নেই সেই চিরচেনা রুপ: ফাঁকা নোটিশ বোর্ড, চোখ মোবাইলে

আপলোড সময় : ১০-০৮-২০২৬ ০১:২৮:৪০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১০-০৮-২০২৬ ০১:৪৬:২০ অপরাহ্ন
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন একসময় শিক্ষার্থীদের ভিড় দেখা যেত নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নোটিশ বোর্ডের সামনে। ফলাফলের কাগজ কখন টাঙানো হবে, সেই অপেক্ষায় সকাল থেকেই স্কুল-কলেজে জড়ো হতেন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তবে সময় বদলেছে। এখন আর সেই চেনা দৃশ্য খুব একটা দেখা যায় না। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও এসএমএসেই কয়েক মুহূর্তে ফল জেনে নিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল ১০টায় সারাদেশে একযোগে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনলাইন ও মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে ফল জানতে পারছেন।

ফল প্রকাশকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের সুবাস বোস এভিনিউয়ে অবস্থিত ১৪৪ বছরের ঐতিহ্যবাহী সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আগের মতো নোটিশ বোর্ডের সামনে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড় নেই। সকাল ১০টার দিকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফটকের পাশে থাকা নোটিশ বোর্ডে চোখে পড়ে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির জরিমানা সংক্রান্ত তালিকা। সেখানে এসএসসির ফলাফলের জন্য অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থীদের কোনো উপস্থিতি দেখা যায়নি। কয়েকজন অভিভাবক অবশ্য ক্লাস ছুটির অপেক্ষায় ছিলেন।

ফলের জন্য ক্যাম্পাসে অপেক্ষা নয়:
এসএসসি পরীক্ষার্থী বা ফলের অপেক্ষায় থাকা কোনো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে এসেছে কি না জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এখন অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনলাইনেই ফল দেখে নেয়। ফল প্রকাশের পর অনেকে আবার বন্ধু, শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের সঙ্গে দেখা করতে ক্যাম্পাসে আসে।

প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক শাখার কর্মকর্তা সিপন বলেন, ফল প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটির নোটিশ বোর্ডেও ফলাফল জানিয়ে দেওয়া হবে। তবে শিক্ষার্থীরা আগের মতো শুধু ফল জানার জন্য ক্যাম্পাসে আসে না। অনলাইনে ফল জানার সুযোগ থাকায় তারা ঘরে বসেই ফলাফল দেখতে পারে। কেউ কেউ ফল প্রকাশের পর বন্ধু ও শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করতে প্রতিষ্ঠানে আসে।

প্রযুক্তির সঙ্গে বদলেছে ফল জানার ধরন:
একসময় এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল বিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ড। ফলাফলের তালিকা হাতে আসার পর সেটি বোর্ডে টাঙানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন সবাই। এরপর শুরু হতো নিজের রোল নম্বর খোঁজার ব্যস্ততা। কিন্তু ডিজিটাল ব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র।

এখন ফল প্রকাশের নির্ধারিত সময়েই শিক্ষার্থীরা মোবাইল হাতে নিয়ে অনলাইনে প্রবেশ করে ফলাফল দেখছে। কেউ নিজের মোবাইল ফোনে, কেউ পরিবারের সদস্যদের ফোনে আবার কেউ ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফল জেনে নিচ্ছে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নোটিশ বোর্ডের সামনে দীর্ঘ অপেক্ষার প্রয়োজন হচ্ছে না।

দুই মাসের অপেক্ষার পর ফল: 
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২১ এপ্রিল। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর লিখিত পরীক্ষা শেষ হয় ২০ মে। আর দাখিল ও এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষার লিখিত অংশ শেষ হয় ২৪ মে।

সাধারণত লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। সে হিসাবে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে ফল প্রকাশের প্রত্যাশা ছিল। তবে বিভিন্ন কারণে নির্ধারিত সময়ের পর প্রায় তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়েছে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। শেষ পর্যন্ত ১০ আগস্ট ফল প্রকাশের দিন নির্ধারণ করা হয়।

পরীক্ষার্থী প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ:
এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিতে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করে। এর মধ্যে সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসিতে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিলে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন পরীক্ষার্থী ছিল।

ফল প্রকাশের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে এসব শিক্ষার্থীর। ফলাফল নিয়ে যেমন অনেকের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস, তেমনি ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন নিয়ে নতুন পরিকল্পনাও শুরু হয়েছে। তবে ফল জানার পদ্ধতিতে প্রযুক্তির ব্যবহার যে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের বহু পুরোনো অপেক্ষার সংস্কৃতিকে বদলে দিয়েছে, সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের চিত্রে তারই প্রতিফলন দেখা গেছে।

নেই সেই চেনা অপেক্ষা: 
অপেক্ষায় থাকা অভিভাবক মহসিনুল ইসলাম বলেন, ফল জানার জন্য শিক্ষার্থীদের সেই বোর্ড ঘিরে দীর্ঘ অপেক্ষার দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সকালবেলা নোটিশ বোর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজনের চোখে বরং ছিল অন্য দিনের ব্যস্ততা। কেউ অপেক্ষা করছিলেন ক্লাস ছুটির, কেউ হয়তো পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা করার জন্য।

প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের ফল জানার পথকে সহজ করেছে। তাই একসময় যে ফলাফলের কাগজের জন্য বিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ডের সামনে ভিড় জমতো, এখন সেই ফলাফলই মুহূর্তে পৌঁছে যাচ্ছে শিক্ষার্থীর হাতে থাকা মোবাইল ফোনে।

১৪৪ বছরের ঐতিহ্য সেন্ট গ্রেগরির: 
পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে অবস্থিত সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ১৮৮২ সালের জানুয়ারিতে বেলজিয়ামের বেনেডিক্টাইন ধর্মযাজক ফাদার গ্রেগরি ডি গ্রুট প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ সময় এটি স্কুল হিসেবে পরিচালিত হলেও ২০১৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়ে সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে কার্যক্রম শুরু করে।

প্রতিষ্ঠানটির সাবেক শিক্ষার্থীদের ‘গ্রেগোরিয়ান’ নামে পরিচিত করা হয়। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন এবং প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তি রয়েছেন।

শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে সেন্ট গ্রেগরির। বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে বাস্কেটবল চর্চার সূচনার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নাম জড়িয়ে আছে। দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কারণে পুরান ঢাকার এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি আজও শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 
 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :