ট্রেন-বাস সংঘর্ষ: নিভে গেল ১২ প্রাণ

আপলোড সময় : ২২-০৩-২০২৬ ০৪:০৮:১০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২২-০৩-২০২৬ ০৬:৫৩:৩৫ অপরাহ্ন
“আমি কি নিয়ে বাঁচবো আমি জানি না। ঈদের খুশিতে তারা তো নানা বাড়ি যাচ্ছিল, তাদের সাথে আর কোনোদিন দেখা হবে না। “এটা আমি মানতে পারছি না।”

কথাগুলো বলছিলেন যশোর জেলার গাড়ি চালক পিন্টু ইসলাম। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে পিন্টুর স্ত্রী লাইজু আক্তার (২৬) এবং দুই মেয়ে খাদিজা (৬) ও মরিয়ম (৩) নিহত হন।

শনিবার (২১ মার্চ) ভোররাতের এ দুর্ঘটনায় মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহতদের লাশ রাখা হয়েছে। রোববার (২২ মার্চ) দুপুরে স্বজনরা হিমঘরের সামনে কাগজপত্র নিয়ে লাশ বুঝে নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

পিন্টুর মত এ দুর্ঘটনায় কেউ হারিয়েছেন পুরো পরিবার। কেউ হারিয়েছেন বাবা-মাকে; নবববধু হারিয়েছেন স্বামী। হিমঘরের সামনে স্বজনদের কান্নার আওয়াজ ভারি করে তুলছে চারপাশ। ঈদের আনন্দ এক নিমিষেই পরিণত হয়েছে শোকে।

শনিবার রাত ৩টার আগে আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ারবাজার লেভেল ক্রসিংয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘ঢাকা মেইল’ ট্রেনটি ক্রসিং পার হওয়ার সময় চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাস রেললাইনে উঠে পড়লে সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই অন্তত ১২ জন নিহত হন এবং আহত হন আরও আটজন। সংঘর্ষের পর দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বাসটিকে ছেঁচড়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায় ট্রেন।

এ দুর্ঘটনায় নিহত বাকিরা হলেন- চাঁদপুর জেলার চাপাতলি এলাকার মমিনুল হকের ছেলে তাজুল ইসলাম (৬৭), ঝিনাইদহের মোক্তার বিশ্বাসের ছেলে জুহাদ বিশ্বাস (২৪), যশোরের চৌগাছার সিরাজুল ইসলাম (৭০) ও তার স্ত্রী কোহিনূর বেগম (৫৫), নোয়াখালী সোনাইমুড়ি বাবুল চৌধুরী (৫৫), মাগুরার মোহাম্মদপুর এলাকার ওহাব শেখের ছেলে ফচিয়ার রহমান (২৬), চুয়াডাঙ্গার জীবন নগরের বিল্লাল হোসেনের ছেলে সোহেল রানা (২৫), নোয়াখালীর ফাজিলপুরের মো. সেলিমের ছেলে নজরুল ইসলাম রায়হান (৪৫) ও লক্ষ্মীপুর সদরের সিরাজুল ইসলামের মেয়ে সাঈদা (৯)। নিহত জুহাদ বিশ্বাসের স্ত্রী রুমি আক্তার হিমঘরের সামনে অঝোরে কান্না করছিলেন। স্বামী হারানো এ নারীর আর্তনাদ সেখানে উপস্থিতদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

দেড় বছরের মেয়ে মরিয়মকে কোলে নিয়ে কান্নাজড়িত কন্ঠে রুমি বলেন, “ঈদের আগে মেয়েকে দেখতে আসতে পারেনি, ঝিনাইদহ থেকে নোয়াখালী যাচ্ছিলো ঈদের দিন রাতে মেয়েকে দেখতে। সে আর তার মেয়ের মুখ দেখলো না। আমার আর মেয়ের কেউ রইল না।”

সাহিদা সুলতানা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে কুমিল্লা মেডিকেলের হিমঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বোনের মেয়ে সাঈদার লাশ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। দুর্ঘটনায় তার বোন ও বোনের স্বামী গুরুতর আহত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাহিদা বলছিলেন, “সাঈদা মারা গেছে। তার বাবা-মাও বাঁচবে কি-না জানি না।”

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. রেজা হাসান বলেন, “দুর্ঘটনায় আহতদের দেখভাল করতে এবং নিহতদের লাশ বুঝিয়ে দিতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। “এছাড়া নিহতদের পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার টাকা করে সহযোগিতা করা হচ্ছে, লাশগুলো বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য।”

এদিকে এই দুর্ঘটনার কারণ সন্ধানে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দুটি এবং কুমিল্লা জেলা প্রশাসন একটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। রোববার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী আমিনুর রশিদ এবং রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবীব।

রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, “যে দুজন গেটম্যানের অবহেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়া কুমিল্লার রেলস্টেশন মাস্টারের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

বাংলা স্কুপ /প্রতিনিধি/এইচবি/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :