চিংড়ির রেণুপোনা পাচারের রমরমা বাণিজ্য, হুমকিতে মৎস্যসম্পদ

আপলোড সময় : ২৮-০৬-২০২৬ ১২:০৪:২৬ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৮-০৬-২০২৬ ১২:০৪:২৬ অপরাহ্ন
সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। তারপরও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নদী ও মোহনায় থেমে নেই চিংড়ির রেণুপোনা আহরণ ও পাচার। বছরের পর বছর ধরে চলা এ অবৈধ বাণিজ্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উপকূলের বিভিন্ন নদী ও মোহনা থেকে সংগ্রহ করা রেণুপোনা স্থানীয় সংগ্রহকেন্দ্র হয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে। আর এ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সংগ্রহকারী, আড়ৎদার, পরিবহনকারী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া, গলাচিপা, দশমিনা ও রাঙ্গাবালী উপজেলার নদী মোহনা ঘুরে দেখা গেছে, ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শত শত মানুষ সূক্ষ জাল নিয়ে রেণুপোনা আহরণে ব্যস্ত। জোয়ারের পানির সঙ্গে ভেসে আসা চিংড়ির রেণু ধরতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে অবস্থান করেন তারা। পরে সংগ্রহ করা রেণুপোনা স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হয়।

কুয়াকাটার মম্বিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. নাসিরউদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, রেণুপোনা ধরা বন্ধ করলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে। বিকল্প কোনো কাজ নেই। তাই ঝুঁকি জেনেও এ কাজ করতে হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু কলাপাড়া, গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলাতেই প্রায় দেড় হাজারের বেশি পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ পেশার ওপর নির্ভরশীল।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নদীতে রেণুপোনা সংগ্রহকারীরা এ ব্যবসার সবচেয়ে নিচের স্তরে অবস্থান করলেও মূল মুনাফা চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী ও বড় ব্যবসায়ীদের হাতে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে রেণুপোনা কিনে তা কয়েক ধাপে হাতবদল হয়ে দেশের বিভিন্ন চিংড়ি ঘেরে পৌঁছায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তি জানান, আমরা কলাপাড়া উপজেলায় ৮ জন ব্যাবসায়ী আছি। যারা রেনু পোনা বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে সংগ্রহ করি। পরিবহন ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে ফয়সাল, সোহেল ও আশরাফুজ্জামান টুলু। এখানে আলাদা চেইন আছে। যারা রেণু ধরে তারা কম লাভ পায়। মূল লাভ করেন যারা সংগ্রহ, পরিবহন ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নদী ও মোহনা থেকে সংগৃহীত রেণুপোনা প্রথমে স্থানীয় সংগ্রহ কেন্দ্রে আনা হয়। সেখানে বাছাই ও সংরক্ষণের পর অক্সিজেন যুক্ত ড্রাম বা বিশেষ পাত্রে ভরে ট্রাক, ট্রলার কিংবা স্পিডবোট যোগে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।

মূলত রাতের আঁধারেই ট্রাকে করে এ বিপুল পরিমাণ রেণুপোনা পরিবহন করা হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন চিংড়ি চাষ এলাকায় নিয়মিত এসব চালান পৌঁছানো হয়।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে রেণুপোনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের জন্য গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। স্থানীয় পর্যায়ে কয়েকজন ব্যবসায়ী পুরো প্রক্রিয়া সমন্বয় করেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নজর এড়াতে তারা বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন কৌশলও ব্যবহার করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কলাপাড়া উপজেলার কয়েকজন প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে এ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা রেণুপোনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।

অভিযোগের বিষয়ে পরিবহন ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে থাকা মো. আশরাফুজ্জামান টুলু অভিযোগ স্বীকার করে জানান, দীর্ঘদিন এ ব্যাবসার সঙ্গে যুক্ত। এ লাইনে সকল সেক্টর আমার পরিচিত তাই এ পেশা ছাড়তে পারছি না। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রশাসনের নজর এড়াতে অনেক সময় মাছবাহী ট্রাক কিংবা অন্যান্য বৈধ পণ্য পরিবহনের আড়ালে রেণুপোনা বহন করা হয়।

এক ট্রাকচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক সময় গাড়িতে কী মালামাল আছে তা আমরা জানি না। পরে বুঝতে পারি রেণুপোনা পরিবহন করা হচ্ছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চিংড়ির রেণুপোনা সংগ্রহের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় পরিবেশের ওপর। কারণ একটি রেণুপোনা ধরতে গিয়ে অসংখ্য দেশীয় মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণির পোনা ধ্বংস হয়ে যায়। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রেণুপোনা আহরণের সময় বিপুল পরিমাণ অলক্ষ্যভুক্ত জলজ প্রাণি মারা যায়, যা নদী ও মোহনার জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

পটুয়াখালীর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানান, চিংড়ির রেণুপোনা আহরণ, পরিবহন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, রেণুপোনা সংগ্রহের সময় অন্যান্য মাছের পোনা ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেশের মৎস্য উৎপাদনের ওপর পড়বে।

পটুয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ তারেক হাত্তলাদার জানান, অবৈধ রেণুপোনা আহরণ ও পাচার বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি বা চক্রের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অভিযান দিয়ে এ বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব নয়। একদিকে উপকূলের দরিদ্র মানুষের জীবিকার সংকট, অন্যদিকে কোটি টাকার মুনাফা-এই দুই বাস্তবতার মাঝেই টিকে আছে নিষিদ্ধ রেণুপোনা ব্যবসা।

প্রশ্ন উঠেছে, বছরের পর বছর ধরে প্রকাশ্যে চলা এ বাণিজ্যের পেছনে কারা রয়েছে? কীভাবে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রেণুপোনা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পৌঁছে যাচ্ছে? আর কেন এখনো পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না এ অবৈধ নেটওয়ার্ক?
 
বাংলাস্কুপ/ প্রতিনিধি/এনআইএন 

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :