে দাম কমে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ক্রয়াদেশ দেওয়া, বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে বের করা কিংবা পরিবহন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে বেশি নমনীয় হতে পারে। প্রতিযোগিতা বাড়লে আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি ব্যয় কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু কম দামে তেল কেনার সুযোগ তৈরি হলেই এর সুফল নিশ্চিত হবে না। জ্বালানি তেল এমন একটি পণ্য, যার সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও শিল্প, পরিবহন, কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বেসরকারি আমদানিকারকদের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে আমদানি কমিয়ে দিলে যেন দেশের বাজারে সংকট সৃষ্টি না হয়, সে জন্য রাষ্ট্রকে ‘ব্যাকআপ’ ব্যবস্থা হিসেবে প্রস্তুত থাকতে হবে।
বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের আরেকটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে অবকাঠামো উন্নয়নে। নতুন আমদানিকারকরা টার্মিনাল, স্টোরেজ, পরিবহন ব্যবস্থা, পাইপলাইন কিংবা পরিশোধনাগার নির্মাণে বিনিয়োগ করতে পারে। এর ফলে জ্বালানি সংরক্ষণ ও সরবরাহের সক্ষমতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ওপর অবকাঠামো বিনিয়োগের চাপও কমতে পারে। বিশেষ করে বড় আকারের আধুনিক স্টোরেজ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে আন্তর্জাতিক বাজারে অনুকূল সময়ে জ্বালানি সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করার সুযোগ বাড়বে।
তবে এই ব্যবস্থার সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে। জ্বালানি তেলকে সাধারণ ভোগ্যপণ্যের মতো বিবেচনা করলে চলবে না। এটি জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই কে আমদানি করতে পারবে, কত পরিমাণ আমদানি করতে পারবে, কোথায় মজুত করবে, কত দিনের বাধ্যতামূলক মজুত রাখতে হবে, কীভাবে দাম নির্ধারণ হবে—এসব বিষয়ে শুরুতেই সুস্পষ্ট ও কঠোর নীতিমালা প্রয়োজন।
বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, সংরক্ষণ ব্যয়, কর এবং ব্যবসায়িক মুনাফা—সবকিছুর সমন্বয়ে স্থানীয় বাজারদর নির্ধারণের একটি স্বচ্ছ সূত্র থাকতে হবে। তা না হলে বেসরকারি আমদানির নামে বাজারে অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ, কৃত্রিম সংকট কিংবা অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে জ্বালানি আমদানি করলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় আমদানি হলে ডলারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তাই বেসরকারি আমদানিকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আমদানির পরিমাণ, সময় ও উৎস নির্ধারণে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সমন্বয় থাকতে হবে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হতে পারে সরকারি একচেটিয়ার জায়গায় বেসরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থা তৈরি হওয়া। একাধিক প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ না দিয়ে যদি হাতে গোনা কয়েকটি বড় কোম্পানি পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার বদলে নতুন ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে উঠতে পারে। এতে ভোক্তার কোনো প্রকৃত সুবিধা নাও হতে পারে। বরং বাজার নিয়ন্ত্রণ, মজুতদারি ও মূল্য কারসাজির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ কারণে লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা, অবকাঠামো, সংরক্ষণ ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে আমদানি, মজুত ও বিক্রির তথ্য নিয়মিত প্রকাশ এবং নিরীক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন। প্রতিটি চালানের ক্রয়মূল্য, উৎস, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য চার্জ যাচাইযোগ্য হলে অনিয়মের সুযোগ অনেকটাই কমবে।
ভারতের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। দেশটিতে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ও নায়ারা এনার্জির মতো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে পরিশোধন করছে এবং দেশীয় বাজারে জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিও করছে। ফলে সেখানে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি খাত পাশাপাশি কাজ করছে।
তবে ভারতের মডেল হুবহু বাংলাদেশে প্রয়োগ করার সুযোগ নেই। ভারতের বাজার অনেক বড়, দেশটির নিজস্ব বিশাল পরিশোধন সক্ষমতা, বন্দর অবকাঠামো এবং বড় ভোক্তা বাজার রয়েছে। বাংলাদেশের বাজার তুলনামূলক ছোট এবং জ্বালানি অবকাঠামোর সক্ষমতাও ভিন্ন। তাই ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতা অনুযায়ী নিজস্ব মডেল তৈরি করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে শুধু পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভর না করে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশে পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এতে দেশে মূল্য সংযোজন হবে, নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তবে নতুন রিফাইনারি, টার্মিনাল, স্টোরেজ ও পাইপলাইন নির্মাণে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
রাষ্ট্রের ভূমিকাও তাই নতুনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের কাজ সরাসরি সব ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করা নয়; বরং বাজারের জন্য কার্যকর নিয়ম তৈরি করা, সেই নিয়ম বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা করা। বিপিসিকে কৌশলগত মজুত, জরুরি সরবরাহ ও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় দায়িত্বে রেখে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আমদানি ও বাজারজাতকরণে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
এ জন্য একটি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা অপরিহার্য। জ্বালানি মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা, প্রতিযোগিতা কমিশন এবং অন্যান্য অংশীজনের সমন্বয়ে নিয়মিত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাজারে কারসাজি, মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কঠোর শাস্তির বিধানও কার্যকর করতে হবে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতের প্রবেশকে কেবল ভালো বা খারাপ—এমন সরল দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। এর ফল নির্ভর করবে নীতিমালা কতটা স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতা কতটা কার্যকর এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি কতটা শক্তিশালী তার ওপর। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এতে আমদানি দক্ষতা বাড়তে পারে, সরবরাহের বিকল্প উৎস তৈরি হতে পারে, অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে এবং বাজারে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভোক্তার জন্য ইতিবাচক ফল আসতে পারে।
অন্যদিকে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ থাকলে সরকারি একচেটিয়ার পরিবর্তে বেসরকারি সিন্ডিকেট, মজুতদারি, মূল্য কারসাজি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
জ্বালানি তেল শেষ পর্যন্ত নিছক একটি বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি একটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মিশ্র ব্যবস্থা—যেখানে বিপিসি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে থাকবে, আর যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে আমদানি ও বাজারজাতকরণে অংশ নেবে। ব্যবসা করবে বেসরকারি খাত, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, মূল্যস্থিতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চূড়ান্ত দায়িত্ব থাকবে রাষ্ট্রের হাতে।
এই ভারসাম্য নিশ্চিত করা সম্ভব হলে জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জ্বালানি বাজার সংস্কারের একটি বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই সুযোগকে বাস্তবে সুফলে পরিণত করতে হলে প্রতিযোগিতার দরজা যেমন খুলতে হবে, তেমনি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির কাঠামোকেও করতে হবে আরও শক্তিশালী।
বাংলা স্কুপ/বিশেষ প্রতিনিধি/এইচবি/এসকে
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বাজারজাতকরণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরই প্রধান ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এ ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। তবে সময়ের সঙ্গে দেশের জ্বালানি চাহিদা বাড়ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা করছে এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার সরকারি উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবেই দেখতে হবে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ আয়োজিত এক সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিপণন ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে সরকার অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এর আওতায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো—এর মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে এর সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুফল হতে পারে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া। কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা সীমিতসংখ্যক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর পুরো আমদানি ব্যবস্থা নির্ভরশীল থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ক্রয়প্রক্রিয়া কিংবা সরবরাহে কোনো ধরনের বিলম্ব হলে তার প্রভাব দ্রুত পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। বিপরীতে একাধিক আমদানিকারক থাকলে বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে এবং একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যার কারণে পুরো বাজারে সংকট তৈরির ঝুঁকি কিছুটা কমবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে দাম কমে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ক্রয়াদেশ দেওয়া, বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে বের করা কিংবা পরিবহন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে বেশি নমনীয় হতে পারে। প্রতিযোগিতা বাড়লে আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি ব্যয় কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু কম দামে তেল কেনার সুযোগ তৈরি হলেই এর সুফল নিশ্চিত হবে না। জ্বালানি তেল এমন একটি পণ্য, যার সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও শিল্প, পরিবহন, কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বেসরকারি আমদানিকারকদের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে আমদানি কমিয়ে দিলে যেন দেশের বাজারে সংকট সৃষ্টি না হয়, সে জন্য রাষ্ট্রকে ‘ব্যাকআপ’ ব্যবস্থা হিসেবে প্রস্তুত থাকতে হবে।
বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের আরেকটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে অবকাঠামো উন্নয়নে। নতুন আমদানিকারকরা টার্মিনাল, স্টোরেজ, পরিবহন ব্যবস্থা, পাইপলাইন কিংবা পরিশোধনাগার নির্মাণে বিনিয়োগ করতে পারে। এর ফলে জ্বালানি সংরক্ষণ ও সরবরাহের সক্ষমতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ওপর অবকাঠামো বিনিয়োগের চাপও কমতে পারে। বিশেষ করে বড় আকারের আধুনিক স্টোরেজ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে আন্তর্জাতিক বাজারে অনুকূল সময়ে জ্বালানি সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করার সুযোগ বাড়বে।
তবে এই ব্যবস্থার সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে। জ্বালানি তেলকে সাধারণ ভোগ্যপণ্যের মতো বিবেচনা করলে চলবে না। এটি জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই কে আমদানি করতে পারবে, কত পরিমাণ আমদানি করতে পারবে, কোথায় মজুত করবে, কত দিনের বাধ্যতামূলক মজুত রাখতে হবে, কীভাবে দাম নির্ধারণ হবে—এসব বিষয়ে শুরুতেই সুস্পষ্ট ও কঠোর নীতিমালা প্রয়োজন।
বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, সংরক্ষণ ব্যয়, কর এবং ব্যবসায়িক মুনাফা—সবকিছুর সমন্বয়ে স্থানীয় বাজারদর নির্ধারণের একটি স্বচ্ছ সূত্র থাকতে হবে। তা না হলে বেসরকারি আমদানির নামে বাজারে অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ, কৃত্রিম সংকট কিংবা অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে জ্বালানি আমদানি করলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় আমদানি হলে ডলারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তাই বেসরকারি আমদানিকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আমদানির পরিমাণ, সময় ও উৎস নির্ধারণে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সমন্বয় থাকতে হবে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হতে পারে সরকারি একচেটিয়ার জায়গায় বেসরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থা তৈরি হওয়া। একাধিক প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ না দিয়ে যদি হাতে গোনা কয়েকটি বড় কোম্পানি পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার বদলে নতুন ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে উঠতে পারে। এতে ভোক্তার কোনো প্রকৃত সুবিধা নাও হতে পারে। বরং বাজার নিয়ন্ত্রণ, মজুতদারি ও মূল্য কারসাজির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ কারণে লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা, অবকাঠামো, সংরক্ষণ ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে আমদানি, মজুত ও বিক্রির তথ্য নিয়মিত প্রকাশ এবং নিরীক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন। প্রতিটি চালানের ক্রয়মূল্য, উৎস, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য চার্জ যাচাইযোগ্য হলে অনিয়মের সুযোগ অনেকটাই কমবে।
ভারতের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। দেশটিতে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ও নায়ারা এনার্জির মতো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে পরিশোধন করছে এবং দেশীয় বাজারে জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিও করছে। ফলে সেখানে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি খাত পাশাপাশি কাজ করছে।
তবে ভারতের মডেল হুবহু বাংলাদেশে প্রয়োগ করার সুযোগ নেই। ভারতের বাজার অনেক বড়, দেশটির নিজস্ব বিশাল পরিশোধন সক্ষমতা, বন্দর অবকাঠামো এবং বড় ভোক্তা বাজার রয়েছে। বাংলাদেশের বাজার তুলনামূলক ছোট এবং জ্বালানি অবকাঠামোর সক্ষমতাও ভিন্ন। তাই ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতা অনুযায়ী নিজস্ব মডেল তৈরি করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে শুধু পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভর না করে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশে পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এতে দেশে মূল্য সংযোজন হবে, নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তবে নতুন রিফাইনারি, টার্মিনাল, স্টোরেজ ও পাইপলাইন নির্মাণে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
রাষ্ট্রের ভূমিকাও তাই নতুনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের কাজ সরাসরি সব ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করা নয়; বরং বাজারের জন্য কার্যকর নিয়ম তৈরি করা, সেই নিয়ম বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা করা। বিপিসিকে কৌশলগত মজুত, জরুরি সরবরাহ ও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় দায়িত্বে রেখে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আমদানি ও বাজারজাতকরণে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
এ জন্য একটি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা অপরিহার্য। জ্বালানি মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা, প্রতিযোগিতা কমিশন এবং অন্যান্য অংশীজনের সমন্বয়ে নিয়মিত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাজারে কারসাজি, মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কঠোর শাস্তির বিধানও কার্যকর করতে হবে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতের প্রবেশকে কেবল ভালো বা খারাপ—এমন সরল দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। এর ফল নির্ভর করবে নীতিমালা কতটা স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতা কতটা কার্যকর এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি কতটা শক্তিশালী তার ওপর। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এতে আমদানি দক্ষতা বাড়তে পারে, সরবরাহের বিকল্প উৎস তৈরি হতে পারে, অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে এবং বাজারে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভোক্তার জন্য ইতিবাচক ফল আসতে পারে।
অন্যদিকে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ থাকলে সরকারি একচেটিয়ার পরিবর্তে বেসরকারি সিন্ডিকেট, মজুতদারি, মূল্য কারসাজি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
জ্বালানি তেল শেষ পর্যন্ত নিছক একটি বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি একটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মিশ্র ব্যবস্থা—যেখানে বিপিসি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে থাকবে, আর যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে আমদানি ও বাজারজাতকরণে অংশ নেবে। ব্যবসা করবে বেসরকারি খাত, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, মূল্যস্থিতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চূড়ান্ত দায়িত্ব থাকবে রাষ্ট্রের হাতে।
এই ভারসাম্য নিশ্চিত করা সম্ভব হলে জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জ্বালানি বাজার সংস্কারের একটি বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই সুযোগকে বাস্তবে সুফলে পরিণত করতে হলে প্রতিযোগিতার দরজা যেমন খুলতে হবে, তেমনি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির কাঠামোকেও করতে হবে আরও শক্তিশালী।
বাংলা স্কুপ/বিশেষ প্রতিনিধি/এইচবি/এসকে