বর্জ্য থেকে সম্পদের স্বপ্ন, সিলেটে বাড়ছে ময়লার পাহাড়

আপলোড সময় : ০৮-০৬-২০২৬ ১২:০২:২৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৮-০৬-২০২৬ ১২:০২:২৩ অপরাহ্ন
প্রায় ১০ লাখ মানুষের নগরী সিলেটে প্রতিদিন উৎপাদিত হয় প্রায় ৫০০ টন বর্জ্য। এই বিপুল বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে দেশের প্রথম ‘ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি’ (এমআরএফ) প্ল্যান্ট চালু করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) ও লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য পৃথকীকরণ করা হচ্ছে। প্রকল্প চালুর প্রায় দেড় বছর পর দেখা যাচ্ছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল সংকট এখনো রয়ে গেছে আগের জায়গাতেই।

প্ল্যান্টে পৃথক করা বর্জ্যের একটি অংশ পুনর্ব্যবহারে গেলেও অবশিষ্ট বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনের ভেতরেই স্তূপাকারে জমা হচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই বড় হচ্ছে ময়লার পাহাড়।

একই সঙ্গে ডাম্পিং স্টেশন থেকে নির্গত কালো তরল বর্জ্য আশপাশের কৃষিজমি ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে পরিবেশ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

সূত্র জানায়, পরিবেশবান্ধব উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সিলেট সিটি করপোরেশন ও লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ যৌথভাবে দক্ষিণ সুরমার লালমাটিয়া ডাম্পিং গ্রাউন্ডে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অত্যাধুনিক বর্জ্য পৃথকীকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন করে। ২০২৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্ল্যান্টটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হলেও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয় ওই বছরের মাঝামাঝি সময়ে।

প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল নগরীর বর্জ্য পৃথক করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান উদ্ধার, পরিবেশ দূষণ কমানো এবং ডাম্পিং স্টেশনের ওপর চাপ হ্রাস করা। বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, বর্জ্যের একটি অংশ পুনর্ব্যবহার হলেও বিপুল পরিমাণ আবর্জনা এখনো ডাম্পিং স্টেশনের ভেতরেই জমা হচ্ছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, নগরীতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ২৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য আসে বাসাবাড়ি ও গৃহস্থালি থেকে। এসব বর্জ্য সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সংগ্রহ করে ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে যান। অবশিষ্ট বর্জ্যের একটি অংশ ভাঙারি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহার হয়। কিছু বর্জ্য ড্রেন ও ছড়ার মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং কিছু এলাকায় মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। ফলে নগরীতে উৎপাদিত সব বর্জ্য সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে না।

সিসিকের প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন জানান, ‍বর্তমানে পুরো শহরে প্রতিদিন প্রায় ৪৭৫ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ৩০০ টনেরও বেশি বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহন করা হচ্ছে। ডাম্পিং স্টেশনে স্থাপিত এমআরএফ প্ল্যান্টে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়। বর্জ্য পৃথকীকরণের মাধ্যমে গড়ে ৫০ থেকে ৭০ টন প্লাস্টিক ও পলিথিন আলাদা করা হয়।

এসব প্লাস্টিক ও পলিথিন প্রতিদিন কয়েকটি ট্রাকে করে সুনামগঞ্জের ছাতকে অবস্থিত লাফার্জ হোলসিমের সিমেন্ট কারখানায় পাঠানো হয়। সেখানে এগুলো বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে, প্লাস্টিক আলাদা করার পর অবশিষ্ট যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য থাকে, তার কার্যকর ব্যবস্থাপনা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। এসব বর্জ্যের বড় অংশ আবার ডাম্পিং স্টেশনের ভেতরেই ফেলে রাখা হচ্ছে। ফলে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আরেক স্তরের বর্জ্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, ডাম্পিং স্টেশনের বিভিন্ন স্থানে খোলা আকাশের নিচে বর্জ্যের বিশাল স্তূপ পড়ে আছে। কোথাও পুরোনো বর্জ্যের পাহাড়, কোথাও আবার সদ্য প্রক্রিয়াজাত বর্জ্যের স্তূপ। প্রতিদিন নতুন বর্জ্য যুক্ত হওয়ায় ডাম্পিং স্টেশনের পরিধি ক্রমেই বাড়ছে।

লালমাটিয়া ডাম্পিং স্টেশনের আশপাশের এলাকাগুলোতে গেলে প্রথমেই নাকে আসে তীব্র দুর্গন্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এই দুর্গন্ধের সঙ্গে বসবাস করতে হচ্ছে তাদের। ডাম্পিং স্টেশনের পাশ দিয়ে চলাচলকারী মানুষজন জানান, অনেক সময় নাক চেপে রাস্তা পার হতে হয়। বিশেষ করে গরমের সময় এবং বৃষ্টির পরে দুর্গন্ধ আরো তীব্র হয়ে ওঠে। ডাম্পিং স্টেশন সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভোগান্তিও বেড়েছে। দুর্গন্ধের পাশাপাশি মশা-মাছির উপদ্রবও বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ডাম্পিং স্টেশন থেকে নির্গত কালো রঙের তরল বর্জ্য বা লিচেট নিয়ে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ডাম্পিং স্টেশনের বিভিন্ন অংশ থেকে কালচে রঙের তরল পদার্থ ড্রেনের মাধ্যমে নিচু এলাকায় প্রবাহিত হচ্ছে। এসব তরল আশপাশের জমি, খাল ও বিলের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পারাইরচক এলাকার বাসিন্দা জামাল মিয়া বলেন, “বৃষ্টির সময় ডাম্পিং স্টেশন থেকে বের হওয়া পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ে। এতে ধানের চারা নষ্ট হয়ে যায়। আগে যেসব জমিতে ভালো ফলন হতো, এখন সেখানে উৎপাদন অনেক কমে গেছে। আশপাশের বিল ও জলাশয়েও আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না।”

স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, প্ল্যান্টে আধুনিক প্রযুক্তি থাকলেও পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি নতুন পরিবেশগত ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন বলেন, “ডাম্পিং স্টেশনে ‘লিচেট ম্যানেজমেন্ট’ ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল। তবে, গত ১৫ থেকে ২০ বছরে এমন কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।”

তিনি বলেন, “একবার অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে তরল বর্জ্য বাইরে চলে গিয়েছিল। পরে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।” নিয়মিতভাবে তরল বর্জ্য বাইরে যাওয়ার কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই বলেও জানান তিনি।

প্রক্রিয়াজাত বর্জ্য আবার ডাম্পিং স্টেশনে ফেলা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, “একদিনে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া ‘বায়োমাইনিং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে বহু বছরের পুরোনো বর্জ্যও প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব, তবে এর জন্য বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।”

লাফার্জকে প্রতিদিন প্লাস্টিক সরবরাহের বিষয়ে তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠানটি কারিগরি সহায়তা ও প্ল্যান্টের রক্ষণাবেক্ষণ করছে। প্রতিদিন প্রায় ৫০ টন প্লাস্টিক ও পলিথিন সরিয়ে নেওয়ায় ডাম্পিং স্টেশনের ওপর চাপ কমছে। বর্তমানে এসব বর্জ্য আলাদা করে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করার মতো অবকাঠামো কিংবা পর্যাপ্ত জনবল সিটি করপোরেশনের নেই।”
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
 

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :