নিয়ম ভেঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ: কর্তাব্যক্তিরা দুষছেন একে অপরকে

আপলোড সময় : ১১-০৮-২০২৫ ০৫:২১:৪৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ৩১-০৮-২০২৫ ০৪:৩৯:২৫ অপরাহ্ন
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) মাতুয়াইল ডিভিশনের এক আবাসিক বিদ্যুৎ গ্রাহককে নিয়ম ভেঙ্গে নিম্নচাপে সংযোগ দেয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ওই গ্রাহকের ভবনটি উচ্চ-চাপ বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় পড়লেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে সেখানে নিম্নচাপ সংযোগ দিয়েছে। প্রথম দফায় গ্রাহককে উচ্চচাপ সংযোগ নেয়ার নির্দেশ দিয়ে যে চিঠি দেয়া হয়েছিল, সেখানেও রয়েছে বিস্তর গড়মিল। ঘটনা জানাজানি হলে কর্তাব্যক্তিরা দায় এড়াতে একে অপরকে দুষছেন। তবে অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস মিলেছে ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষের তরফে।

নীতিমালা অনুযায়ী, আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পে বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে ৮০ কিলোওয়াট লোডের ওপরে হলেই তা উচ্চচাপ বিদ্যুৎ সংযোগের (এসটি) আওতায় পড়ে। সেক্ষেত্রে গ্রাহককে ট্রান্সফরমার, সুইচগিয়ার ও পিএফআই প্ল্যান্ট, এসটি মিটার নিজ খরচে স্থাপনায় বসিয়ে সংযোগের জন্য আবেদন করতে হয়। একই সঙ্গে, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের লাইসেন্সিং দপ্তর থেকে ওই সাবস্টেশনের ছাড়পত্র নিতে হয়।

বাংলা স্কুপের হাতে আসা নথি থেকে জানা যায়, মাতুয়াইল ডিভিশনের আওতাধীন ফতুল্লার গিরিধারা এলাকার মিঠু আহম্মেদ তার নয় তলা ভবনে ৩২টি ফ্ল্যাট ও মাদার মিটারসহ ৩৩টি মিটারে ৭৬ কিলোওয়াট লোড অনুমোদন চেয়ে বিদ্যুৎ সংযোগের আবেদন করেন। আবেদন পাওয়ার পর গত ৬ মার্চ মাতুয়াইল ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন গ্রাহককে নিম্নচাপ (এলটি) সংযোগের পরিবর্তে উচ্চচাপ সংযোগ নিতে চিঠি দেন। 

সেই চিঠিতে বলা হয়, একটি থ্রি-ফেজ হোল কারেন্ট মিটারের (এলটিসি-২) মাধ্যমে আপনার আঙ্গিনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। আপনি ৩৩টি মিটারে ৭৬ কিঃ ওঃ আবাসিক লোড অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছেন। সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায় স্থাপনাটি একটি নব-নির্মিত ৯ (নয়) তলা আবাসিক ভবন। ভবনটির আয়তন ২২৫০০ বর্গফুট প্রায় এবং ইউনিয়ন পরিষদের নকশা অনুযায়ী মোট ফ্ল্যাটের সংখ্যা ৩২টি হলেও বাস্তবে ৩৬টি ফ্ল্যাট আছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রফল যথাক্রমে ৭৬৫, ৫৭৫, ৫১৫, ৫১৫ বর্গফুট প্রায়। আবাসিক ভবনে বিদ্যুৎ প্রদানের ক্ষেত্রে লোডের পরিমাণ নির্ধারণের ডিপিডিসির নীতিমালা অনুযায়ী যথাক্রমে ৭৬৫, ৫৭৫, ৫১৫, ৫১৫ বর্গফুটের প্রতিটি ফ্ল্যাটে/ইউনিটে বরাদ্দকৃত লোডের পরিমাণ যথাক্রমে ৩ কিলোওয়াট, ২ কিলোওয়াট, ২ কিলোওয়াট ও ২ কিলোওয়াট প্রায়। সেই হিসাবে ৩৬টি ফ্ল্যাটের প্রস্তাবিত লোড (৯০৩)+(২৭°২)= ৮১ কিলোওয়াট এবং মাদার মিটারের লোড হবে ১২ কিলোওয়াট। সর্বমোট লোড প্রয়োজন হবে ৯৩ কিলোওয়াট, যাহা উচ্চ-চাপ (এমটি-১) বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় পড়ে। তাছাড়া ডিপিডিসি'র বিতরণ ট্রান্সফরমারের লোড বেশি হওয়ায় বর্ণিত স্থাপনায় এলটি-এ তে (নিম্নচাপ) বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার সুযোগ নাই। সেই সঙ্গে ডিপিডিসি'র বিতরণ ট্রান্সফরমার জ্বলা থেকে বিরত থাকতে নির্মাণ মিটার দ্বারা ফ্ল্যাটে লোক বসবাস না করার জন্য অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।

চিঠিতে গ্রাহককে তার স্থাপনায় উচ্চ-চাপ সংযোগের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ সংযোগের লক্ষ্যে নিজস্ব উপকেন্দ্র তথা ট্রান্সফরমার, সুইচগিয়ার ও পিএফআই প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়। অনুমোদনের অতিরিক্ত লোড ব্যবহারের কারণে ডিপিডিসি'র বিতরণ ট্রান্সফরমার বিকল হলে এর দায়ভার গ্রাহকের উপর বর্তাবে বলে চিঠিতে সতর্ক করা হয়।

চিঠিতে সুস্পষ্টভাবে জানানো হয় যে, ওই গ্রাহক কোনোমতেই নিম্নচাপ সংযোগ পেতে পারেন না। কিন্তু তারপরও গত ২৪ এপ্রিল নিম্নচাপ সংযোগের জন্য গ্রাহককে ডিমান্ড নোট (ব্যাংকে টাকা জমা দেয়ার রশিদ) প্রদান করে মাতুয়াইল ডিভিশন কর্তৃপক্ষ। সূত্রের দাবি, পাঁচ লক্ষ টাকা লেনদেনের পরই ভবনটিতে নিম্নচাপ সংযোগ দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের ঘটনা মাতুয়াইল ডিভিশনে ঘটছে হর-হামেশাই।

এ বিষয়ে খোঁজ নিতে সংশ্লিষ্ট ডিভিশনের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. খায়রুল বাশেরের সঙ্গে রোববার (১০ আগস্ট) মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বাংলা স্কুপকে বলেন, আমি ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন স্যার ভবনটি পরিদর্শন করে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়েছি। গ্রাহককে উচ্চচাপ সংযোগের নির্দেশনা দিয়ে যে চিঠিটি পাঠানো হয়েছে, তাতে সংখ্যাগত ভুল ছিল। অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশার তালুকদার ও নির্বাহী প্রকৌশলী স্যার বিষয়টি দেখভাল করেছেন। কী হয়েছে, তারাই ভালো বলতে পারবেন।

মাতুয়াইল ডিভিশনের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশার তালুকদার রোববার (১০ আগস্ট) বাংলা স্কুপকে বলেন, গ্রাহককে আমরা উচ্চচাপ সংযোগ নেয়ার জন্য চিঠি দিয়েছিলাম। পরে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) কিউ এম শফিকুল ইসলাম স্যারের সুপারিশে আমাদের নির্বাহী প্রকৌশলী ও সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী স্যার ওই গ্রাহককে নিম্নচাপে সংযোগ দিয়েছেন। অর্থের বিনিময়ে সংযোগ দেয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন স্যার কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হানিফ উদ্দিন স্যারকে 'ম্যানেজ' করে গ্রাহকের আবেদনের নথি অনুমোদন করিয়েছেন, তা আমার জানা নেই।

জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ডিপিডিসিতে উপসহকারী প্রকৌশলীদের 'সেভেন স্টার' গ্রুপ ছিল একটি আলোচিত সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটেরই অন্যতম সদস্য ছিলেন প্রকৌশলী আবুল বাশার তালুকদার। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এই প্রকৌশলীকে মাতুয়াইলে বদলি করা হলেও তার বিরুদ্ধে আবারও অনিয়ম, গ্রাহক হয়রানি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠে। এই আবুল বাশার তালুকদার মূলত: মাতুয়াইল ডিভিশনের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলীর তিন বিশ্বস্ত সহযোগীর একজন। তাঁর বিরুদ্ধে ​ডিপোজিটের অর্থ পরিশোধের পরও উৎকোচ দাবি করে গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে টালবাহানা করার অভিযোগ উঠেছিল।

যোগাযোগ করা হলে মাতুয়াইল ডিভিশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হানিফ উদ্দিন রোববার (১০ আগস্ট) বাংলা স্কুপকে বলেন, মিঠু আহম্মেদের নিম্নচাপ সংযোগের নথিটি যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেই অনুমোদন দিয়েছি। ওই গ্রাহককে উচ্চচাপ সংযোগ নিতে যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, নির্বাহী প্রকৌশলী তা নথিতে উল্লেখ করেননি। বাস্তবতা হলো, আমাকে মাতুয়াইলের পাশাপাশি শ্যামপুর ডিভিশনও দেখতে হয়। সংযোগের নথি এলেই মাঠে গিয়ে তা যাচাই করা অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে সম্ভব হয়ে ওঠে না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অর্থ লেনদেনের বিষয়টি নির্বাহী প্রকৌশলী ও আবুল বাশার তালুকদারের কাছ থেকে জেনে নিন।

মাতুয়াইল ডিভিশন সূত্রে জানা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে আগেও অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ ছিল। তিনি ২০১৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২০ সালের ৯ জুলাই পর্যন্ত আদাবর ডিভিশনে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় তার বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানি, টাকা ছাড়া গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ না দেয়া ও  স্বেচ্ছাচারিতার বিস্তর অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশের পর ডিপিডিসির তৎকালীণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী বিকাশ দেওয়ান আদাবর ডিভিশন থেকে এই কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করেন। আদাবর ডিভিশন সূত্র থেকে জানা যায়, এই কর্মকর্তা টাকা না পেলে গ্রাহকের কোন কাজই করতেন না। টাকা পেলেই তিনি গ্রাহককে উচ্চচাপ সংযোগকে পাশ কাটিয়ে নিম্নচাপে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতেন।

মো. হেলাল উদ্দিন মাতুয়াইল ডিভিশনেও একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিদ্যুৎ সংযোগ, অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন চালানো, মিটার টেম্পারিংসহ বিভিন্ন অনিয়ম করে পকেট ভারী করছেন। এমনকি, ঘুষের টাকা পেলেই ডিপোজিটের অর্থে বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের বিধানকে পাশ কাটিয়ে উন্নয়নকাজ দেখিয়ে গ্রাহককে তা নির্মাণ করে দিচ্ছে এই সিন্ডিকেট। এতে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সিন্ডিকেটের এক সদস্য বলেন, হেড অফিসে টাকা দিতে হয়। রাজনৈতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও চাঁদা দিতে হয়। টাকা না কামালে খরচ করব কীভাবে?

মাতুয়াইল ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন সোমবার (১১ আগস্ট) বাংলা স্কুপকে বলেন, ভবনের ভিতরে মাপজোক না করেই বাইরে থেকে হিসাব করা হয়েছিল। এ কারণেই চিঠিতে ফ্ল্যাটের সংখ্যা ভুল ছিল। মাপজোক না করেই কতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে তার হিসাব কীভাবে বের করলেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার ভবন দেখলেই  বলে দিতে পারি কতটুকু লোড ব্যবহার হবে। ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। অনিয়ম, গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ সবই অপপ্রচার।

ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) কিউ এম শফিকুল ইসলাম সোমবার (১১ আগস্ট) বিকেলে মুঠোফোনে বাংলা স্কুপকে  বলেন, ওই গ্রাহকের বিষয়টি আমি অবগত নই। অভিযোগের বিষয়ে খোঁজ নিব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিস্টেমের ভেতরে থেকেই যদি সিস্টেম ভঙ্গ করা হয়, তাহলে তা ঠেকাবেন কীভাবে? তবে এ জাতীয় ঘটনা রোধ করতে হলে মাঠপর্যায়ের দপ্তরপ্রধানদের ওপর আরো কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি রাখতে হবে। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা সঠিকভাবে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বারবারই ঘটবে।

বাংলা স্কুপ/একেএস/এইচবি/এসকে

​ডিপোজিটের অর্থ পরিশোধের পরও বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে টালবাহানা!
 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :