৫ বছর ধরে নেই গাইনী-শিশু চিকিৎসক

অচল রাজবাড়ীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র

আপলোড সময় : ১২-০৪-২০২৬ ০২:৫৬:৩৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১২-০৪-২০২৬ ০২:৫৬:৩৩ অপরাহ্ন
রাজবাড়ীর ২০ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র হাসপাতালটিতে গত পাঁচ বছর ধরে নেই গাইনী ও শিশু চিকিৎসক। ফলে এখানে বন্ধ রয়েছে প্রসূতি সেবা। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে স্বাভাবিক প্রসব সেবা চললেও চিকিৎসক না থাকায় ৫ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ান অপারেশন। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা প্রসূতি মায়েরা।

রাজবাড়ী শহরের প্রাণকেন্দ্র ৩নং বেড়া‌ডেঙ্গা সড়‌কে ১৯৭৫ সালে ৬২ শতাংশ জমির ওপর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত। গর্ভবতী মায়েদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, স্বাভাবিক প্রসব, সিজারিয়ান অপারেশন এবং শিশুদের চিকিৎসা সেবার জন্য এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।প্রতিষ্ঠার পর পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতাধীন ২০ শয্যার এই হাসপাতালে এক সময় প্রতিদিনই আসতেন প্রসূতি মা ও শিশু রোগীরা।কিন্তু এখন পুরো হাসপাতাল জুড়েই শুনশান নীরবতা। ফাঁকা পড়ে রয়েছে ওয়ার্ড, খালি বেড, রোগীশূন্য বহিঃর্বিভাগ- সব মিলিয়ে যেন পরিত্যক্ত এক চিকিৎসাকেন্দ্র।

আগে চিকিৎসক থাকাকালীন মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটিতে মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি সিজার ও ৫০ থেকে ৬০ টি নরমাল ডেলিভারি হতো। এখন সেখানে চিকিৎসক না থাকায় নরমাল ডেলিভারি হয় হাতে গোনা কয়েকটি। আর সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ান অপারেশন।

গর্ভবতী মা ও তাদের স্বজনরা সরকারি খরচে সেবা পেতে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে আসেন। কিন্তু বর্তমানে এখানে সব ধরনের সেবা পেলেও প্রসূতিরা সিজারিয়ান সেবা পাচ্ছেন না দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর। ফলে সিজারের প্রয়োজন হলে তাদের যেতে হচ্ছে অন্য বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতাল গুলোতে। যেখানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বাড়তি খরচ লাগছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ২০২১ সা‌লের ৮ মার্চ হাসপাতা‌লের দা‌য়ি‌ত্বে থাকা গাই‌নী চি‌কিৎসক ডা. গোপাল চন্দ্র সুত্রধর বদ‌লি হ‌য়ে অন্যত্র চ‌লে যান। তারপর পাঁচ বছর পার হ‌লেও এখানে নেই কোনো গাইনী চিকিৎসক।একইসঙ্গে নেই শিশু চিকিৎসকও। ফলে গর্ভবতী মা কিংবা শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এই হাসপাতাল পরিচালনায় আধুনিক অপারেশন থিয়েটার থাকলেও তা এখন ব্যবহার হয় না।

হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সটিও দীর্ঘদিন ধরে অচল। চালক অবসরে যাওয়ার পর আর নতুন চালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে অ্যাম্বুলেন্সটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। রোগী না থাকায় হাসপাতালের কর্মচারীদের দিন কাটে বসে বসেই। কাজ না থাকলেও নিয়মিত অফিস করলেও সেবার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের একজন মেডিকেল অফিসারকে এখানে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে তিনিও স্বীকার করছেন, গাইনী চিকিৎসক না থাকায় এখানে রোগী আসে না।

স‌রোজ‌মি‌নে হাসপাতাল‌টি‌তে গি‌য়ে দেখা যায়, দোতলা ভব‌নের বারান্দায় র‌য়ে‌ছে রোগী‌দের বসার ব্যবস্থা। তারপর অভ্যর্থনা কক্ষ। নিচ র‌য়ে‌ছে ফা‌র্মেসি। নিচ তলার বাম পা‌শে চি‌কিৎসকের কক্ষ। তি‌নিও একলা ব‌সে র‌য়ে‌ছে। কোন রোগী নেই। দোতলায় র‌য়ে‌ছে অপা‌রেশন থি‌য়েটার ও বেড। বেডগু‌লো ধু‌লো জ‌মে র‌য়ে‌ছে। দে‌খে বোঝা যায় দীর্ঘদিন রোগী ভ‌র্তি না হওয়ায় এই অবস্থা।

মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটর মারুফা আক্তারী ব‌লেন, আমরা যারা ভি‌জিটর র‌য়ে‌ছি তা‌দের ২৪ ঘন্টা রোস্টার ক‌রে ডিউ‌টি কর‌তে হয়। এখানে পাঁচ বছর ধ‌রে গাই‌নী ডাক্তার নেই। যে কারণে রোগী আ‌সে না। কারণ এখা‌নে প্রসূতি মা‌য়ের পরামর্শের জন্য খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে প্রধান প্রয়োজন গাই‌নী চি‌কিৎস‌কের। যখন গাই‌নি ডাক্তার ছিল তখন এখা‌নে রোগী অ‌নেক ভ‌র্তি থাক‌তো। চিকিৎসক ও রোগী না থাকায় আমা‌দের  ইন‌ডোর সেবা প্রদান ব‌ন্ধই প্রায়।

চি‌কিৎসা নিতে আসা সুস্মিতা সরকার ব‌লেন, আমি মা ও কাকীদের কাছ থেকে শুনেছি হাসপাতালটি একসময় অনেক জাঁকজমকপূর্ণ ছিল। কিন্তু এখন গাইনী ডাক্তার না থাকায় হাসপাতালে রোগী আসে না। আমি এখানে গাইনী ডাক্তার দেখাতে এসেছিলাম, কিন্তু এসে দেখি একজন পুরুষ লোক রোগী দেখছে। এজন্য আমি ডাক্তার দেখায়নি।

শহ‌রের বা‌সিন্দা ফারুক উ‌দ্দিন ব‌লেন, আমার প‌রিবা‌রের অ‌নে‌কের জন্ম এই মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে।পাঁচ বছর আ‌গেও এ‌টি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল ছিল। ছিল অ্যাম্বু‌লেন্স সেবা। নিম্ন আ‌য়ের মানুষ স্বল্প খরচে চি‌কিৎসা সেবা পেত এখা‌নে। কিন্তু এখন কিছুই নেই। নাম মা ও শিশু হাসাপাতাল কিন্তু তা‌দের ডাক্তার নেই। দ্রুত এখা‌নে গাইনি ও‌ শিশু ডাক্তার নি‌য়োগ দেবার দা‌বি জানাই।

রাজবাড়ী মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মূদ্রাক্ষরিক মো. আফজাল হোসেন বলেন, এই হাসপাতালে দুই জন চিকিৎসকের পদ রয়েছে। একজন এনেস্থিসিয়া ও একজন মেডিকেল অফিসার ক্লিনিক (গাইনী)। কিন্তু দুঃখের বিষয় দুইজনের একজনও এখানে নেই।পরিবার পরিকল্পনার একজন মেডিকেল অফিসার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছে। এছাড়া এখানে ৪ জন ভিজিটর রয়েছে, যারা রোস্টার করে কাজ করে।

তিনি আরও বলেন, পাঁচ বছর ধরে এখানে গাইনী চিকিৎসক নেই। আগে যেখানে প্রতিদিন ৭০/৮০ জন রোগী এখানে সেবা নিত সেখানে এখন ১০/১২ জন রোগী সেবা নিতে আসে। এছাড়াও এই হাসপাতালে দেড় বছর ধরে বিনামূল্যে ঔষধ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে রোগীর সংখ্যাও কমে গেছে। গাইনী ডাক্তার না থাকায় পাঁচ বছর ধরে সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ রয়েছে। তবে জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত গত ৯ মাসে ১১৫ টি নরমাল ডেলিভারি করা হয়েছে। এই হাসপাতালের ভবনটিও পুরাতন হওয়ায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এছাড়াও সরকার থেকে বরাদ্দ দেওয়ার পরিমাণ কমে গেছে।যার কারণে হাসপাতালটি চালাতে বেগ পেতে হচ্ছে আমাদের।

রাজবাড়ী মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে দা‌য়ি‌ত্বে থাকা মে‌ডি‌কেল অ‌ফিসার ডা. মো. আশরাফুল ইসলাম ব‌লেন, এই হাসপাতালে গাইনী ডাক্তার না থাকায় আমাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আ‌মি জেলা প‌রিবার প‌রিকল্পনা কার্যাল‌য়ের মে‌ডি‌কেল অ‌ফিসার। এখা‌নে রোগী না থাকার কারণ হল গাই‌নী চি‌কিৎসক নেই। এখা‌নে সিজা‌রিয়ান অপা‌রেশ‌নের জন্য গাই‌নী ডাক্তার দ‌রকার। গাই‌নী চি‌কিৎসক দীর্ঘদিন না থাকায় রোগী ক‌মে গে‌ছে। ও‌টি বন্ধ, ইন‌ডো‌রে রোগী ভ‌র্তি নেই। ত‌বে রোগী আস‌লে আমি পরামর্শ দি‌য়ে থা‌কি।

জেলা প‌রিবার প‌রিকল্পনা অ‌ফিসার আবু নছর মোহাম্মদ কদর উদ্দীন ব‌লেন, আ‌গে হাসপাতাল‌টি‌তে অ‌নেক জাঁকজমকপূর্ণ ছিল। ত‌বে ডাক্তার পদায়ন না থাকায় জ‌টিলতা সৃ‌ষ্টি হ‌য়ে‌ছে। হাসপাতাল‌টি‌তে জেলা কার্যাল‌য়ের মে‌ডি‌কেল অ‌ফিসার‌কে সেখা‌নে অ‌তি‌রিক্ত দা‌য়িত্ব পালন কর‌তে হ‌চ্ছে।আর অ্যাম্বু‌লে‌ন্সের চালক অবস‌রে যাবার কার‌নে অ্যাম্বু‌লে‌ন্স সেবা বন্ধ র‌য়ে‌ছে। হাসপাতালটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত করেছি।

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :