দিশেহারা দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষকরা

গরমে মাটির নিচেই ‘সিদ্ধ’ হয়ে যাচ্ছে আলু

আপলোড সময় : ১৪-০৮-২০২৬ ১১:৫২:১৪ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৪-০৮-২০২৬ ১১:৫৭:২৮ পূর্বাহ্ন
দক্ষিণ কোরিয়ায় কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র দাবদাহের পর দেশটির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এরই মধ্যে মাটি থেকে তোলার আগেই কিছু এলাকায় আলু পচে যাচ্ছে। আলু এতটাই নরম হয়ে গেছে যে সেগুলোকে সেদ্ধ করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য এলাকা গ্যাংওন প্রদেশের কৃষকেরা জানিয়েছেন, এক সপ্তাহ আগেও যেসব জমিকে সুস্থ ও স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল, সেসব জমিতে আলু তুলতে গিয়ে তারা দেখছেন—তোলার মতো কোনো আলুই নেই। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার সীমান্তের কাছে ইয়াংগু কাউন্টির হেয়ান এলাকায় আলু চাষ করেন লি সাং-হিয়ক। স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসকে তিনি বলেন, 'এটা শুধু একটি-দুটি জমির ঘটনা নয়। বিষয়টি কীভাবে ভাষায় প্রকাশ করব, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছি।'

তিনি বলেন, ৪০ বছর ধরে কৃষিকাজ করছেন, কিন্তু এর আগে কখনো এমন পরিস্থিতি দেখেননি।

কাছাকাছি এলাকায় কয়েক হাজার পিয়ং জমিতে চাষ করা বাঁধাকপিও মাটিতে মিশে গেছে। এক পিয়ং কোরিয়ার একটি জমির পরিমাপের একক, যা প্রায় ৩ দশমিক ৩ বর্গমিটারের সমান। বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় কৃষকেরা বাঁধাকপি তুলতে দেরি করেছিলেন। এর মধ্যেই প্রচণ্ড গরমে জমিতেই ফসল পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। নষ্ট হওয়া বাঁধাকপির মূল্য কয়েক কোটি কোরীয় ওন, অর্থাৎ কয়েক হাজার পাউন্ডের সমপরিমাণ হতে পারত।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য এলাকা গ্যাংওন প্রদেশে চলতি মাসে প্রথমবারের মতো চুনচন, হংচন ও হোয়ংসেং শহরে তীব্র দাবদাহের সতর্কতা জারি করা হয়।

কৃষকেরা জানিয়েছেন, শুধু শাকসবজিই নয়, ফলের ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আপেলের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রোদের কারণে রোদে পোড়ার সমস্যা দেখা দিয়েছে। সরাসরি সূর্যের আলোয় থাকা আপেলের খোসা পুড়ে গিয়ে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, পিচফল ফেটে যাচ্ছে।

আপেলচাষি চন জং-থে এসবিএসকে বলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে চুসক উৎসবের সময় ফল সংগ্রহের জন্য যেসব গাছে আপেল রং ধরার কথা, সেসব গাছের বৃদ্ধি থেমে গেছে। শুধু সূর্যের দিকে থাকা অংশ লাল হচ্ছে। দাবদাহ অব্যাহত থাকলে সেই অংশও বিবর্ণ হয়ে সাদা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কোরিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তীব্র গরমের কারণে দক্ষিণ কোরিয়াজুড়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং খামারে পালন করা ১৪ লাখ মাছ মারা গেছে।

২ আগস্ট দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ইয়াংসান শহরের তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। ১৯০৪ সালে আধুনিক পদ্ধতিতে তাপমাত্রা পরিমাপ শুরু হওয়ার পর এটিই দক্ষিণ কোরিয়ায় রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২২ সালের জুলাইয়ে লিংকনশায়ারের কনিংসবিতে এই তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।

তীব্র গরমে শুধু ফসল নয়, কৃষকেরাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অতিরিক্ত গরমে শারীরিক চাপ তৈরি হওয়ায় তাদের কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সময়ে ফসল পচে যাওয়ার কারণে দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে ঘরের ভেতরে থাকার সরকারি পরামর্শও তারা মেনে চলতে পারছেন না।

পিচচাষি পার্ক ওয়ান-সন বলেন, 'তারা আমাদের দিনের বেলা বাইরে গিয়ে কাজ না করতে বলছে। কিন্তু এই পিচগুলো তো পচে যাচ্ছে।'

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং মন্ত্রিসভার সদস্যদের বলেছেন, দেশের মানুষ আগে কখনো এমন আবহাওয়ার মুখোমুখি হয়নি। তিনি জাতীয় সংকট মোকাবিলা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, এ ধরনের চরম আবহাওয়া ক্রমেই নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পরিণত হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব মূলত মানুষের মৃত্যু ও গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতির ওপর কেন্দ্রীভূত রয়েছে। ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মোট পরিমাণ এখনো কর্মকর্তারা নিরূপণ করতে পারেননি।

কৃষকেরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে আগে থেকেই চড়া থাকা খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়বে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন দিনের শরৎকালীন ফসল উৎসব চুসকের আগে খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই উৎসব উপলক্ষে পরিবারগুলো ছুটির দিনের খাবারের জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য কিনে থাকে।

আলু এমন একটি ফসল, যেটিকে গবেষকেরা ইতিমধ্যে তীব্র গরমের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছেন।

২০২৪ সালে 'পটেটো রিসার্চ' সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় লাইবনিজ সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ল্যান্ডস্কেপ রিসার্চ এবং ব্র্যান্ডেনবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, ভবিষ্যতে জলবায়ুর যে পরিস্থিতিই তৈরি হোক না কেন, দক্ষিণ কোরিয়ার গ্রীষ্মকালীন আলু চাষের জন্য তাপসহনশীল জাতের প্রয়োজন হবে। তবে বসন্তকালীন আলু আরও আগে রোপণ করলে উপকার পাওয়া যেতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় এর আগেও তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি উঠেছে। পরে ঝড় এসে দেশটিতে চলা ভয়াবহ তাপপ্রবাহ থেকে সাময়িক স্বস্তি এনে দেয়।

জাপানের কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি রেকর্ড হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে এ বছর প্রথমবারের মতো সরকারি স্বীকৃত 'অত্যন্ত ভয়াবহ গরমের দিন' রেকর্ড করা হয়েছে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থা এ বছর এই শ্রেণিবিন্যাস চালু করেছে।

হংকংয়ে তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা ১৮৮৪ সালে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর সেখানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।

চীনের শিনচিয়াং অঞ্চলের একটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে জুলাই মাসে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ 'এশিয়ার জলবায়ুর অবস্থা' প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩৫ বছরে এশিয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার এর আগের তিন দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :