ঈদকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন নৌরুটে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। অকটেন ও ডিজেল স্বল্পতায় অনেক এলাকায় যাত্রীবাহী স্পিডবোট চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, শত শত মাছ ধরার ট্রলার ঘাটে আটকা পড়ে আছে এবং লঞ্চ চলাচল নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এতে ঈদে ঘরমুখো মানুষ, জেলে ও নৌপথনির্ভর এলাকার বাসিন্দারা চরম উদ্বেগ ও দুর্ভোগে পড়েছেন। রাঙামাটি, পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও চট্টগ্রামের মিরসরাইসহ বিভিন্ন উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলে নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ঈদযাত্রা আরও ভোগান্তিময় হয়ে উঠতে পারে। সোমবার (১৬ মার্চ ) বাংলাস্কুপের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত-
রাঙামাটি প্রতিনিধি জানান- ‘জ্বালানি তেল সংকটে’ রাঙ্গামাটিতে যাত্রীবাহী স্পিডবোট চলাচল বন্ধ রয়েছে। আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচলেও। সরেজমিনে গতকাল রোববার সকাল স্পিডবোট ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, জ্বালানি তেল (অকটেন) না পাওয়ায় স্পিডবোট সার্ভিস বন্ধ রয়েছে। এতে দুর্ভেগে পড়েছেন বিভিন্ন উপজেলাগামী মানুষ। এ বিষয়ে লাইন ম্যান মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘রাঙ্গামাটির বিভিন্ন উপজেলার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫টি যাত্রীবাহী স্পিডবোট চলাচল করে। এই কযেকদিন কোনোভাবে বোট সেবা সচল রাখলেও জ্বালানি তেলের সংকটে আজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তেল পেলে আবার চালু করা হবে।
অন্যদিকে ডিজেল স্বল্পতার কারণে জেলার বিভিন্ন নৌরুটে লঞ্চ চলাচল নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে মালিক সমিতি। এ বিষয়ে লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মো. মঈনুদ্দিন সেলিম বলেন, ‘আজ লঞ্চ চলাচলের জন্য তেল মজুদ আছে, পরে যদি ডিজেল পাওয়া না যায় তবে হয়তো লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আমাদের প্রতিদিন ১২০০ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। এই সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমারা জেলা প্রশাসনের কাছে একটি দরখাস্ত করেছি। জেলা প্রশাসক আমাদের আশ্বস্ত করেছে। যদি সরবরাহ স্বাভাবিক না হয় তাহলে বিপাকে পড়বেন ঈদে ঘরমুখো মানুষ।’ রাঙ্গামাটি জেলা প্রশসাক নাজমা আশরাফী বলেন, ‘জ্বালানি তেল সংকট নিরসনে কাজ করছে প্রশাসন। খুচরা দোকানগুলোতে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে ভোক্তা পর্যায়ে মজুদ করার অভিযোগ শুনেছি। এটি নিরসনে মোবাইল কোট কাজ করছে।’ এ দিকে সরকার ডিপু থেকে রেশনিং উঠিয়ে দিলেও রাঙ্গামাটিতে তার প্রভাব এখনো দেখা যায়নি। রাঙ্গামাটির ছয় উপজেলায় যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। অপর দিকে শহরের ফিলিং স্টেশন ও পাম্পে নেই জ্বালানি তেল। উপজেলাগুলোতে তেলের সংকট থাকায় কৃষি জমিতে সেচের কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি জানান- পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আলীপুর-মহিপুর দেশের অন্যতম বৃহৎ বিএফডিসি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। প্রতিদিন অসংখ্য জেলে এই বন্দরে মাছ বিক্রি করে ট্রলারে রসদ ও জ্বালানি নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। তবে গত তিন-চার দিন ধরে এলাকায় তীব্র ডিজেল সংকট দেখা দেওয়ায় শত শত মাছ ধরার ট্রলার সমুদ্রে যেতে পারছে না। এতে ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে বিপাকে পড়েছেন জেলে ও ট্রলার মালিকরা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডিজেল না পাওয়ায় মাছ বিক্রি করে ফিরে আসা ট্রলারগুলো বিভিন্ন খাল ও ঘাটে নোঙর করে রাখা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন জেলেরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, অন্যদিকে ট্রলার মালিকদেরও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মহিপুরের ইভা খানম ট্রলারের মালিক ইব্রাহিম কোম্পানি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরে দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু খুচরা ব্যবসায়ী বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে তেল মজুত করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, গত তিন-চার দিন ধরে কোনো মহাজনের কাছেই ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে মাছ বিক্রি করে ট্রলারগুলো ঘাটে বেঁধে রাখতে হচ্ছে। আমার দুটি ট্রলারে প্রায় ৩০ জন স্টাফ রয়েছে। তাদের খাবার বাবদ প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল নিয়ে আমরা অনিশ্চয়তায় রয়েছি।
জননী কোম্পানির পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমাদের সাতটি ট্রলারের মধ্যে এরই মধ্যে চারটি বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি তিনটি সমুদ্রে রয়েছে। সেগুলো ফিরে এসে তেল না পেলে আর সমুদ্রে যেতে পারবে না। ঈদের আগে মাছ ধরে ভালো আয়ের আশা ছিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেই আশা আর পূরণ হবে না। আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ভাই ভাই আড়তের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, আমরা মৎস্য ব্যবসায়ী হিসেবে আজ অসহায় অবস্থায় আছি। অনেক ডিজেল ব্যবসায়ীর কাছে তেল মজুত থাকলেও তারা আমাদের কাছে বিক্রি করছে না। এতে আমরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছি। এ বিষয়ে প্রশাসনের সঠিক তদারকি প্রয়োজন। মহিপুর আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুমন দাস জানান, এলাকার পাম্প বা দোকানগুলোতে গেলে বলা হচ্ছে ট্রলারে তেল দেওয়া নিষেধ। আবার কোথাও কোথাও বেশি দাম দিলে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে সমুদ্রগামী ট্রলারগুলো জ্বালানি সংকটে পড়ে ঘাটে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, আলীপুর-মহিপুর এলাকায় স্থানীয় মালিকানাধীন ট্রলারের সংখ্যা ১৫০টির বেশি।
এছাড়া চট্টগ্রাম, বাঁশখালী, ভোলা, বরগুনা ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার আরও প্রায় শতাধিক ট্রলার এই বন্দর থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে এবং মাছ বিক্রি করে। একটি ট্রলার সমুদ্রে যাওয়ার সময় ইঞ্জিনের আকার অনুযায়ী সাধারণত এক হাজার থেকে দুই হাজার লিটার পর্যন্ত ডিজেল নিয়ে থাকে। এ বিষয়ে মহিপুরের রাজা ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী মো. আসিফ মাহমুদ বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে ডিপো থেকে কোটাভিত্তিক তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে পরিবহন ছাড়া অন্য খাতে তেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, আলীপুর-মহিপুর এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সব মিলিয়ে দৈনিক মাত্র পাঁচ হাজার লিটার ডিজেল সরবরাহ হচ্ছে। এ কারণে চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া যাচ্ছে না। তবে কিছু গ্রামীণ দোকান লাইসেন্স ছাড়াই ডিজেল বা পেট্রল মজুত করে থাকতে পারে বলেও তিনি ধারণা প্রকাশ করেন। এদিকে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কাউছার হামিদ বলেন, এরই মধ্যে আলীপুর-মহিপুরের বিষয়টি নিয়ে জেলায় মিটিং হয়েছে। অতিদ্রুত এই সংকট কেটে যাচ্ছে। কেউ যদি অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, তাহলে তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান- চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জ্বালানি সংকটে ৯দিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে কুমিরা-সন্দ্বীপ নৌরুটের অন্যতম দ্রুতগামী যান স্পিডবোট। এতে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন সন্দ্বীপ যাতায়াতগামী অসংখ্য যাত্রী। এদিকে অতি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান না হলে আসন্ন ঈদ যাত্রায় চরম বিড়ম্বনার শিকার হতে হবে বলে মনে করছেন এ রুটের যাত্রীরা। জানা গেছে, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা-সন্দ্বীপ গুপ্তছড়া নৌরুটে প্রতিদিনই হাজার হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। এ রুটে বাঁশবাড়িয়া-গুপ্তছড়ায় একটি ফেরি চলাচল করে। এছাড়া কুমিরা-গুপ্তছড়ায় রয়েছে তিনটি কোম্পানির ৩৩টি স্পিডবোট এবং কিছু ইঞ্জিন নৌকা। কিন্তু ফেরির সংখ্যা কম। এ অবস্থায় দ্রুততম সময়ে ১৮ কিলোমিটার নৌপথ পেরিয়ে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে যেতে অধিকাংশ যাত্রীই স্পিডবোট বেছে নেন। এবার ঈদের ঠিক আগেই তীব্র অকটেন সংকটে গত ৯দিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে স্পিডবোট সার্ভিসটি। ফলে যাত্রীরা দুর্ভোগ পোহাতে শুরু করেছেন। যা আগামী দিনে আরও ভয়াবহ দুর্ভোগ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন সন্দ্বীপবাসী। সরেজমিনে শনিবার বিকেলে কুমিরা-সন্দ্বীপ ঘাটে ঘুরে দেখা গেছে, জ্বালানি সংকটে বন্ধ রয়েছে স্পিডবোট। এতে অনেক যাত্রীই স্পিডবোট না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন। এ সময় স্পিডবোটগুলোকে সাগর উপকূলীয় শুকনো ভূমিতে তোলা অবস্থায় দেখা যায়।
সন্দ্বীপের হারামিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, সন্দ্বীপের মানুষের একমাত্র পথই নৌরুট। এ রুটে পরিবহন ব্যবস্থা কখনোই স্থায়ী স্বস্তি ফেরেনি। এই দুর্ভোগ লাঘবে কয়েক বছর পরপর সরকার থেকে আশার বাণী শোনানো হয়। এরপর কোনো একটি সার্ভিস চালু করে। কিন্তু ততটা আয়োজন বা ঢাকঢোল পিটিয়ে সার্ভিস চালু করা হয় তত দ্রুতই সেই সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। যা আমাদের হতাশ করে। তিনি বলেন, এর আগে এরকমভাবেই সন্দ্বীপের জন্য সী-ট্রাক, ফেরি চলাচল চালু করে দ্বীপবাসীকে আনন্দের সাগরে ভাসানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা হয় হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে সী-ট্রাক। বর্ষাসহ নানান অসুবিধায় থেমে থেমে বন্ধ হয়ে যায় ফেরি। এসবের মাঝে খরচ বেশি গেলেও একমাত্র ভালো সার্ভিস ছিল স্পিডবোট। বর্তমানে অকটেন সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলোও। তাও এক বা দু’দিন নয়। ৯দিন ধরে স্পিডবোট বন্ধ হয়ে আছে। কিন্তু আমার মতো অসংখ্য যাত্রী স্পিট বোটের জন্য এসে হতাশ হয়ে ঘুরতে থাকেন। কোনো উপায় না থাকলে কাঠের তৈরি ইঞ্জিন নৌকায় যেতে বাধ্য হন। এতে অনেক সময় ব্যয় হয়ে যায়। ইঞ্জিন নৌকা দিয়ে ঈদ যাত্রা কিছুতেই নির্বিঘ্ন করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন সন্দ্বীপের অপর এক যাত্রী কালাপানিয়ার বাসিন্দা মো. নজরুল ইসলাম। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিহাব উদ্দিন তিনি বলেন, ঈদের ছুটির চাপ এড়াতে আমি ঢাকা থেকে একটু আগেই বাড়ি চলে যাচ্ছিলাম। বিকেলে ঘাটে এসে স্পিডবোটের টিকিট কাটতে গেলে কাউন্টার থেকে বলা হয়, অকটেন নেই সার্ভিস বন্ধ। তাও নাকি গত ৮ থেকে ৯দিন ধরে এ অবস্থা। এদিকে যাত্রীদের অন্তহীন অভিযোগ বিষয়ে স্পিডবোটের কাউন্টারে কথা বলতে চাইলেও তারা কোন কথা বলতে রাজি হননি।
স্পিডবোট চালক বিশু দাস, বাবুল দাস ও তাদের হেলপার মো. আমিন জানান, এ সময়ে স্পিডবোট না চললে চরম দুর্ভোগ হবে। তারা প্রতিদিন ঘাটে আসেন বোট চালানোর জন্য। কিন্তু মালিক তাদের অকটেন দিতে পারছেন না। তাই বেকার হয়ে থাকছেন তারা। এ রুটে চলাচলকারী আর.কে এন্টারপ্রাইজ নামক স্পিড বোট কোম্পানির মালিক জগলুল হোসেন নয়ন বলেন, আমরা দুটি কোম্পানির ২৫টি স্পিডবোট আছে। অকটেন সংকটের কারণে গত ৯দিন এগুলো বন্ধ আছে। অনেক যাত্রী এসে ফিরে যাচ্ছেন। যাদের জরুরী কাজ আছে তারা কাঠের ট্রলারে করে যাচ্ছেন। অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না, কাঠের ট্রলারে ডিজেলও অত্যন্ত কম দেওয়া হচ্ছে। তাদের ৮০ হাজার লিটার অকটেন দরকার। তারা অকটেনের জন্য বিভিন্ন তেল কোম্পানিকে জানানো হচ্ছে। সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ঈদে যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘব করতে এবং স্পিডবোট চালু করতে তেল কোম্পানিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। আশা করছি ঈদ যাত্রা শুরুর আগেই একটা সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
রাঙামাটি প্রতিনিধি জানান- ‘জ্বালানি তেল সংকটে’ রাঙ্গামাটিতে যাত্রীবাহী স্পিডবোট চলাচল বন্ধ রয়েছে। আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচলেও। সরেজমিনে গতকাল রোববার সকাল স্পিডবোট ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, জ্বালানি তেল (অকটেন) না পাওয়ায় স্পিডবোট সার্ভিস বন্ধ রয়েছে। এতে দুর্ভেগে পড়েছেন বিভিন্ন উপজেলাগামী মানুষ। এ বিষয়ে লাইন ম্যান মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘রাঙ্গামাটির বিভিন্ন উপজেলার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫টি যাত্রীবাহী স্পিডবোট চলাচল করে। এই কযেকদিন কোনোভাবে বোট সেবা সচল রাখলেও জ্বালানি তেলের সংকটে আজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তেল পেলে আবার চালু করা হবে।
অন্যদিকে ডিজেল স্বল্পতার কারণে জেলার বিভিন্ন নৌরুটে লঞ্চ চলাচল নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে মালিক সমিতি। এ বিষয়ে লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মো. মঈনুদ্দিন সেলিম বলেন, ‘আজ লঞ্চ চলাচলের জন্য তেল মজুদ আছে, পরে যদি ডিজেল পাওয়া না যায় তবে হয়তো লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আমাদের প্রতিদিন ১২০০ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। এই সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমারা জেলা প্রশাসনের কাছে একটি দরখাস্ত করেছি। জেলা প্রশাসক আমাদের আশ্বস্ত করেছে। যদি সরবরাহ স্বাভাবিক না হয় তাহলে বিপাকে পড়বেন ঈদে ঘরমুখো মানুষ।’ রাঙ্গামাটি জেলা প্রশসাক নাজমা আশরাফী বলেন, ‘জ্বালানি তেল সংকট নিরসনে কাজ করছে প্রশাসন। খুচরা দোকানগুলোতে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে ভোক্তা পর্যায়ে মজুদ করার অভিযোগ শুনেছি। এটি নিরসনে মোবাইল কোট কাজ করছে।’ এ দিকে সরকার ডিপু থেকে রেশনিং উঠিয়ে দিলেও রাঙ্গামাটিতে তার প্রভাব এখনো দেখা যায়নি। রাঙ্গামাটির ছয় উপজেলায় যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। অপর দিকে শহরের ফিলিং স্টেশন ও পাম্পে নেই জ্বালানি তেল। উপজেলাগুলোতে তেলের সংকট থাকায় কৃষি জমিতে সেচের কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি জানান- পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আলীপুর-মহিপুর দেশের অন্যতম বৃহৎ বিএফডিসি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। প্রতিদিন অসংখ্য জেলে এই বন্দরে মাছ বিক্রি করে ট্রলারে রসদ ও জ্বালানি নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। তবে গত তিন-চার দিন ধরে এলাকায় তীব্র ডিজেল সংকট দেখা দেওয়ায় শত শত মাছ ধরার ট্রলার সমুদ্রে যেতে পারছে না। এতে ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে বিপাকে পড়েছেন জেলে ও ট্রলার মালিকরা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডিজেল না পাওয়ায় মাছ বিক্রি করে ফিরে আসা ট্রলারগুলো বিভিন্ন খাল ও ঘাটে নোঙর করে রাখা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন জেলেরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, অন্যদিকে ট্রলার মালিকদেরও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মহিপুরের ইভা খানম ট্রলারের মালিক ইব্রাহিম কোম্পানি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরে দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু খুচরা ব্যবসায়ী বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে তেল মজুত করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, গত তিন-চার দিন ধরে কোনো মহাজনের কাছেই ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে মাছ বিক্রি করে ট্রলারগুলো ঘাটে বেঁধে রাখতে হচ্ছে। আমার দুটি ট্রলারে প্রায় ৩০ জন স্টাফ রয়েছে। তাদের খাবার বাবদ প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল নিয়ে আমরা অনিশ্চয়তায় রয়েছি।
জননী কোম্পানির পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমাদের সাতটি ট্রলারের মধ্যে এরই মধ্যে চারটি বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি তিনটি সমুদ্রে রয়েছে। সেগুলো ফিরে এসে তেল না পেলে আর সমুদ্রে যেতে পারবে না। ঈদের আগে মাছ ধরে ভালো আয়ের আশা ছিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেই আশা আর পূরণ হবে না। আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ভাই ভাই আড়তের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, আমরা মৎস্য ব্যবসায়ী হিসেবে আজ অসহায় অবস্থায় আছি। অনেক ডিজেল ব্যবসায়ীর কাছে তেল মজুত থাকলেও তারা আমাদের কাছে বিক্রি করছে না। এতে আমরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছি। এ বিষয়ে প্রশাসনের সঠিক তদারকি প্রয়োজন। মহিপুর আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুমন দাস জানান, এলাকার পাম্প বা দোকানগুলোতে গেলে বলা হচ্ছে ট্রলারে তেল দেওয়া নিষেধ। আবার কোথাও কোথাও বেশি দাম দিলে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে সমুদ্রগামী ট্রলারগুলো জ্বালানি সংকটে পড়ে ঘাটে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, আলীপুর-মহিপুর এলাকায় স্থানীয় মালিকানাধীন ট্রলারের সংখ্যা ১৫০টির বেশি।
এছাড়া চট্টগ্রাম, বাঁশখালী, ভোলা, বরগুনা ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার আরও প্রায় শতাধিক ট্রলার এই বন্দর থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে এবং মাছ বিক্রি করে। একটি ট্রলার সমুদ্রে যাওয়ার সময় ইঞ্জিনের আকার অনুযায়ী সাধারণত এক হাজার থেকে দুই হাজার লিটার পর্যন্ত ডিজেল নিয়ে থাকে। এ বিষয়ে মহিপুরের রাজা ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী মো. আসিফ মাহমুদ বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে ডিপো থেকে কোটাভিত্তিক তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে পরিবহন ছাড়া অন্য খাতে তেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, আলীপুর-মহিপুর এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সব মিলিয়ে দৈনিক মাত্র পাঁচ হাজার লিটার ডিজেল সরবরাহ হচ্ছে। এ কারণে চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া যাচ্ছে না। তবে কিছু গ্রামীণ দোকান লাইসেন্স ছাড়াই ডিজেল বা পেট্রল মজুত করে থাকতে পারে বলেও তিনি ধারণা প্রকাশ করেন। এদিকে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কাউছার হামিদ বলেন, এরই মধ্যে আলীপুর-মহিপুরের বিষয়টি নিয়ে জেলায় মিটিং হয়েছে। অতিদ্রুত এই সংকট কেটে যাচ্ছে। কেউ যদি অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, তাহলে তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান- চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জ্বালানি সংকটে ৯দিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে কুমিরা-সন্দ্বীপ নৌরুটের অন্যতম দ্রুতগামী যান স্পিডবোট। এতে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন সন্দ্বীপ যাতায়াতগামী অসংখ্য যাত্রী। এদিকে অতি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান না হলে আসন্ন ঈদ যাত্রায় চরম বিড়ম্বনার শিকার হতে হবে বলে মনে করছেন এ রুটের যাত্রীরা। জানা গেছে, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা-সন্দ্বীপ গুপ্তছড়া নৌরুটে প্রতিদিনই হাজার হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। এ রুটে বাঁশবাড়িয়া-গুপ্তছড়ায় একটি ফেরি চলাচল করে। এছাড়া কুমিরা-গুপ্তছড়ায় রয়েছে তিনটি কোম্পানির ৩৩টি স্পিডবোট এবং কিছু ইঞ্জিন নৌকা। কিন্তু ফেরির সংখ্যা কম। এ অবস্থায় দ্রুততম সময়ে ১৮ কিলোমিটার নৌপথ পেরিয়ে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে যেতে অধিকাংশ যাত্রীই স্পিডবোট বেছে নেন। এবার ঈদের ঠিক আগেই তীব্র অকটেন সংকটে গত ৯দিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে স্পিডবোট সার্ভিসটি। ফলে যাত্রীরা দুর্ভোগ পোহাতে শুরু করেছেন। যা আগামী দিনে আরও ভয়াবহ দুর্ভোগ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন সন্দ্বীপবাসী। সরেজমিনে শনিবার বিকেলে কুমিরা-সন্দ্বীপ ঘাটে ঘুরে দেখা গেছে, জ্বালানি সংকটে বন্ধ রয়েছে স্পিডবোট। এতে অনেক যাত্রীই স্পিডবোট না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন। এ সময় স্পিডবোটগুলোকে সাগর উপকূলীয় শুকনো ভূমিতে তোলা অবস্থায় দেখা যায়।
সন্দ্বীপের হারামিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, সন্দ্বীপের মানুষের একমাত্র পথই নৌরুট। এ রুটে পরিবহন ব্যবস্থা কখনোই স্থায়ী স্বস্তি ফেরেনি। এই দুর্ভোগ লাঘবে কয়েক বছর পরপর সরকার থেকে আশার বাণী শোনানো হয়। এরপর কোনো একটি সার্ভিস চালু করে। কিন্তু ততটা আয়োজন বা ঢাকঢোল পিটিয়ে সার্ভিস চালু করা হয় তত দ্রুতই সেই সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। যা আমাদের হতাশ করে। তিনি বলেন, এর আগে এরকমভাবেই সন্দ্বীপের জন্য সী-ট্রাক, ফেরি চলাচল চালু করে দ্বীপবাসীকে আনন্দের সাগরে ভাসানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা হয় হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে সী-ট্রাক। বর্ষাসহ নানান অসুবিধায় থেমে থেমে বন্ধ হয়ে যায় ফেরি। এসবের মাঝে খরচ বেশি গেলেও একমাত্র ভালো সার্ভিস ছিল স্পিডবোট। বর্তমানে অকটেন সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলোও। তাও এক বা দু’দিন নয়। ৯দিন ধরে স্পিডবোট বন্ধ হয়ে আছে। কিন্তু আমার মতো অসংখ্য যাত্রী স্পিট বোটের জন্য এসে হতাশ হয়ে ঘুরতে থাকেন। কোনো উপায় না থাকলে কাঠের তৈরি ইঞ্জিন নৌকায় যেতে বাধ্য হন। এতে অনেক সময় ব্যয় হয়ে যায়। ইঞ্জিন নৌকা দিয়ে ঈদ যাত্রা কিছুতেই নির্বিঘ্ন করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন সন্দ্বীপের অপর এক যাত্রী কালাপানিয়ার বাসিন্দা মো. নজরুল ইসলাম। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিহাব উদ্দিন তিনি বলেন, ঈদের ছুটির চাপ এড়াতে আমি ঢাকা থেকে একটু আগেই বাড়ি চলে যাচ্ছিলাম। বিকেলে ঘাটে এসে স্পিডবোটের টিকিট কাটতে গেলে কাউন্টার থেকে বলা হয়, অকটেন নেই সার্ভিস বন্ধ। তাও নাকি গত ৮ থেকে ৯দিন ধরে এ অবস্থা। এদিকে যাত্রীদের অন্তহীন অভিযোগ বিষয়ে স্পিডবোটের কাউন্টারে কথা বলতে চাইলেও তারা কোন কথা বলতে রাজি হননি।
স্পিডবোট চালক বিশু দাস, বাবুল দাস ও তাদের হেলপার মো. আমিন জানান, এ সময়ে স্পিডবোট না চললে চরম দুর্ভোগ হবে। তারা প্রতিদিন ঘাটে আসেন বোট চালানোর জন্য। কিন্তু মালিক তাদের অকটেন দিতে পারছেন না। তাই বেকার হয়ে থাকছেন তারা। এ রুটে চলাচলকারী আর.কে এন্টারপ্রাইজ নামক স্পিড বোট কোম্পানির মালিক জগলুল হোসেন নয়ন বলেন, আমরা দুটি কোম্পানির ২৫টি স্পিডবোট আছে। অকটেন সংকটের কারণে গত ৯দিন এগুলো বন্ধ আছে। অনেক যাত্রী এসে ফিরে যাচ্ছেন। যাদের জরুরী কাজ আছে তারা কাঠের ট্রলারে করে যাচ্ছেন। অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না, কাঠের ট্রলারে ডিজেলও অত্যন্ত কম দেওয়া হচ্ছে। তাদের ৮০ হাজার লিটার অকটেন দরকার। তারা অকটেনের জন্য বিভিন্ন তেল কোম্পানিকে জানানো হচ্ছে। সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ঈদে যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘব করতে এবং স্পিডবোট চালু করতে তেল কোম্পানিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। আশা করছি ঈদ যাত্রা শুরুর আগেই একটা সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন