বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারিতে গেলে সংকটের শঙ্কা

আপলোড সময় : ২৪-০৭-২০২৬ ১২:৩০:৩৪ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৪-০৭-২০২৬ ১২:৩০:৩৪ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত গত এক যুগে সবচেয়ে বড় যে নীতিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, তা হলো উৎপাদনে বেসরকারি খাতের ব্যাপক প্রবেশ। সরকারের যুক্তি ছিল— বিনিয়োগ বাড়বে, দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে এবং ঘাটতি দূর হবে। বাস্তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও তার সঙ্গে এসেছে আরেক বাস্তবতা— চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, অলস বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাজার হাজার কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ এবং ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির বোঝা।

সেই অভিজ্ঞতার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সরকার বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থাকেও ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। সরকারের ভাষ্য, এতে সিস্টেম লস কমবে, বিল আদায়ের দক্ষতা বাড়বে, গ্রাহকসেবা উন্নত হবে এবং রাষ্ট্রের আর্থিক চাপ কমবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— যে দেশে বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় সংকট এখন উৎপাদন নয়, বরং উচ্চ ব্যয়, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ও দুর্বল নীতিগত ব্যবস্থাপনা, সেখানে শুধু বিতরণব্যবস্থার মালিকানা বদল কি কাঙ্ক্ষিত সমাধান এনে দিতে পারবে?

বিদ্যুৎ খাত নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশের মতে, সমস্যার মূল কারণ না বদলে শুধু পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বদলালে সংকটের চরিত্র বদলাতে পারে, কিন্তু সংকট দূর হবে না। বর্তমানে দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি রয়েছে। এগুলো হলো— ডিপিডিসি, ডেসকো, নেসকো এবং ওজোপাডিকো। এর বাইরে সরকারি সংস্থা হিসেবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিতরণ করে। তবে পিডিবি বিদ্যুৎ বিতরণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনও করে। পাশাপাশি তারা দেশের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের একমাত্র পাইকারি ক্রেতা। পিডিবি আবার এই বিদ্যুৎ অন্যান্য বিতরণ কোম্পানি ও সংস্থার কাছে বিক্রি করে গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহের জন্য।

সরকারের লক্ষ্য কী

গত বুধবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সেবার মান উন্নয়ন এবং বিল আদায়ের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য সরকার বিতরণব্যবস্থায় বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়াতে চায়।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পাইকারি পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতেই থাকবে। তবে বিতরণব্যবস্থায় বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানো হলে জবাবদিহি, বিল আদায় এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের আর্থিক চাপ কমবে। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব গ্রহণে বেসরকারি খাতের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদন ও পাইকারি বিদ্যুৎ সরকারের হাতেই থাকবে। পরিবর্তন আসবে শুধু গ্রাহক পর্যায়ের বিতরণে।

সরকারের যুক্তি মূলত তিনটি— সিস্টেম লস কমানো; রাজস্ব আদায় বাড়ানো; সরকারি ভর্তুকি ও পরিচালন ব্যয় কমানো। এরই মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বিতরণ কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব নিতে আগ্রহী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রস্তাবও আহ্বান করা হয়েছে।

কিন্তু সংকটের মূল অন্য খানে

বিদ্যুৎ খাতের অর্থনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যয় বিতরণ পর্যায়ে নয়; বরং উৎপাদন ও জ্বালানি সংগ্রহ পর্যায়ে। গত এক দশকে অসংখ্য বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে দেশে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার অনেক বেশি হয়েছে। ফলে বহু কেন্দ্র বছরের বড় সময় অলস থাকে। তবু চুক্তি অনুযায়ী তাদের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়।

অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসের ঘাটতির কারণে এলএনজি, কয়লা ও আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেই উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে— যেখানে ব্যয়ের বড় অংশ উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে, সেখানে শুধু বিতরণ বেসরকারি করলে সরকারের আর্থিক চাপ কতটা কমবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে সিস্টেম লস কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু সেটি বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক আর্থিক সংকট সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়।

বিশ্ব কী বলছে

সরকার ভারতের দিল্লি, মুম্বাই ও কলকাতার উদাহরণ দিচ্ছে। দিল্লিতে বেসরকারীকরণের পর সিস্টেম লস প্রায় ৫০ শতাংশ থেকে এক অঙ্কে নেমে আসে। বিল আদায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। কিন্তু একই ভারতের ওডিশায় বেসরকারীকরণ ব্যর্থ হয়েছে। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি, গ্রাহক অসন্তোষ বেড়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।

একই চিত্র বিশ্বের অন্য দেশেও। যুক্তরাজ্যে বেসরকারীকরণ কার্যকর হয়েছে মূলত শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কঠোর জবাবদিহি এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থার কারণে। অন্যদিকে পাকিস্তানের করাচিতে কে-ইলেকট্রিক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করলেও বিদ্যুতের দাম, লোডশেডিং এবং সেবার মান নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি।

নাইজেরিয়ায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়া এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারণে বেসরকারীকরণ প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ আবার অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ও অনিয়মের কারণে বিতরণব্যবস্থা পুনরায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, সাফল্য বা ব্যর্থতার নির্ধারক মালিকানা নয়; বরং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, চুক্তির স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতা।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা বেসরকারি খাতে নেওয়ার মিশ্র অভিজ্ঞতা রয়েছে উল্লেখ করে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য ড. ম তামিম বলেছেন, ভারতের দিল্লিতে সিস্টেম লস কমার পাশাপাশি কিছু সুবিধাও এসেছে। কিন্তু মুম্বাই ও অন্যান্য স্থানের অভিজ্ঞতা ভালো না। বাংলাদেশে বিতরণব্যবস্থা বেসরকারি খাতে দিলে তারা যে খুব ভালো করবে সেই নিশ্চয়তা নেই।

হুট করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বললেন, এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য দেশের বিদ্যুৎ খাত এখনো প্রস্তুত না। এজন্য আরও সময় ও প্রস্তুতি দরকার। কারিগরি, অর্থনৈতিক এবং আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো সঠিকভাবে পর্যালোচনা করে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যুৎ সাধারণ কোনো পণ্য নয়; এটি একটি মৌলিক জনসেবা। সরকারের লক্ষ্য যেখানে সর্বজনীন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা, সেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য হবে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা অর্জন।

ফলে স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি ঝুঁকি সামনে আসে। প্রথমত, লাভজনক শহর ও শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়লেও গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় সেবার মান কমে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিইআরসি ট্যারিফ নির্ধারণ করলেও বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে মূল্য সমন্বয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— বিদ্যুৎ বিতরণের মতো কৌশলগত খাত যদি সীমিত কয়েকটি বড় করপোরেট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারের নীতিগত স্বাধীনতাও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

অতীতের শিক্ষা কী

ভোক্তা-অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, উৎপাদন খাতে বেসরকারীকরণের অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নেওয়া উচিত। তার মতে, অতিরিক্ত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, অসম চুক্তি এবং ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে এখন রাষ্ট্রকে বিপুল আর্থিক বোঝা বহন করতে হচ্ছে। সেই অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন না করেই বিতরণ খাতে একই ধরনের নীতি গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। তার প্রশ্ন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কেবল মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে কীভাবে বিদ্যুৎ খাতের মৌলিক সমস্যার সমাধান হবে?

অধ্যাপক শামসুল আলমের ভাষায়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাত বেসরকারীকরণ করে আমদানির বাজারে পরিণত করার এই পরিকল্পনা তো ১৯৯০ সাল থেকেই শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেসরকারি খাতে ব্যাপকহারে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে এখন কম দামের সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে সেখান থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। আবার উৎপাদন না করলেও বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে সরকারকে। অসম চুক্তির মাধ্যমে আদানিসহ অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লুণ্ঠনের মাধ্যমে বাড়তি টাকা আদায় করছে। যার কুফল ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। বিদ্যুতের দাম বাড়ছে আবার সরকারের ভর্তুকিও বাড়ছে। এখান থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।

সরকারের নিজেরই জ্বালানি নিরাপত্তা নেই, সেখানে কোনো হিসাব না করেই এমন পরিকল্পনার কথা কীভাবে বলে? একটা গণতান্ত্রিক সরকার কখনই এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। হয়তো কোথাও থেকে চাপ আসছে। যারা চাপ দিচ্ছে তারা শক্তিশালী এবং বিগত সময়ে নানান অযৌক্তিক সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছে, যোগ করেন তিনি। সরকার শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে না, এমনটাই বিশ্বাস শামসুল আলমের। এরপরও যদি হয় তাহলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে বলে মনে করেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম। তিনি বললেন, সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বিতরণব্যবস্থায় কিছু নন টেকনিক্যাল সিস্টেম লস কমবে। কিন্তু তাতে সরকারের ভর্তুকি কিংবা পিডিবির লোকসান কমবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংকট আরও বাড়বে।

শফিকুল আলম মনে করছেন, সরকার এখন নিম্ন আয়ের মানুষকে কম দামে বিদ্যুৎ দিচ্ছে। বেসরকারি খাতে গেলে বিশাল এই জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা কে দেবে, সেটি এখানে বড় প্রশ্ন। বেসরকারি কোম্পানিগুলো কি প্রতিযোগিতা দরে বিদ্যুৎ কিনবে? নাকি বিইআরসির বেঁধে দেওয়া দামে কিনবে? গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম কে নির্ধারণ করবে? এমন আরও অনেক প্রশ্ন থেকে যায়।

তারা ভাষায়, আপাতদৃষ্টিতে গ্রাহক পর্যায়ে বিশেষ করে শিল্পকারখানায় বিদ্যুতের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর সেটি হলে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। সূত্র: আগামীর সময়

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :