জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবার আগে আঘাত হানে উপকূলের প্রকৃতিতে। এবং এর নীরব শিকার হন নারী। নদীর পানি লবণাক্ত হওয়া, নিরাপদ সুপেয় পানির সংকট, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ক্ষয় এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি। সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নের হাজারো নারী সেই ঝুঁকি নিয়ে জীবনযাপন করছেন। জরায়ু সংক্রমণ, সাদা স্রাব, চর্মরোগ, চোখের সমস্যা ও বিভিন্ন সংক্রামক রোগ বাসা বেধেছে তাদের শরীরে। যদিও এসব রোগের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততার প্রভাব কতটা গভীর, সে বিষয়ে সচেতনতা যেমন কম, তেমনি চিকিৎসা সুবিধাও সীমিত।
চিলা ইউনিয়নের জয়মণী, কাটাখালী, কোলাবাড়ি, সুন্দরতলা, থেলিখালী ও আশপাশের গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পরিবারের নারী সদস্যদের প্রতিদিন লোনা পানির সংস্পর্শে থাকতে হচ্ছে। গোসল, কাপড় ধোয়া, বাসন পরিষ্কার, মাছ ধোয়া থেকে শুরু করে গৃহস্থালির প্রায় সব কাজেই ব্যবহার হচ্ছে লবণাক্ত পানি। অনেক সময় সুপেয় পানির অভাবে সেই পানিই ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। বছরের পর বছর এভাবে লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকায় নারীর স্বাস্থ্য ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
চিলা ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার ৮৭০ জন মৎস্যজীবীর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী। নদী ও খাল থেকে মাছের পোনা, কাঁকড়া ও ছোট মাছ সংগ্রহ করে তারা পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। অনেক নারী হাঁস-মুরগি-গরু লালন, সবজি ও ফলের গাছ লাগিয়ে কিংবা ছোট কাঁকড়ার হ্যাচারি পরিচালনা করে সংসারের আয় বাড়ান। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত পরিবর্তনে সেই আয়ের পথ একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আয় কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের স্বাস্থ্যসেবার ওপর। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে অনেকেই স্থানীয় ওষুধের দোকান কিংবা কবিরাজের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
উত্তর জয়মণীর কাটা খাল এলাকার নারী জেলে রুবিয়া বেগম (৪৮) প্রতিদিন স্বামীর সঙ্গে নদীতে মাছের পোনা ধরেন। নদীর পাড়ের ছোট্ট একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করা এই নারীর চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, একসময় এক ভাটিতেই হাজার থেকে দেড় হাজার পোনা পাওয়া যেত। এখন সারাদিন নদীতে থেকেও দেড়শর বেশি পোনা পাওয়া যায় না। সংসারের আয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। লবণাক্ত পানিতে দিনের পর দিন কাজ করতে গিয়ে শরীরে চুলকানি, ত্বকের জ্বালাপোড়া এবং নারীদের গোপন রোগে ভুগলেও চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। সংসারের খাবার জোগাড় করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানান তিনি।
কাটাখালীর মণ্ডল বাড়ির গৃহবধূ মঞ্জু মণ্ডলের (৪৫) জীবনসংগ্রাম আরও কঠিন। স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি নদী থেকে কাঁকড়া ধরে সংসার চালাতেন। কিন্তু এখন নদীতে কাঁকড়ার সংকট। আয় কমে যাওয়ায় নিজের চিকিৎসা করানোর সুযোগও নেই। তিনি বলেন, আগে কষ্ট হলেও সংসার চলত। এখন ওষুধ কেনার টাকা থাকে না। অসুস্থ শরীর নিয়েই নদীতে নামতে হয়।
একই এলাকার গায়েত্রী রায়, মীরা রায়, পুষ্প রায়, লক্ষ্মী রায় ও সুনিত্রা রায়সহ কয়েকজন নারী জানান, তাদের জীবন যেন ধীরে ধীরে বালু ও লবণের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। বাতাসে উড়ে আসা বালু খাবার, বিছানা, কাপড়- সব জায়গায় জমে থাকে। চোখে জ্বালা করে, শরীরে চুলকানি হয়। শিশুদেরও পেটের সমস্যা লেগেই থাকে। আগে বাড়ির উঠানে সবজি হতো, ফলের গাছ ছিল, গরু-ছাগল পালন করা যেত। এখন ঘাস জন্মায় না, গাছ বাঁচে না, গবাদিপশুও টিকিয়ে রাখা কঠিন। তাদের ভাষায়, “আগে অভাব ছিল, কিন্তু জীবন ছিল। এখন রোগ আর অনিশ্চয়তা ছাড়া কিছুই নেই।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, নারীদের বেশিরভাগ রোগই প্রথমে গুরুত্ব পায় না। সামাজিক সংকোচের কারণে জরায়ু কিংবা প্রজননস্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কথা অনেকেই প্রকাশ করেন না। ফলে দীর্ঘদিন চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় থেকে রোগ জটিল আকার ধারণ করে। অনেক নারী ব্যথা, সাদা স্রাব কিংবা সংক্রমণকে স্বাভাবিক সমস্যা ভেবে বছরের পর বছর সহ্য করে চলেন।
জয়মণী কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যসেবা কর্মী নাসরিন আক্তার জানান, গত কয়েক বছরে চর্মরোগ, সাদা স্রাব, দাদ, একজিমা, চোখের সমস্যা এবং শিশুদের পেটের রোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। লবণাক্ত ও দূষিত পানির কারণেই এসব সমস্যা বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিদিনই এসব রোগের রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন। কিন্তু কমিউনিটি ক্লিনিকে সীমিত ওষুধ ও জনবল থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসার বাইরে বেশি কিছু করা সম্ভব হয় না।
মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহীন বলেন, লবণাক্ত ও অপরিচ্ছন্ন পানিতে নিয়মিত গোসল করলে নারীদের জরায়ুতে সংক্রমণ হতে পারে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না নিলে তা আরও জটিল হয়ে জরায়ুমুখের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তিনি আরও বলেন, গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রি-এক্লাম্পসিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও থাকে। চিলা-জয়মণী এলাকার অনেক নারী চর্ম ও জরায়ুজনিত সমস্যা নিয়ে নিয়মিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে লবণ আবহাওয়ার প্রভাবে স্বাস্থ্য সমস্যার পাশাপাশি অপুষ্টিও বাড়ছে। আগে মাছ, দুধ, ডিম, শাকসবজি ও ফলমূল সহজলভ্য থাকলেও এখন অনেক কিছুই কমে গেছে। নদীতে মাছ নেই, ঘাস না থাকায় গবাদিপশু পালন কমে গেছে, ফলের গাছ মারা যাচ্ছে। ফলে নারীরা প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ওপর।
সরকারি তথ্যও লবণাক্ততা বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করছে। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মাটি ও পানির লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একইভাবে মৎস্য বিভাগের তথ্য বলছে, ঘেরের পানির লবণাক্ততাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন, মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আর সেই প্রভাবের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন নারী।
মোংলা কৃষি কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার হাওলাদার বলেন, অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে ফসল উৎপাদন কমছে এবং গাছপালা মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় নারী জেলেদের আয়ও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবাও তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এখন শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট মানবিক প্রভাব। নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন, প্রজননস্বাস্থ্যসেবা ও বিশেষায়িত চিকিৎসা নিশ্চিত না করা গেলে আগামী দিনে এ সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। উপকূলের নারীদের স্বাস্থ্য রক্ষায় আলাদা কর্মসূচি গ্রহণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নীরব এই বিপর্যয়ের মূল্য দিতে হবে আগামী প্রজন্মকেও।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
চিলা ইউনিয়নের জয়মণী, কাটাখালী, কোলাবাড়ি, সুন্দরতলা, থেলিখালী ও আশপাশের গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পরিবারের নারী সদস্যদের প্রতিদিন লোনা পানির সংস্পর্শে থাকতে হচ্ছে। গোসল, কাপড় ধোয়া, বাসন পরিষ্কার, মাছ ধোয়া থেকে শুরু করে গৃহস্থালির প্রায় সব কাজেই ব্যবহার হচ্ছে লবণাক্ত পানি। অনেক সময় সুপেয় পানির অভাবে সেই পানিই ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। বছরের পর বছর এভাবে লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকায় নারীর স্বাস্থ্য ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
চিলা ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার ৮৭০ জন মৎস্যজীবীর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী। নদী ও খাল থেকে মাছের পোনা, কাঁকড়া ও ছোট মাছ সংগ্রহ করে তারা পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। অনেক নারী হাঁস-মুরগি-গরু লালন, সবজি ও ফলের গাছ লাগিয়ে কিংবা ছোট কাঁকড়ার হ্যাচারি পরিচালনা করে সংসারের আয় বাড়ান। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত পরিবর্তনে সেই আয়ের পথ একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আয় কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের স্বাস্থ্যসেবার ওপর। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে অনেকেই স্থানীয় ওষুধের দোকান কিংবা কবিরাজের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
উত্তর জয়মণীর কাটা খাল এলাকার নারী জেলে রুবিয়া বেগম (৪৮) প্রতিদিন স্বামীর সঙ্গে নদীতে মাছের পোনা ধরেন। নদীর পাড়ের ছোট্ট একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করা এই নারীর চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, একসময় এক ভাটিতেই হাজার থেকে দেড় হাজার পোনা পাওয়া যেত। এখন সারাদিন নদীতে থেকেও দেড়শর বেশি পোনা পাওয়া যায় না। সংসারের আয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। লবণাক্ত পানিতে দিনের পর দিন কাজ করতে গিয়ে শরীরে চুলকানি, ত্বকের জ্বালাপোড়া এবং নারীদের গোপন রোগে ভুগলেও চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। সংসারের খাবার জোগাড় করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানান তিনি।
কাটাখালীর মণ্ডল বাড়ির গৃহবধূ মঞ্জু মণ্ডলের (৪৫) জীবনসংগ্রাম আরও কঠিন। স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি নদী থেকে কাঁকড়া ধরে সংসার চালাতেন। কিন্তু এখন নদীতে কাঁকড়ার সংকট। আয় কমে যাওয়ায় নিজের চিকিৎসা করানোর সুযোগও নেই। তিনি বলেন, আগে কষ্ট হলেও সংসার চলত। এখন ওষুধ কেনার টাকা থাকে না। অসুস্থ শরীর নিয়েই নদীতে নামতে হয়।
একই এলাকার গায়েত্রী রায়, মীরা রায়, পুষ্প রায়, লক্ষ্মী রায় ও সুনিত্রা রায়সহ কয়েকজন নারী জানান, তাদের জীবন যেন ধীরে ধীরে বালু ও লবণের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। বাতাসে উড়ে আসা বালু খাবার, বিছানা, কাপড়- সব জায়গায় জমে থাকে। চোখে জ্বালা করে, শরীরে চুলকানি হয়। শিশুদেরও পেটের সমস্যা লেগেই থাকে। আগে বাড়ির উঠানে সবজি হতো, ফলের গাছ ছিল, গরু-ছাগল পালন করা যেত। এখন ঘাস জন্মায় না, গাছ বাঁচে না, গবাদিপশুও টিকিয়ে রাখা কঠিন। তাদের ভাষায়, “আগে অভাব ছিল, কিন্তু জীবন ছিল। এখন রোগ আর অনিশ্চয়তা ছাড়া কিছুই নেই।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, নারীদের বেশিরভাগ রোগই প্রথমে গুরুত্ব পায় না। সামাজিক সংকোচের কারণে জরায়ু কিংবা প্রজননস্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কথা অনেকেই প্রকাশ করেন না। ফলে দীর্ঘদিন চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় থেকে রোগ জটিল আকার ধারণ করে। অনেক নারী ব্যথা, সাদা স্রাব কিংবা সংক্রমণকে স্বাভাবিক সমস্যা ভেবে বছরের পর বছর সহ্য করে চলেন।
জয়মণী কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যসেবা কর্মী নাসরিন আক্তার জানান, গত কয়েক বছরে চর্মরোগ, সাদা স্রাব, দাদ, একজিমা, চোখের সমস্যা এবং শিশুদের পেটের রোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। লবণাক্ত ও দূষিত পানির কারণেই এসব সমস্যা বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিদিনই এসব রোগের রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন। কিন্তু কমিউনিটি ক্লিনিকে সীমিত ওষুধ ও জনবল থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসার বাইরে বেশি কিছু করা সম্ভব হয় না।
মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহীন বলেন, লবণাক্ত ও অপরিচ্ছন্ন পানিতে নিয়মিত গোসল করলে নারীদের জরায়ুতে সংক্রমণ হতে পারে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না নিলে তা আরও জটিল হয়ে জরায়ুমুখের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তিনি আরও বলেন, গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রি-এক্লাম্পসিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও থাকে। চিলা-জয়মণী এলাকার অনেক নারী চর্ম ও জরায়ুজনিত সমস্যা নিয়ে নিয়মিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে লবণ আবহাওয়ার প্রভাবে স্বাস্থ্য সমস্যার পাশাপাশি অপুষ্টিও বাড়ছে। আগে মাছ, দুধ, ডিম, শাকসবজি ও ফলমূল সহজলভ্য থাকলেও এখন অনেক কিছুই কমে গেছে। নদীতে মাছ নেই, ঘাস না থাকায় গবাদিপশু পালন কমে গেছে, ফলের গাছ মারা যাচ্ছে। ফলে নারীরা প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ওপর।
সরকারি তথ্যও লবণাক্ততা বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করছে। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মাটি ও পানির লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একইভাবে মৎস্য বিভাগের তথ্য বলছে, ঘেরের পানির লবণাক্ততাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন, মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আর সেই প্রভাবের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন নারী।
মোংলা কৃষি কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার হাওলাদার বলেন, অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে ফসল উৎপাদন কমছে এবং গাছপালা মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় নারী জেলেদের আয়ও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবাও তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এখন শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট মানবিক প্রভাব। নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন, প্রজননস্বাস্থ্যসেবা ও বিশেষায়িত চিকিৎসা নিশ্চিত না করা গেলে আগামী দিনে এ সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। উপকূলের নারীদের স্বাস্থ্য রক্ষায় আলাদা কর্মসূচি গ্রহণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নীরব এই বিপর্যয়ের মূল্য দিতে হবে আগামী প্রজন্মকেও।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন