ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করতে যৌন নির্যাতনকে হাতিয়ার করেছে ইসরাইল

আপলোড সময় : ২১-০৪-২০২৬ ০২:৩১:৩২ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২১-০৪-২০২৬ ০২:৩১:৩২ অপরাহ্ন
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ঘরছাড়া করতে ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীরা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন ও হয়রানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এমনটাই জানিয়েছেন মানবাধিকার ও আইনি বিশেষজ্ঞরা। ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুরা এসব বিষয়ে নানা ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। 

এর মধ্যে রয়েছে—শারীরিক হামলা, জোরপূর্বক নগ্ন করা, শরীরের গহ্বরে বেদনাদায়ক তল্লাশি, এমনকি নাবালকদের সামনেও ইসরাইলিদের যৌনাঙ্গ প্রদর্শন এবং যৌন সহিংসতার হুমকি।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন বছরে ওয়েস্ট ব্যাংক প্রোটেকশন কনসোর্টিয়ামের গবেষকেরা সংঘাত সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতার ১৬টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন। তবে লজ্জা ও সামাজিক কলঙ্কের কারণে লুকিয়ে রাখায় প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর এই জোট তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, যৌন সহিংসতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে পুরো ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে, তাদের বাড়ি ও জমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করতে এবং দৈনন্দিন জীবনের ধারা বদলে দিতে। ‘সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স অ্যান্ড ফোর্সিবল ট্রান্সফার ইন দ্য ওয়েস্ট ব্যাংক’—শীর্ষক গবেষণায় ২০২৩ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের কমিউনিটি ও নিজ ঘরে ভেতরে যৌন সহিংসতা ও অপমানজনক আচরণের মাত্রা বৃদ্ধির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রস্রাব করা, বেঁধে ফেলা ও নগ্ন অবস্থায় অপমানজনক ছবি তুলে তা ছড়িয়ে দেওয়া, নারীরা টয়লেট ব্যবহার করার সময় তাদের অনুসরণ করা এবং ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। সামাজিক কলঙ্কের কারণে এসব কেস স্টাডি গোপন রাখা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যৌন সহিংসতা ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। জরিপে অংশ নেওয়া দুই-তৃতীয়াংশের বেশি পরিবার জানিয়েছে, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বৃদ্ধি, বিশেষ করে মেয়েদের লক্ষ্য করে যৌন হয়রানি, তাদের ঘর ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে প্রধান ভূমিকা রেখেছে।

প্রতিবেদন বলছে, অংশগ্রহণকারীরা যৌন হয়রানিকে সেই মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যখন দীর্ঘস্থায়ী ভয় অসহনীয় হয়ে ওঠে। তারা বলেছেন, কীভাবে নারীরা ও কিশোরীরা অপমানের শিকার হচ্ছে, আর এরপর কী হতে পারে সেই আতঙ্কে তারা দিন কাটাচ্ছেন।

অনেক ক্ষেত্রে ইসরাইলি সেনারা উপস্থিত থাকলেও তারা এসব নির্যাতন ঠেকাতে বা দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে। এক নারীর বর্ণনা অনুযায়ী, বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে তাঁর ঘরে ঢুকে দুই নারী সেনা তাঁকে উলঙ্গ করে তল্লাশির নির্দেশ দেয়। এতে তাঁকে বেদনাদায়ক ভঙ্গিতে পা খুলে দাঁড়াতে বাধ্য করা হয় এবং তাঁর শরীরের স্পর্শকাতর অংশে অশোভন আচরণ করা হয়।

পুরুষ ও কিশোররাও এই সহিংসতার শিকার হয়েছে। গত মাসে উত্তর জর্ডান উপত্যকার খিরবেত হুমসা এলাকার ২৯ বছর বয়সী কুসাই আবু আল-কেবাশকে বসতি স্থাপনকারীরা নগ্ন করে তার যৌনাঙ্গে জিপ-টাই (প্লাস্টিকের তৈরি বন্ধনী) বেঁধে পুরো এলাকাবাসীর সামনে এবং আন্তর্জাতিক কর্মীদের উপস্থিতিতে মারধর করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

এর আগে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ওয়াদি আস-সিক গ্রামের ফিলিস্তিনিদের পোশাক খুলে, হাতকড়া পরিয়ে মারধর করা হয়। তাদের ওপর প্রস্রাব করা হয়, একজনকে ঝাড়ুর হাতল দিয়ে বলাৎকারের চেষ্টা করা হয় এবং তাদের নগ্ন ছবি তুলে প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

প্রতিবেদন বলছে, এমনকি বাস্তুচ্যুতি না ঘটলেও যৌন সহিংসতা ও হয়রানি গভীর প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের ওপর। ইসরাইলিদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার জন্য অনেক মেয়ে স্কুল ছেড়ে দিয়েছে, অনেক নারী কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে অল্প বয়সে বিয়ের প্রবণতাও বেড়েছে। মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবারগুলো তাদের এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রতিবেদনে অন্তত ছয়টি পরিবারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন।

রামাল্লাভিত্তিক উইমেনস সেন্টার ফর লিগ্যাল এইড অ্যান্ড কাউন্সেলিং জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ও হয়রানি ব্যবহার করে কমিউনিটিকে ভেঙে দেওয়া ও বাস্তুচ্যুত করার কৌশল চালানো হচ্ছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, নারীরা তল্লাশির সময় যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। এ ছাড়া চেকপয়েন্টে সেনারা মেয়েদের সামনে নিজেদের যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করছে এবং তল্লাশির সময় তাদের শারীরিকভাবে নিপীড়ন করছে। ঋতুস্রাবরত মেয়েদের নিয়ে উপহাস করার ঘটনাও ঘটেছে।

সংস্থাটির অ্যাডভোকেসি ইউনিট ম্যানেজার কিফায়া খ্রাইম বলেন, ‘মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে না, অল্প বয়সে বিয়ে হচ্ছে। অভিভাবকেরা মেয়েদের রক্ষা করতে তাদের এলাকা থেকে সরিয়ে দিচ্ছেন।’ নি আরও বলেন, ‘যৌন সহিংসতার কারণে নারীরা কাজে যেতে পারছেন না, ফলে চাকরি হারাচ্ছেন এবং বাড়িতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।’ 

খ্রাইমের মতে, তাদের জানা ঘটনাগুলো মোট ঘটনার খুব সামান্য অংশ। তিনি বলেন, ‘এগুলো হয়তো ১ শতাংশও নয়। এসব তথ্য জানতে স্থানীয় কমিউনিটির আস্থা অর্জনে আমাদের অনেক সময় ও শ্রম দিতে হয়েছে।’

ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস–ইসরাইলের অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চল বিভাগের প্রধান মিলেনা আনসারি বলেন, পশ্চিম তীরে যৌন সহিংসতা ও হয়রানির বৃদ্ধি একটি বৃহত্তর দায়মুক্তির সংস্কৃতির অংশ। তিনি বলেন, এসদে তেইমান বন্দিশালায় এক বন্দিকে ধর্ষণের ভিডিও থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত সেনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। আনসারি বলেন, ‘ইসরাইলি কর্মকর্তারা কার্যত যৌন সহিংসতাকে অনুমোদন দিচ্ছেন। সবচেয়ে আলোচিত ও প্রমাণিত মামলায়ও তারা বিচার করেননি।’

তিনি আরও বলেন, ইসরাইলি পার্লামেন্ট ‘নেসেটে আলোচনা হয়েছে, ফিলিস্তিনিকে ধর্ষণ করা গ্রহণযোগ্য কিনা। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও স্পষ্টভাবে বলেননি যে, আটক ব্যক্তিদের ধর্ষণের বিরোধিতা করে ইসরাইল।’

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালানো বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। তিনি গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের ‘ইহুদি সন্ত্রাসীদের’ হাত থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন।

জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির হাতিয়ার হিসেবে যৌন সহিংসতা বিষয়ে এই প্রতিবেদনের জন্য অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকার ফিলিস্তিনি কমিউনিটির ৮৩ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছিলেন ঝুঁকিতে থাকা মানুষ, ইতোমধ্যে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি, নারী, তরুণ কর্মী এবং কমিউনিটি নেতারা। তবে গবেষণার ফলাফল পুরো পশ্চিম তীরের পরিসংখ্যানগত প্রতিনিধিত্ব করে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :