পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়নের দুর্গম চরগুলোতে বসবাসকারী প্রায় দুই হাজার মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা যেন এক দুঃস্বপ্ন। চার বছর ধরে সেখানে নেই কোনো হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা স্থায়ী চিকিৎসক। প্রসববেদনায় কাতর গর্ভবতী নারী থেকে শুরু করে শিশু, বৃদ্ধ বা গুরুতর অসুস্থ রোগী- সবারই একমাত্র ভরসা পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদর বা পাশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানো। প্রতিকূল আবহাওয়া বা গভীর রাতে সেই যাত্রা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে, আর তখন জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে পড়ে যায় পুরো পরিবার।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চরজানাজাত ইউনিয়নের দুটি দুর্গম চরে নদীপথই একমাত্র যোগাযোগব্যবস্থা। অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সাধারণ জ্বর, সর্দি কিংবা ডায়রিয়ার মতো রোগের চিকিৎসার জন্যও সেখানে কোনো সরকারি বা বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। এমনকি সরকারি ওষুধ সরবরাহেরও ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে ঝাড়ফুঁক বা অনভিজ্ঞ গ্রাম্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চরজানাজাত ইউনিয়নের ভূমিহীন এলাকায় ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ভূখণ্ড পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। পরে ২০২১ সালে নতুন চর জেগে ওঠে এবং ২০২২ সাল থেকে সেখানে আবার বসতি গড়ে ওঠে। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস হলেও স্বাস্থ্যসেবার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
চর থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে নদীপথে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। বৈরী আবহাওয়া, তীব্র স্রোত এবং পর্যাপ্ত নৌযানের অভাবে অনেক সময় জরুরি রোগী পরিবহন করাও সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাতের বেলায় নৌকা না পাওয়ায় রোগীদের জীবন আরো ঝুঁকির মুখে পড়ে। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্সও নেই।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। গর্ভকালীন পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব কিংবা নবজাতকের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনেক নারী বাধ্য হয়ে বাড়িতেই সন্তান প্রসব করেন। এতে মা ও নবজাতক উভয়ের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, জ্বর ও ডায়রিয়ার প্রকোপও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চরের বাসিন্দা জুলেখা বেগম বলেন, “গত মাসে আমার প্রসববেদনা ওঠে। রাতে কোনো নৌকা পাওয়া যায়নি। ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করে নদী পার হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। মাঝরাতে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটত, তাহলে হয়তো আমি বা আমার সন্তান কেউই বাঁচতাম না। সরকার যেন দ্রুত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করে।”
বৃদ্ধ জব্বার মোল্লা বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছি। অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ নেই। নদী পার হতে হতে অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। কত মানুষ এসে হাসপাতাল ও রাস্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু আজও কিছুই হয়নি।”
দুই সন্তানের জননী তাসলিমা সালমা বলেন, “ছেলের জ্বর বা ডায়রিয়া হলে খুব ভয় লাগে। এখানে ডাক্তার নেই, ওষুধও পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে কবিরাজের কাছে যেতে হয়। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলে আমাদের কষ্ট করতে হতো না।”
স্থানীয় বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বেপারী বলেন, “চরের মানুষ স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক অধিকার থেকেই বঞ্চিত। এখানে চিকিৎসকসহ আধুনিক সুবিধাসংবলিত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন এখন সময়ের দাবি।”
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোতালেব বেপারী বলেন, “সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকে আমরা সম্পূর্ণ বঞ্চিত। গুরুতর রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায় না। দ্রুত কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালুর ব্যবস্থা করা জরুরি।”
মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মতিউর রহমান বলেন, “উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জনবল সংকটের কারণে দুর্গম চরাঞ্চলে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার সপ্তাহে দুই দিন সেবা দিচ্ছেন। নতুন চরে মাসে অন্তত একদিন চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
তিনি জানান, প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ৩০ শতাংশ জমি ইউএনও কমিটির মাধ্যমে পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করা হবে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চরজানাজাত ইউনিয়নের দুটি দুর্গম চরে নদীপথই একমাত্র যোগাযোগব্যবস্থা। অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সাধারণ জ্বর, সর্দি কিংবা ডায়রিয়ার মতো রোগের চিকিৎসার জন্যও সেখানে কোনো সরকারি বা বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। এমনকি সরকারি ওষুধ সরবরাহেরও ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে ঝাড়ফুঁক বা অনভিজ্ঞ গ্রাম্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চরজানাজাত ইউনিয়নের ভূমিহীন এলাকায় ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ভূখণ্ড পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। পরে ২০২১ সালে নতুন চর জেগে ওঠে এবং ২০২২ সাল থেকে সেখানে আবার বসতি গড়ে ওঠে। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস হলেও স্বাস্থ্যসেবার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
চর থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে নদীপথে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। বৈরী আবহাওয়া, তীব্র স্রোত এবং পর্যাপ্ত নৌযানের অভাবে অনেক সময় জরুরি রোগী পরিবহন করাও সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাতের বেলায় নৌকা না পাওয়ায় রোগীদের জীবন আরো ঝুঁকির মুখে পড়ে। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্সও নেই।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। গর্ভকালীন পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব কিংবা নবজাতকের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনেক নারী বাধ্য হয়ে বাড়িতেই সন্তান প্রসব করেন। এতে মা ও নবজাতক উভয়ের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, জ্বর ও ডায়রিয়ার প্রকোপও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চরের বাসিন্দা জুলেখা বেগম বলেন, “গত মাসে আমার প্রসববেদনা ওঠে। রাতে কোনো নৌকা পাওয়া যায়নি। ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করে নদী পার হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। মাঝরাতে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটত, তাহলে হয়তো আমি বা আমার সন্তান কেউই বাঁচতাম না। সরকার যেন দ্রুত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করে।”
বৃদ্ধ জব্বার মোল্লা বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছি। অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ নেই। নদী পার হতে হতে অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। কত মানুষ এসে হাসপাতাল ও রাস্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু আজও কিছুই হয়নি।”
দুই সন্তানের জননী তাসলিমা সালমা বলেন, “ছেলের জ্বর বা ডায়রিয়া হলে খুব ভয় লাগে। এখানে ডাক্তার নেই, ওষুধও পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে কবিরাজের কাছে যেতে হয়। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলে আমাদের কষ্ট করতে হতো না।”
স্থানীয় বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বেপারী বলেন, “চরের মানুষ স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক অধিকার থেকেই বঞ্চিত। এখানে চিকিৎসকসহ আধুনিক সুবিধাসংবলিত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন এখন সময়ের দাবি।”
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোতালেব বেপারী বলেন, “সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকে আমরা সম্পূর্ণ বঞ্চিত। গুরুতর রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায় না। দ্রুত কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালুর ব্যবস্থা করা জরুরি।”
মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মতিউর রহমান বলেন, “উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জনবল সংকটের কারণে দুর্গম চরাঞ্চলে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার সপ্তাহে দুই দিন সেবা দিচ্ছেন। নতুন চরে মাসে অন্তত একদিন চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
তিনি জানান, প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ৩০ শতাংশ জমি ইউএনও কমিটির মাধ্যমে পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করা হবে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন