ঘাট আছে, নেই লঞ্চ ভেড়ার জায়গা

দুর্ভোগে রাঙ্গাবালীর যাত্রীরা

আপলোড সময় : ২৯-০৩-২০২৬ ০৩:২৮:৩০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৯-০৩-২০২৬ ০৩:২৮:৩০ অপরাহ্ন
পটুয়াখালীর দক্ষিণে রাঙ্গাবালী উপজেলার শেষ প্রান্তে গিয়ে মনে হয়, দেশ যেন ধীরে ধীরে জল আর কাদার ভেতর মিলিয়ে যাচ্ছে। লঞ্চঘাটে স্থায়ী জেটি বা প্রয়োজনীয় পাকা স্থাপনা না থাকায় দুর্ভোগের শেষ নেই যাত্রীদের। উপজেলার বড় বাইশদিয়া ইউনিয়নের গাইয়াপাড়া লঞ্চঘাট, ছোট বাইশদিয়া ইউনিয়নের চর নজির ঘাট ও চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চরআন্ডা লঞ্চ ঘাটের অবস্থা প্রায় একই। যাত্রীদের নৌযানে উঠতে হয় কাদা-পানি পেরিয়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাঙ্গাবালী উপ‌জেলার নৌপথর যাত্রীদের মূল সমস্যা দুটি। একটি হলো ঘাটে জেটি নাই। অন্যটি হলো জেটি থাকলেও নদীদে চর জেগে ওঠার কারণে যাত্রীদের কাদা-পানি পার হয়ে খানিকটা দূরে গিয়ে নৌযানে উঠতে হয়। তবে বেশিরভাগ ঘাটে দুই সমস্যাই প্রকট। নিয়মিত নদীপথে চলাচল করেন এমন কয়েকজন যাত্রী জানান,  এ এলাকার মানুষের চলাচল সড়কের চেয়ে নদীপথে বেশি। আর লঞ্চঘাটে জেটি থাকলেও তা স্থির কোনো কাঠামো নয়। বরং এক চলমান অনিশ্চয়তা। জোয়া‌রে দেখা মে‌লে, আবার ভাটার টা‌নে তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে তাদের মধ্যে সবসময় কাজ করে এক ধরনের অনিশ্চয়তা।

চর নজির লঞ্চঘাটে দাঁড়ালে সেই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয় আরো তীব্রভাবে। বেলা বাড়লে দূরে নদীর বুক চিরে ভেসে ওঠে লঞ্চ। যাত্রীরা তখন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ টেকে না। কারণ ঘাটে লঞ্চ ভেড়ে না। লঞ্চ তখন থামে অনেকটা দূরের চরে। তারপর শুরু হয় আসল লড়াই। সম্প্রতি এই রু‌টে চলাচলকার‌ী রূপসী তুষার ল‌ঞ্চে উঠ‌তে গি‌য়ে সেই প‌রি‌স্থি‌তির শিকার হ‌য়ে‌ছেন যাত্রীরা। কেউ জুতা হাতে তুলে নেন, কেউ শাড়ির খুঁট গুটিয়ে নেন হাঁটুর ওপর। শিশুকে কোলে নিয়ে, ব্যাগ মাথায় তুলে নামেন কাদামাটির ভেতর। এক‌টি ভি‌ডিও‌তে সেই দৃশ‌্য ফু‌টে উঠে‌ছে।

পা যত এগোয়, কাদা তত গাঢ় হয়। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও আবার পা আটকে যায় এমনভাবে, যেন মাটি নিজেই ধরে রাখতে চাইছে। এই কাদা পেরিয়ে, কখনো কোমরসমান পানির ভেতর দিয়ে, যাত্রীদের পৌঁছাতে হয় লঞ্চে। দূর থেকে দৃশ্যটা যেন এক অদ্ভুত মিছিল ম‌নে হ‌বে। সেখা‌নে মানুষের সারি, কাদা আর পানির ভেতর ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি কোনো দৃশ্য নয়, প্রতিদিনের দুর্ভোগ। চরমোন্তাজ-গলাচিপা-রাঙ্গাবালী-কলাপাড়া নৌরুটে দুটি লঞ্চ, অন্তত আটটি বড় ট্রলার নিয়ম করে যাত্রী আনা-নেওয়া করে। কিন্তু ঘাটে নেই লঞ্চ ভেড়ানোর স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা। নদীর স্রোত আর কাদামাটির সঙ্গে লড়েই যাত্রীদের ওঠানামা করতে হয়। স্থানীয়রা বলছেন, নদীর চর জেগে ওঠায় লঞ্চ আর ঘাটে ভিড়তে পারে না। বছরের পর বছর ধরে একই চিত্র। বর্ষায় পানি বাড়লে কষ্ট কিছুটা কমে, কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে দুর্ভোগ চরমে ওঠে।

রূপসী তুষার ল‌ঞ্চের একা‌ধিক নারী যাত্রী বলছিলেন, আমাদের জন্য ঘাট মানে কাদা। এই কাদা পেরিয়েই চলাচল করতে হয়। নারী ও শিশুদের জন্য এই পথ আরো কঠিন। অনেকে পিছলে পড়ে যান, কাপড় কাদা হয়ে যায়, কখনও আঘাতও পান। তবু বিকল্প নেই। এই পথই তাদের একমাত্র যোগাযোগের ভরসা। স্থানীয়দের দাবি, একটি স্থায়ী জেটি বা ঘাট নির্মাণ করলে এই ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে। কিন্তু সেই দাবি এখনো কাগজেই আটকে। চরমোন্তাজ শিশু বাগান বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আইয়ুব খান বললেন, লঞ্চ আসে, কিন্তু ঘাটে ভেড়ার জায়গা নেই। ফলে প্রতিদিনই যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তি‌নি ব‌লেন, যাত্রী‌দের কেউ জুতা হাতে নিয়ে নামেন, কেউ কাপড় গুটিয়ে হাঁটেন পানির ভেতর দিয়ে। বৃদ্ধ, নারী, শিশু কারও জন্যই নেই আলাদা নিরাপত্তা। আইয়ুব খানের ভাষ‌্যম‌তে, নদীভাঙন, অবকাঠামোর অভাব আর দীর্ঘদিনের অবহেলায় এই ঘাটগুলো এখন কেবল নামেই ‘লঞ্চঘাট’। বাস্তবে সেগুলো ভরসাহীন এক যাত্রার শুরু।

নদী এখানে শুধু পথ নয়, নিয়তিও বটে। আর সেই নিয়তির সঙ্গেই প্রতিদিন লড়াই করে চর নজিরের মানুষ। কাদা মাড়িয়ে, পানি ভেঙে, একটুখানি চলাচলের আশায়। পটুয়াখালী নদী বন্দরের সহকারী পরিচালক জাকি সারোয়ার বলেন, রাঙ্গাবালী উপজেলা নদীবেষ্টিত হওয়ায় সেখানকার মানুষ নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। তাই এলাকায় একাধিক লঞ্চঘাট স্থাপন জরুরি। তবে এখন পর্যন্ত স্থানীয় সরকার বা ব্যক্তি পর্যায় থেকে এ বিষয়ে কোনো আবেদন পাওয়া যায়নি। আবেদন পেলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে।

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি /এনআইএন
 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :