​ডিপিডিসিতে বদলি বাণিজ্য

নারায়ণগঞ্জে পোস্টিং মানেই কোটিপতি!

আপলোড সময় : ২৬-০৮-২০২৫ ০৪:১৯:২৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৭-০৯-২০২৫ ০২:০৭:০৪ অপরাহ্ন
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে (ডিপিডিসি) চলছে রমরমা বদলি বাণিজ্য । একমাসের ব্যবধানে একই কর্মচারীকে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে সরিয়ে নেওয়া, ঘুষের লেনদেন আর সিন্ডিকেটের প্রভাব নিয়ে সরগরম পুরো প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে, ডিপিডিসির সাউথ বেল্টকে (নারায়ণগঞ্জ) ঘিরে চলছে কোটি টাকার খেলা। তাই প্রশ্ন উঠেছে, ডিপিডিসির সাউথ বেল্টে কী এমন মধু আছে, যেখানে থাকতে সবাই এতটা মরিয়া?

বারবার বদলি
গত ১৫ জুলাই এক অফিস আদেশে নারায়ণগঞ্জ (পূর্ব) নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. হাবিব উল্লাহ সোহেলকে (পরিচিতি নম্বর- ২১২৮৬) কাজলা ডিভিশনে বদলি করা হয়। একই আদেশে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. আতাউর রহমানকে (পরিচিতি নম্বর- ২১১৭০)  নারায়ণগঞ্জ (পশ্চিম) নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনে বদলি করা হয়। 

এরপর ২৫ আগস্ট আরেকটি অফিস আদেশে কাজলা নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. হাবিব উল্লাহ সোহেলকে সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনে বদলি করা হয়েছে। একই সাথে সিদ্ধিরগঞ্জ  নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. আতাউর রহমানকে কাজলায় বদলি করা হয়েছে। 

এছাড়াও গত ২৬ জানুয়ারি উপ সহকারি প্রকৌশলী এসএম কালাম হোসেনকে (আইডি নং-১১৩৫২) জুরাইন থেকে স্বামীবাগ ডিভিশনে বদলি করা হয়। সূত্র জানায়, স্বামীবাগ ডিভিশন অবৈধভাবে অর্থ কামানোর সুযোগ কম থাকায় এই প্রকৌশলী এইচআর বিভাগকে 'ম্যানেজ' করে মাত্র সাত মাসের মাথায় গত ১৪ জুলাই স্বামীবাগ থেকে নারায়ণগঞ্জের  শ্যামপুর ডিভিশনে বদলি হয়ে আসেন।

ঘুষের অভিযোগ
বদলির এক মাসের মাথায় আবার কীভাবে বদলি করা হলো তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে হাবিব উল্লাহ সোহেল (যিনি এসটি সোহেল নামে পরিচিত) সিদ্ধিরগঞ্জে বদলি হয়েছেন। আতাউর রহমানও টাকার বিনিময়ে বদলি হয়েছেন বলে জানা গেছে। ডিপিডিসিতে এভাবে চলছে বদলি বাণিজ্য। 

নারায়ণগঞ্জ কেন লোভনীয়
জানা গেছে, ডিপিডিসির সাউথ বেল্টের আওতাধীন নারায়ণগঞ্জে মোট ১২ টা ডিভিশন আছে। এর মধ্যে ১০টি ডিভিশনই লোভনীয়। এসব ডিভিশনে থাকতে পারলে কামানো যায় কোটি কোটি টাকা। তাই পিয়ন থেকে শুরু করে প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত সবাই নারায়ণগঞ্জে যাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন। 

সিন্ডিকেট
সূত্রমতে, ডিপিডিসির এক নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট এই কাজ করে থাকে। সিন্ডিকেটের সঙ্গে এইচআর দফতরের দুইজন ও ডিপিডিসির বেশ কয়েকজন প্রকৌশলী ও বিভিন্ন বিভাগের দালালও জড়িত রয়েছে। তারা ডিপিডিসিতে বদলি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, বিভিন্ন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে নয়ছয় করে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা।
 
হাবিব উল্লাহ সোহেল ওরফে এসটি সোহেলের প্রভাব
বাংলাস্কুপের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নারায়ণগঞ্জ একটি শিল্পপ্রধান এলাকা। এখানে আবাসিকের গ্রাহকের চেয়ে শিল্পগ্রাহক বেশি। এখানে রয়েছে অবৈধ অর্থ কামানোর বিভিন্ন মাধ্যম। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- উচ্চচাপ সংযোগ প্রদান, বাইপাস, মিটার ট্যাম্পারিং, আবাসিকের ক্ষেত্রে উচ্চচাপ গ্রাহককে পাশ কাটিয়ে নিম্নচাপে সংযোগ প্রদান। এসব কাজের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রতি মাসে কোটি টাকার দেনদরবার করে থাকেন। তাই সবাই ঘুরে ফিরে এই নারায়ণগঞ্জ বেল্টেই থাকতে চান। তাই তারা মোটা টাকার বিনিময়ে এখানেই পোস্টিং নিয়ে থাকেন। এসটি হাবীব তার জ্বলন্ত প্রমাণ। 

জানা গেছে, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. হাবিব উল্লাহ সোহেলকে সবাই 'এসটি সোহেল' নামেই জানে। তাকে এই নামে চেনার জন্য বিশেষ কারণ হলো তিনি নারায়ণগঞ্জ বেল্টের বিদ্যুৎগ্রাহকদের যেকোন কাজ এক নিমিষেই করে দিতে পারেন। কারণ ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে তার বিশেষ সখ্য রয়েছে। ঘুরেফিরে এসটি হাবিব তার চাকরিজীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ বেল্টে। এই সময়ে নারায়ণগঞ্জে তিনি গড়ে তুলেছেন এক বিশাল সিন্ডিকেট। তার সঙ্গে রয়েছেন বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারিরা। তাই এসটি সোহেলকে ছাড়া অন্য কোন মাধ্যমে এখানে কেউ কোন কাজই করাতে পারেন না। এমনও ঘটনা রয়েছে- একজন উচ্চচাপ বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংযোগ এক দিনেই শেষ করা রেকর্ডও রয়েছে সোহেলের। স্বাভাবিকভাবে ওই কাজটি এক মাসের মধ্যে হওয়ার কথা থাকলেও মোটা অংকের টাকা পকেটে পুরে ভেলকি দেখিয়ে দেন সোহেল। এভাবেই একজন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হয়েও তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।  

অভিযোগের বিষয়ে হাবিব উল্লাহ সোহেল ওরফে 'এসটি সোহেল' মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) বাংলা স্কুপকে মুঠোফোনে বলেন, প্রথম যখন আমার কাজলা ডিভিশনে বদলির অর্ডারটি হয়েছিল তখন আমি নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন) স্যারের দেখা করে বদলটি বাতিল করা জন্য অনুরোধ করেছিলাম। তখন স্যার বলেছিলেন, 'তুমি ওখানে (কাজলা) জয়েন করো, আমি একমাসের মধ্যে তোমাকে সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনে এনে দিব'। সেই মোতাবেকই সোমবার সিদ্ধিরগঞ্জে আমার বদলি হয়েছে। আপনি বুঝে নেন- অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না!

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপনি ডিপিডিসির প্রধান কার্যালয়ে চ্যানেলমত গিয়ে টাকা দিলে যা চাইবেন তাই পাবেন। আর ডিপিডিসিতে তো কারো বদলি হলে তা স্থগিত বা বাতিল নতুন কোনো বিষয় নয়। সিন্ডিকেটের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে এসটি সোহেল তা এড়িয়ে যান।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের একই জায়গায় তিন বছরের বেশি সময় হলে, তাকে বদলি করার বিধান রয়েছে। কিন্তু এই বিধানটি ডিপিডিসিতে রয়েছে কেবল কাগজ-কলমে। অনেক প্রকৌশলী-কর্মকর্তা ও কর্মচারী একই জায়গায় কাজ করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। এভাবে তাঁরা দুর্নীতির একটি বড় নেটওয়াক গড়ে তোলার সুযোগ পান। আবার, কারো বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে কোনো প্রতিবেদন এলে তখন তাকে নামকাওয়াস্তে পাশের ডিভিশনে বদলি করে দেওয়া হয়।

ডিপিডিসির একাধিক প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রধান কার্যালয়ের গুটিকয়েক শীর্ষ কর্মকর্তার অনৈতিক কার্যকলাপে আমরা বিব্রত। আমাদের মধ্যে এমনও প্রকৌশলী রয়েছেন, বছরের পর বছর তাঁরা বিভিন্ন প্রকল্পে, গ্রীড ও স্ক্যাডায় পোস্টিং নিয়ে চাকরি করছেন। তাঁরা যদি শারীরিক অসুস্থতা ও পারিবারিক কারণে বদলির বিষয়ে নির্বাহী পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বলেও কোনো সমাধান পাননি। অথচ এদের মধ্যে কেউ যদি অর্থ খরচ করেন, তবে তাঁর কাজ হয়ে যায়। এমন নজির অসংখ্য। 

অভিযোগের বিষয়ে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন) সোনামণি চাকমা মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) বাংলাস্কুপকে বলেন, হাবিব উল্লাহ সোহেলকে আমি চিনি না। শুনেছি, বদলির আদেশ বাতিল করার জন্য তিনি আবেদন করেছেন।  উপ সহকারি প্রকৌশলী এসএম কালাম হোসেনের বদলির বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক উপর থেকে তদবির এসেছিল, তাই আমরা এটা করেছি।

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :