দীর্ঘ ৫৪ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে চাঁদের কক্ষপথের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল মানুষ। নাসার ঐতিহাসিক আর্টেমিস টু মিশনে চার নভোচারী এখন মহাকাশে, তারা পাড়ি দেবেন রেকর্ড পরিমাণ দূরত্ব।
তবে এই মিশনে নভোচারীরা চাঁদে নামবেন না। ১০ দিনের এই রুদ্ধশ্বাস অভিযানে ওরিয়ন মহাকাশযানের প্রতিটি সিস্টেম নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হবে, যা ভবিষ্যতে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি ও মঙ্গল অভিযানের পথ প্রশস্ত করবে।
২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে আবার মানুষের পা পড়বে কি না, এ মিশনের সাফল্যই তা নির্ধারণ করে দেবে। এর মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটে নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যাত্রা শুরু করে মহাকাশযান।
আর্টেমিস টু মিশনের চার সদস্যের দলে রয়েছেন নাসার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ ও কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন।
তারা প্রায় ১০ দিনের এই যাত্রায় চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। গত কয়েক দশকের মধ্যে এটিই হবে মানুষের দীর্ঘতম মহাকাশ যাত্রা।
নভোচারীদের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ পরিচালক চার্লি ব্ল্যাকওয়েল-টমসন বলেছেন, “এই ঐতিহাসিক মিশনে আপনারা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন আর্টেমিস দলের প্রাণশক্তি, আমেরিকান জনগণ ও বিশ্বজুড়ে আমাদের সহযোগীদের সাহসী মনোবল এবং নতুন প্রজন্মের আশা ও স্বপ্ন। শুভকামনা আর্টেমিস টু, এগিয়ে চলো।”
যাত্রা শুরুর পাঁচ মিনিটের মাথায় মহাকাশযানের কমান্ডার ওয়াইজম্যান তাদের গন্তব্য দেখতে পান। ক্যাপসুল থেকে তিনি বলেন, “অপূর্ব এক চাঁদ দেখা যাচ্ছে, আমরা ঠিক সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।”
একুশ শতকের প্রথম চন্দ্রাভিযান
এ মিশনটি অনেকগুলো ‘প্রথম’ ঘটনার সাক্ষী। এবারই প্রথম ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ বা এসএলএস রকেট ও ওরিয়ন মহাকাশযান নভোচারী নিয়ে যাত্রা করল। কারণ, ২০২২ সালে আর্টেমিস ১ মিশনে কোনো মানুষ ছাড়াই রকেটটি একবার চাঁদ প্রদক্ষিণ করেছিল।
এছাড়া আর্টেমিস টু মিশনেই প্রথম কোনো নারী, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী ও প্রথম কোনো অ-মার্কিন নাগরিক চাঁদের কক্ষপথে যাচ্ছেন। ওরিয়ন মহাকাশযানটিই প্রথম কোনো শৌচাগার বা টয়লেট নিয়ে চাঁদের চারপাশে যাচ্ছে। ফলে ‘প্রথম’-এর তালিকাটি বেশ দীর্ঘ।
রোববার ক্রিস্টিনা কোচ সাংবাদিকদের বলেছেন, “অনেকগুলো ‘প্রথম’ ঘটনা উদযাপনের বিষয় হলেও এগুলো পুরো গল্প নয় এবং এ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে উদযাপনের বিষয়ও নয়। উদযাপনের বিষয় হচ্ছে, আমরা এখন এমন এক সময়ে আছি, যেখানে স্বপ্ন দেখা প্রতিটি মানুষই তা পাওয়ার জন্য সমানভাবে কঠোর পরিশ্রম করার সুযোগ পাচ্ছেন।”
পৃথিবী থেকে আর্টেমিস টু যত দূরত্ব পাড়ি দেবে সেটিও মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক অনন্য রেকর্ড। তারা যখন চাঁদের উল্টো পিঠ বা ‘ফার সাইডে’ দিয়ে ঘুরে আসবেন তখন পৃথিবী থেকে ইতিহাসের যে কোনো মানুষের চেয়ে বেশি দূরে অবস্থান করবেন এ চার নভোচারী।
সেই সময় পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব হবে ৪ লাখ ৬ হাজার ৮৪১ কিলোমিটার, যা ১৯৭০ সালে নাসার ‘অ্যাপোলো ১৩’ নভোচারীদের গড়া রেকর্ডের চেয়ে প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কিলোমিটার বেশি।
এ রেকর্ডটি অসাধারণ হলেও নাসা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে নভোচারীরা তাদের এই যাত্রার সময়টুকু কীভাবে ব্যয় করবেন ও কী কী শিখবেন তার ওপর।
উৎক্ষেপণের আগে ফ্লাইট ডিরেক্টর এমিলি নেলসন সাংবাদিকদের বলেন, “আপনি চাইবেন প্রতিটি মিশন থেকে নতুন কিছু শিখতে ও অন্বেষণ করতে। পৃথিবী থেকে রেকর্ড দূরত্বে যাওয়াটা দারুণ পরিসংখ্যান মাত্র। তবে এ মিশনে আমরা আরও অনেক কিছু শিখতে পারব, যা আমার কাছে আরও বেশি রোমাঞ্চকর।”
মহাকাশের পথে যাত্রা
আর্টেমিস টুর এসএলএস রকেটটি নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টারের ‘৩৯বি লঞ্চ কমপ্লেক্স’ থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের সোনালী আলো যখন রকেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ওপর পড়ছিল, ঠিক তখনই তা তীরের বেগে আকাশের দিকে ছুটে যায়।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ঐতিহাসিক এই দৃশ্য দেখার জন্য ফ্লোরিডার স্পেস কোস্টে প্রায় চার লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল।
উৎক্ষেপণের প্রায় দুই মিনিট পর এসএলএস-এর দুটি শক্তিশালী সলিড রকেট বুস্টার মূল অংশ থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর রকেটের চারটি ‘আরএস-২৫’ ইঞ্জিন ওরিয়ন মহাকাশযান ও এর ক্রুদের মহাকাশের দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার কাজটি শুরু করে।
এসব ‘আরএস-২৫’ ইঞ্জিন আগে নাসার ‘স্পেস শাটল’ বহরে ব্যবহৃত হত, যা এ পর্যন্ত ১০১ জন নভোচারীকে কক্ষপথে পাঠাতে সহায়তা করেছে।
রকেট বুস্টারের কিছু অংশও আগের শাটল মিশনে ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে সেসব মিশনের মতো আর্টেমিস টু-এর উৎক্ষেপণের কোনো অংশই আর পুনরায় ব্যবহৃত হবে না।
আর্টেমিস টু-এর এসএলএস রকেটটির কক্ষপথে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় আট মিনিট। উৎক্ষেপণের পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রকেটের ওপরের অংশটি দুই দফায় ইঞ্জিন চালু করে ওরিয়নকে চাঁদের নির্দিষ্ট কক্ষপথের দিকে এগিয়ে দেবে।
আর্টেমিস টু মিশনটি ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি’ পথ অনুসরণ করছে, যা চাঁদের চারপাশ ঘুরে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবে।
বিষয়টি অনেকটা ১৯৬৮ সালের নাসার ‘অ্যাপোলো ৮’ মিশনের একুশ শতকের সংস্করণ। ওই মিশনে মানুষ প্রথমবারের মতো চাঁদের চারপাশে গিয়েছিল ও ‘স্যাটার্ন ৫’ রকেটের প্রথম মানববাহী যাত্রা শুরু হয়েছিল।
চাঁদে ফেরার মিশনে নাসার অগ্রসেনা
ওয়াইজম্যান ও তার আর্টেমিস টু দল হয়ত এক প্রজন্মের মধ্যে চাঁদে যাওয়া প্রথম নভোচারী হতে যাচ্ছেন। তবে নাসা চায় না যে, তারাই নভোচারী শেষ হোক।
উৎক্ষেপণের কেবল আট দিন আগে নাসার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর জ্যারেড আইজ্যাকম্যান চন্দ্রাভিযান পরিকল্পনায় বেশ কিছু বড় পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেন।
নতুন এ পরিকল্পনার লক্ষ্য, ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে নভোচারী পাঠানো ও ২০৩২ সালের মধ্যে সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করা।
এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য কেবল বারবার পিছিয়ে যাওয়া আর্টেমিস কর্মসূচিকে গতিশীল করা নয়, বরং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নির্বাহী আদেশের প্রতিফলন হিসেবে মহাকাশে আমেরিকার ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রমাণ করাও।
এর পেছনে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রতিযোগিতার বিষয়টিও কাজ করছে। কারণ চীন ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের নভোচারীদের চাঁদে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আইজ্যাকম্যান সরাসরি চীনের নাম না নিলেও তার কথায় এই প্রতিযোগিতার বিষয়টি স্পষ্ট।
আইজ্যাকম্যান বলেছেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আমরা আমেরিকানদের চাঁদে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। আমাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ২০৩০ সালের কথা বলেছে। আমাদের সাফল্য আর ব্যর্থতার ব্যবধান তখন বছর নয়, বরং মাস দিয়ে পরিমাপ হবে।”
নাসার পরিকল্পনা অনুসারে, ২০২৭ সালে আর্টেমিস ৩ মিশন পরিচালিত হবে। এ মিশনে পৃথিবীর কক্ষপথের মহাকাশ যাত্রায় নাসার নির্ধারিত বাণিজ্যিক বিভিন্ন ল্যান্ডারের সঙ্গে ওরিয়ন মহাকাশযানের যোগ হওয়ার বা ডকিংয়ের মহড়া চলবে।
এসব ল্যান্ডারের মধ্যে ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স তৈরি করছে ‘স্টারশিপ’ ও মার্কিন ই কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজনের মহাকাশ কোম্পানি ‘ব্লু অরিজিন’-এর তৈরি করছে ‘ব্লু মুন’ ল্যান্ডার।
২০২৮ সালে আর্টেমিস ৪ ও ৫ মিশনে চাঁদের বুকে প্রথম পা রাখবে মানুষ এবং এরপর আর্টেমিস ৬ থেকে শুরু হবে নিয়মিত চন্দ্রাভিযান।
লক্ষ্য এখন একটাই, চাঁদ
চাঁদে কোনো স্থায়ী ঘাঁটি গড়ার আগে নাসার আর্টেমিস টু’কে সফলভাবে চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে নিরাপদে ফিরে আসতে হবে। নভোচারীরা এখন মহাকাশে আছেন এবং এ ১০ দিনের মিশনটি এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
আগামী ২৪ ঘণ্টায় আর্টেমিস টু-এর নভোচারীরা তাদের ওরিয়ন মহাকাশযানের মৌলিক বিভিন্ন কাজ পরীক্ষা করে দেখবেন। যেমন, ওরিয়নের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করছে কি না? ওরিয়নের টয়লেট বা শৌচাগার, যাকে নাসা ‘ইউনিভার্সাল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ বলছে সেটি কেমন কাজ করছে? এবং মহাকাশে ওরিয়ন নিয়ন্ত্রণ করা কতটা সহজ হচ্ছে?
এ মিশনের সময় নভোচারীরা এসএলএস-এর ওপরের অংশের সঙ্গে ওরিয়নকে মিলিয়ে দেখার বা ‘রঁদেভ্যু’র মহড়া দেবেন, যা ভবিষ্যতে অন্য মহাকাশযানের সঙ্গে যোগ হওয়ার জন্য সহায়ক হবে।
পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বলেছেন, “আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে এই সিস্টেমটি আমাদের প্রত্যাশা অনুসারে মহাকাশযানটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। এমনটি নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে আরও জটিল মিশনে আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহাকাশযান যোগ করার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে পারব।”
এ মিশন কেবল ওরিয়ন ক্যাপসুলেরই প্রথম মানববাহী যাত্রা নয়, বরং এর ‘ইউরোপীয় সার্ভিস মডিউল’-এর জন্যও বিষয়টি প্রথম। এ মডিউলটিই মহাকাশযানকে শক্তি ও গতি দেয়। ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি তৈরি করেছে এ মডিউল, যা ২০২২ সালের আর্টেমিস ১ মিশনে ভালো কাজ করেছিল।
ওরিয়নের প্রাথমিক বিভিন্ন পরীক্ষা সফল হলে আরেকটি বড় মাইলফলক অর্জিত হবে, যার নাম ‘ট্রান্স-লুনার ইনজেকশন বার্ন’ বা টিএলআই। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আর্টেমিস টু-এর নভোচারীরা পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চাঁদের চূড়ান্ত পথে যাত্রা শুরু করবেন।
দীর্ঘ ৫৪ বছর পর এই প্রথম নাসা কোনো নভোচারী দলকে চাঁদে যাওয়ার সবুজ সংকেত দিতে যাচ্ছে। আর্টেমিস টু-এর নভোচারীরা বলেছেন, আরও দূরে যাওয়ার জন্য চাঁদ হবে আমাদের প্রধান সোপান।
মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ চাঁদের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, “আমাদের এ মিশন মঙ্গলে যাওয়ার একটি ধাপ, যেখানে আমাদের অতীত জীবনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।”
তিনি চাঁদকে আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কোটি কোটি সৌরজগতের রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি হিসেবে তুলনা করে বলেছেন, “চাঁদে গেলেই এসব রহস্যের জট খুলতে শুরু করবে। আর আমার কাছে এটাই চাঁদে যাওয়ার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানভিত্তিক কারণ।”
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচএইচ/এসকে
তবে এই মিশনে নভোচারীরা চাঁদে নামবেন না। ১০ দিনের এই রুদ্ধশ্বাস অভিযানে ওরিয়ন মহাকাশযানের প্রতিটি সিস্টেম নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হবে, যা ভবিষ্যতে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি ও মঙ্গল অভিযানের পথ প্রশস্ত করবে।
২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে আবার মানুষের পা পড়বে কি না, এ মিশনের সাফল্যই তা নির্ধারণ করে দেবে। এর মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটে নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যাত্রা শুরু করে মহাকাশযান।
আর্টেমিস টু মিশনের চার সদস্যের দলে রয়েছেন নাসার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ ও কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন।
তারা প্রায় ১০ দিনের এই যাত্রায় চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। গত কয়েক দশকের মধ্যে এটিই হবে মানুষের দীর্ঘতম মহাকাশ যাত্রা।
নভোচারীদের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ পরিচালক চার্লি ব্ল্যাকওয়েল-টমসন বলেছেন, “এই ঐতিহাসিক মিশনে আপনারা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন আর্টেমিস দলের প্রাণশক্তি, আমেরিকান জনগণ ও বিশ্বজুড়ে আমাদের সহযোগীদের সাহসী মনোবল এবং নতুন প্রজন্মের আশা ও স্বপ্ন। শুভকামনা আর্টেমিস টু, এগিয়ে চলো।”
যাত্রা শুরুর পাঁচ মিনিটের মাথায় মহাকাশযানের কমান্ডার ওয়াইজম্যান তাদের গন্তব্য দেখতে পান। ক্যাপসুল থেকে তিনি বলেন, “অপূর্ব এক চাঁদ দেখা যাচ্ছে, আমরা ঠিক সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।”
একুশ শতকের প্রথম চন্দ্রাভিযান
এ মিশনটি অনেকগুলো ‘প্রথম’ ঘটনার সাক্ষী। এবারই প্রথম ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ বা এসএলএস রকেট ও ওরিয়ন মহাকাশযান নভোচারী নিয়ে যাত্রা করল। কারণ, ২০২২ সালে আর্টেমিস ১ মিশনে কোনো মানুষ ছাড়াই রকেটটি একবার চাঁদ প্রদক্ষিণ করেছিল।
এছাড়া আর্টেমিস টু মিশনেই প্রথম কোনো নারী, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী ও প্রথম কোনো অ-মার্কিন নাগরিক চাঁদের কক্ষপথে যাচ্ছেন। ওরিয়ন মহাকাশযানটিই প্রথম কোনো শৌচাগার বা টয়লেট নিয়ে চাঁদের চারপাশে যাচ্ছে। ফলে ‘প্রথম’-এর তালিকাটি বেশ দীর্ঘ।
রোববার ক্রিস্টিনা কোচ সাংবাদিকদের বলেছেন, “অনেকগুলো ‘প্রথম’ ঘটনা উদযাপনের বিষয় হলেও এগুলো পুরো গল্প নয় এবং এ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে উদযাপনের বিষয়ও নয়। উদযাপনের বিষয় হচ্ছে, আমরা এখন এমন এক সময়ে আছি, যেখানে স্বপ্ন দেখা প্রতিটি মানুষই তা পাওয়ার জন্য সমানভাবে কঠোর পরিশ্রম করার সুযোগ পাচ্ছেন।”
পৃথিবী থেকে আর্টেমিস টু যত দূরত্ব পাড়ি দেবে সেটিও মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক অনন্য রেকর্ড। তারা যখন চাঁদের উল্টো পিঠ বা ‘ফার সাইডে’ দিয়ে ঘুরে আসবেন তখন পৃথিবী থেকে ইতিহাসের যে কোনো মানুষের চেয়ে বেশি দূরে অবস্থান করবেন এ চার নভোচারী।
সেই সময় পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব হবে ৪ লাখ ৬ হাজার ৮৪১ কিলোমিটার, যা ১৯৭০ সালে নাসার ‘অ্যাপোলো ১৩’ নভোচারীদের গড়া রেকর্ডের চেয়ে প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কিলোমিটার বেশি।
এ রেকর্ডটি অসাধারণ হলেও নাসা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে নভোচারীরা তাদের এই যাত্রার সময়টুকু কীভাবে ব্যয় করবেন ও কী কী শিখবেন তার ওপর।
উৎক্ষেপণের আগে ফ্লাইট ডিরেক্টর এমিলি নেলসন সাংবাদিকদের বলেন, “আপনি চাইবেন প্রতিটি মিশন থেকে নতুন কিছু শিখতে ও অন্বেষণ করতে। পৃথিবী থেকে রেকর্ড দূরত্বে যাওয়াটা দারুণ পরিসংখ্যান মাত্র। তবে এ মিশনে আমরা আরও অনেক কিছু শিখতে পারব, যা আমার কাছে আরও বেশি রোমাঞ্চকর।”
মহাকাশের পথে যাত্রা
আর্টেমিস টুর এসএলএস রকেটটি নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টারের ‘৩৯বি লঞ্চ কমপ্লেক্স’ থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের সোনালী আলো যখন রকেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ওপর পড়ছিল, ঠিক তখনই তা তীরের বেগে আকাশের দিকে ছুটে যায়।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ঐতিহাসিক এই দৃশ্য দেখার জন্য ফ্লোরিডার স্পেস কোস্টে প্রায় চার লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল।
উৎক্ষেপণের প্রায় দুই মিনিট পর এসএলএস-এর দুটি শক্তিশালী সলিড রকেট বুস্টার মূল অংশ থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর রকেটের চারটি ‘আরএস-২৫’ ইঞ্জিন ওরিয়ন মহাকাশযান ও এর ক্রুদের মহাকাশের দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার কাজটি শুরু করে।
এসব ‘আরএস-২৫’ ইঞ্জিন আগে নাসার ‘স্পেস শাটল’ বহরে ব্যবহৃত হত, যা এ পর্যন্ত ১০১ জন নভোচারীকে কক্ষপথে পাঠাতে সহায়তা করেছে।
রকেট বুস্টারের কিছু অংশও আগের শাটল মিশনে ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে সেসব মিশনের মতো আর্টেমিস টু-এর উৎক্ষেপণের কোনো অংশই আর পুনরায় ব্যবহৃত হবে না।
আর্টেমিস টু-এর এসএলএস রকেটটির কক্ষপথে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় আট মিনিট। উৎক্ষেপণের পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রকেটের ওপরের অংশটি দুই দফায় ইঞ্জিন চালু করে ওরিয়নকে চাঁদের নির্দিষ্ট কক্ষপথের দিকে এগিয়ে দেবে।
আর্টেমিস টু মিশনটি ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি’ পথ অনুসরণ করছে, যা চাঁদের চারপাশ ঘুরে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবে।
বিষয়টি অনেকটা ১৯৬৮ সালের নাসার ‘অ্যাপোলো ৮’ মিশনের একুশ শতকের সংস্করণ। ওই মিশনে মানুষ প্রথমবারের মতো চাঁদের চারপাশে গিয়েছিল ও ‘স্যাটার্ন ৫’ রকেটের প্রথম মানববাহী যাত্রা শুরু হয়েছিল।
চাঁদে ফেরার মিশনে নাসার অগ্রসেনা
ওয়াইজম্যান ও তার আর্টেমিস টু দল হয়ত এক প্রজন্মের মধ্যে চাঁদে যাওয়া প্রথম নভোচারী হতে যাচ্ছেন। তবে নাসা চায় না যে, তারাই নভোচারী শেষ হোক।
উৎক্ষেপণের কেবল আট দিন আগে নাসার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর জ্যারেড আইজ্যাকম্যান চন্দ্রাভিযান পরিকল্পনায় বেশ কিছু বড় পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেন।
নতুন এ পরিকল্পনার লক্ষ্য, ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে নভোচারী পাঠানো ও ২০৩২ সালের মধ্যে সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করা।
এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য কেবল বারবার পিছিয়ে যাওয়া আর্টেমিস কর্মসূচিকে গতিশীল করা নয়, বরং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নির্বাহী আদেশের প্রতিফলন হিসেবে মহাকাশে আমেরিকার ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রমাণ করাও।
এর পেছনে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রতিযোগিতার বিষয়টিও কাজ করছে। কারণ চীন ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের নভোচারীদের চাঁদে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আইজ্যাকম্যান সরাসরি চীনের নাম না নিলেও তার কথায় এই প্রতিযোগিতার বিষয়টি স্পষ্ট।
আইজ্যাকম্যান বলেছেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আমরা আমেরিকানদের চাঁদে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। আমাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ২০৩০ সালের কথা বলেছে। আমাদের সাফল্য আর ব্যর্থতার ব্যবধান তখন বছর নয়, বরং মাস দিয়ে পরিমাপ হবে।”
নাসার পরিকল্পনা অনুসারে, ২০২৭ সালে আর্টেমিস ৩ মিশন পরিচালিত হবে। এ মিশনে পৃথিবীর কক্ষপথের মহাকাশ যাত্রায় নাসার নির্ধারিত বাণিজ্যিক বিভিন্ন ল্যান্ডারের সঙ্গে ওরিয়ন মহাকাশযানের যোগ হওয়ার বা ডকিংয়ের মহড়া চলবে।
এসব ল্যান্ডারের মধ্যে ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স তৈরি করছে ‘স্টারশিপ’ ও মার্কিন ই কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজনের মহাকাশ কোম্পানি ‘ব্লু অরিজিন’-এর তৈরি করছে ‘ব্লু মুন’ ল্যান্ডার।
২০২৮ সালে আর্টেমিস ৪ ও ৫ মিশনে চাঁদের বুকে প্রথম পা রাখবে মানুষ এবং এরপর আর্টেমিস ৬ থেকে শুরু হবে নিয়মিত চন্দ্রাভিযান।
লক্ষ্য এখন একটাই, চাঁদ
চাঁদে কোনো স্থায়ী ঘাঁটি গড়ার আগে নাসার আর্টেমিস টু’কে সফলভাবে চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে নিরাপদে ফিরে আসতে হবে। নভোচারীরা এখন মহাকাশে আছেন এবং এ ১০ দিনের মিশনটি এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
আগামী ২৪ ঘণ্টায় আর্টেমিস টু-এর নভোচারীরা তাদের ওরিয়ন মহাকাশযানের মৌলিক বিভিন্ন কাজ পরীক্ষা করে দেখবেন। যেমন, ওরিয়নের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করছে কি না? ওরিয়নের টয়লেট বা শৌচাগার, যাকে নাসা ‘ইউনিভার্সাল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ বলছে সেটি কেমন কাজ করছে? এবং মহাকাশে ওরিয়ন নিয়ন্ত্রণ করা কতটা সহজ হচ্ছে?
এ মিশনের সময় নভোচারীরা এসএলএস-এর ওপরের অংশের সঙ্গে ওরিয়নকে মিলিয়ে দেখার বা ‘রঁদেভ্যু’র মহড়া দেবেন, যা ভবিষ্যতে অন্য মহাকাশযানের সঙ্গে যোগ হওয়ার জন্য সহায়ক হবে।
পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বলেছেন, “আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে এই সিস্টেমটি আমাদের প্রত্যাশা অনুসারে মহাকাশযানটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। এমনটি নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে আরও জটিল মিশনে আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহাকাশযান যোগ করার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে পারব।”
এ মিশন কেবল ওরিয়ন ক্যাপসুলেরই প্রথম মানববাহী যাত্রা নয়, বরং এর ‘ইউরোপীয় সার্ভিস মডিউল’-এর জন্যও বিষয়টি প্রথম। এ মডিউলটিই মহাকাশযানকে শক্তি ও গতি দেয়। ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি তৈরি করেছে এ মডিউল, যা ২০২২ সালের আর্টেমিস ১ মিশনে ভালো কাজ করেছিল।
ওরিয়নের প্রাথমিক বিভিন্ন পরীক্ষা সফল হলে আরেকটি বড় মাইলফলক অর্জিত হবে, যার নাম ‘ট্রান্স-লুনার ইনজেকশন বার্ন’ বা টিএলআই। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আর্টেমিস টু-এর নভোচারীরা পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চাঁদের চূড়ান্ত পথে যাত্রা শুরু করবেন।
দীর্ঘ ৫৪ বছর পর এই প্রথম নাসা কোনো নভোচারী দলকে চাঁদে যাওয়ার সবুজ সংকেত দিতে যাচ্ছে। আর্টেমিস টু-এর নভোচারীরা বলেছেন, আরও দূরে যাওয়ার জন্য চাঁদ হবে আমাদের প্রধান সোপান।
মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ চাঁদের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, “আমাদের এ মিশন মঙ্গলে যাওয়ার একটি ধাপ, যেখানে আমাদের অতীত জীবনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।”
তিনি চাঁদকে আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কোটি কোটি সৌরজগতের রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি হিসেবে তুলনা করে বলেছেন, “চাঁদে গেলেই এসব রহস্যের জট খুলতে শুরু করবে। আর আমার কাছে এটাই চাঁদে যাওয়ার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানভিত্তিক কারণ।”
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচএইচ/এসকে