বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পিডিবির নতুন কৌশল

আপলোড সময় : ১২-০৫-২০২৬ ১১:৫০:২১ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১২-০৫-২০২৬ ১১:৫০:২১ পূর্বাহ্ন
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে নতুন কৌশল নিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের বিলের ধাপ (স্ল্যাব) বদল করে আয় বাড়াতে চায় সংস্থাটি। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে কম দামে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা হারাতে পারেন গ্রাহকদের একটি বড় অংশ। এ ছাড়া বছরে দুবার দাম সমন্বয় চায় পিডিবি।

পিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, এতে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহকের ওপর বাড়তি বিলের চাপ তৈরি হতে পারে। তাঁদের মধ্যে ২৩ শতাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির, যাঁরা মাসে ২০০ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। এমন গ্রাহকেরা সাধারণত বাসায় নিয়মিত একাধিক বাতি, ফ্যান, ফ্রিজ ও টিভি চালাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন।

বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে মাসে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী লাইফলাইন গ্রাহক। এটি সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ধাপ। যাঁরা মূলত বাতি ও একটি ফ্যান চালান। এরপর ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা প্রথম ধাপের গ্রাহক। প্রস্তাব অনুযায়ী, লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়বে না। তবে ৭৫ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেই গ্রাহককে বাড়তি দামের আওতায় পড়তে হবে।

পিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, এতে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহকের ওপর বাড়তি বিলের চাপ তৈরি হতে পারে। তাঁদের মধ্যে ২৩ শতাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির, যাঁরা মাসে ২০০ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন।

বর্তমানে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা দ্বিতীয় ধাপের বিল দেন। পিডিবি এই ধাপটি বদলে শূন্য থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থাৎ ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত কম দামের সুবিধা আর পাওয়া যাবে না। পিডিবির হিসাবে, এ পরিবর্তনে খুচরা পর্যায়ে বছরে ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা বাড়তি আয় হতে পারে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) থেকেও আয় বাড়ানোর একাধিক পথ খুঁজছে পিডিবি।

পিডিবির প্রস্তাবের প্রভাব বোঝা যেতে পারে মাসে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী একজন গ্রাহকের বিলের হিসাব থেকে। বর্তমান নিয়মে তাঁর প্রথম ৭৫ ইউনিটের বিল হয় প্রথম ধাপের দরে, প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা। এতে বিল দাঁড়ায় ৩৯৪ টাকা ৫০ পয়সা। বাকি ১২৫ ইউনিটের বিল হয় দ্বিতীয় ধাপের দরে—প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ২০ পয়সা। এতে যোগ হয় আরও ৯০০ টাকা। সব মিলিয়ে বর্তমান দরে বিল দাঁড়ায় ১ হাজার ২৯৪ টাকা ৫০ পয়সা।

ঘাটতির সংকট দেখিয়ে ভোক্তার ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। পিডিবি দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দিতে পারে, ঘাটতি পূরণের কৌশল বলে দিতে পারে না।

কিন্তু পিডিবির প্রস্তাব কার্যকর হলে একই ২০০ ইউনিটের পুরোটাই দ্বিতীয় ধাপের দরে হিসাব হবে। এতে বিদ্যুতের দাম না বাড়লেও ওই গ্রাহকের বিল হবে ১ হাজার ৪৪০ টাকা। অর্থাৎ শুধু ধাপ বদলের কারণেই তাঁর বিল বাড়বে ১৪৫ টাকা ৫০ পয়সা।

এর সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপের দামও বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পিডিবি। তারা প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ২০ পয়সা করতে চায়। সেটি কার্যকর হলে মাসে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল হবে ১ হাজার ৬৪০ টাকা। অর্থাৎ তাঁর মাসিক বিল বাড়বে ৩৪৫ টাকা ৫০ পয়সা। এর বাইরে বিলের সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট যুক্ত হবে।

পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, গরিব মানুষের বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায় না সরকার। তাই প্রথম দুটো শ্রেণিতে দাম না বাড়িয়ে দ্বিতীয় ধাপ থেকে স্ল্যাব পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছ। এর ফলে যাঁরা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাঁরা আর প্রথম ধাপের কম দামে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা পাবেন না।

তবে বিদ্যুৎ খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পিডিবির আগে নিজেদের অযৌক্তিক খরচ কমানো উচিত। তা না করে তারা গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি টাকা তুলতে চাইছে। কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্যই বিলে ধাপভিত্তিক সুবিধা রাখা হয়েছে। আয়করের ক্ষেত্রেও স্ল্যাব অনুসারে করের হার নির্ধারিত হয়। প্রথম ধাপের সুবিধা দ্বিতীয় ধাপের কর পরিশোধকারীরাও পান।

পিডিবির হিসাবে, দেশে আবাসিক বিদ্যুৎ গ্রাহক ৪ কোটি ৩১ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহক লাইফলাইন শ্রেণির, যাঁরা ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহার করেন। আর ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহার করেন আরও ২২ শতাংশ গ্রাহক। তবে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহার করেন ১ কোটি ৫৩ হাজার ৮৬২ গ্রাহক। বাকি চারটি ধাপ যথাক্রমে ২০০ থেকে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী (১২ শতাংশ)।

পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, আর্থিক ঘাটতির কারণে জ্বালানি (তেল, কয়লা) কেনা যাচ্ছে না, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল দেওয়া যাচ্ছে না। খরচ কমিয়েও ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না। কয়েক বছরে ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। জ্বালানির দাম বাড়তি। তাই বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঘাটতি কমাতেই আবাসিকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধাপ পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো যাচাই করে দেখবে বিইআরসি।

বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের জন্য ৩ মে বিইআরসি–কে চিঠি দিয়েছি বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে বলা হয়, চলমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্যহার সমন্বয়ে গত ২৭ এপ্রিল সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা কমিটি। পাইকারি পর্যায়ে ২১ শতাংশ (প্রতি ইউনিটে দেড় টাকা) ও সে অনুযায়ী খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো এবং ধাপ পরিবর্তন করে প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ৪ মে বিইআরসিতে প্রস্তাব জমা দেয় পিডিবি। পাইকারির সঙ্গে খুচরা দামও বাড়ানোর প্রস্তাব করে তারা। এরপর অন্য পাঁচটি বিতরণ সংস্থাও পাইকারির সঙ্গে মিলিয়ে দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করে। ৫ মে এটি আমলে নিয়ে কারিগরি কমিটি করে বিইআরসি। ২০ ও ২১ মে শুনানি ডেকেছে কমিশন। ১ জুন থেকে বাড়তি দাম কার্যকরের প্রস্তাব করেছে পিডিবি।

বিদ্যুৎ বিলের ধাপ করা হয়েছে মূলত কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীকে সুবিধা দিতে। ধাপ পরিবর্তন নিয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না। কারিগরি কমিটি প্রতিবেদন দেবে, এরপর শুনানিতে এগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। তবে ভোক্তাস্বার্থ বিবেচনা করেই সব প্রস্তাবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন। 

বিদ্যুতের দাম নিয়মিত সমন্বয় করতে আগামী কয়েক বছরের জন্য (মাল্টিইয়ার ট্যারিফ) বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে পিডিবি। এতে আগাম ধারণা পাওয়ায় গ্রাহক প্রস্তুতি নিতে পারবেন। এ ছাড়া পাইকারি বিদ্যুতের দামের সঙ্গে জ্বালানি খরচ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত করার প্রস্তাব করেছে পিডিবি। এর জন্য একটি সূত্র প্রস্তাব করা হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে বা কমলে বিদ্যুতের পাইকারি দামও বাড়বে বা কমবে। প্রতি ছয় মাস পর এটি সমন্বয়ের প্রস্তাব করেছে পিডিবি।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ  বলেন, বিদ্যুৎ বিলের ধাপ করা হয়েছে মূলত কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীকে সুবিধা দিতে। ধাপ পরিবর্তন নিয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না। কারিগরি কমিটি প্রতিবেদন দেবে, এরপর শুনানিতে এগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। তবে ভোক্তাস্বার্থ বিবেচনা করেই সব প্রস্তাবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।

বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানোর তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চাহিদার দ্বিগুণ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করে বাড়ানো হয়েছে ক্যাপাসিটি চার্জ বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া। দরপত্র ছাড়া বিশেষ ক্ষমতা আইনে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। গত অন্তর্বর্তী সরকার আইনটি রহিত করেছে। এরপর ওই আইনের অধীনে সব চুক্তি পর্যালোচনায় একটি জাতীয় কমিটি গঠন করে দেয়। গত জানুয়ারিতে প্রতিবেদন দিয়েছে জাতীয় কমিটি। চুক্তি পর্যালোচনায় গত মাসে নতুন করে আরেকটি কমিটি করেছে বর্তমান সরকার।

জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, অস্বাভাবিক দামে বিদ্যুৎ কিনছে সরকার। ফার্নেস তেলচালিত কেন্দ্রে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দাম। গ্যাসচালিত কেন্দ্রে ৪৫ শতাংশ বেশি। সৌরবিদ্যুৎ খাতে ৭০–৮০ শতাংশ বেশি। এগুলো বাজারের দাম নয়, চুক্তির ফল। সংস্কার করা না হলে দেশ ডুবে যাবে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, খরচ না কমিয়ে লুণ্ঠনের সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে সরকার। আর ঘাটতির সংকট দেখিয়ে ভোক্তার ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। পিডিবি দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দিতে পারে, ঘাটতি পূরণের কৌশল বলে দিতে পারে না। বিদ্যুৎ বিলের ধাপ পরিবর্তনের প্রস্তাব বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। এটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়, শুনানির বিষয় নয়। এসব প্রস্তাবের মানে হলো নিম্নমধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করা।  

সূত্র: প্রথম আলো

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন  

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :