৪০০ ছাড়িয়েছে চীনের যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের বহর, উদ্বেগে যুক্তরাষ্ট্র
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
০৮-১১-২০২৬ ১১:৩৪:৪৯ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
০৮-১১-২০২৬ ১১:৩৪:৪৯ পূর্বাহ্ন
ফাইল ছবি
নিজের জলসীমার গণ্ডি ছাড়িয়ে এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে ক্রমেই বাড়ছে চীনের নৌবাহিনীর উপস্থিতি। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে জাপান ও তাইওয়ানের আশপাশের জলসীমা পর্যন্ত প্রায় ১০০টি চীনা নৌযান সক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির নৌবাহিনীর এই ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ওয়াশিংটনের। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে শনিবার (৭ নভেম্বর) এ তথ্য জানিয়েছে এনডিটিভি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের পর্যালোচনা করা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ৪০০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন রয়েছে চীনের নৌবাহিনীতে। জাহাজের সংখ্যার হিসাবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহরের চেয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি। বর্তমানে চীনের তিনটি বিমানবাহী রণতরি রয়েছে এবং চতুর্থটি নির্মাণাধীন। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পরবর্তী বিমানবাহী রণতরিটি পারমাণবিক শক্তিচালিত হতে পারে। আধুনিক ইতিহাসে শান্তিকালীন সময়ে নৌবাহিনীর অন্যতম বড় সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে চীনের এই অগ্রযাত্রাকে।
এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে চীনা যুদ্ধজাহাজ
চীনের নৌবাহিনীর কার্যক্রম এখন বিস্তৃত জলসীমাজুড়ে। দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ানের চারপাশ, ফিলিপাইনের পূর্বাঞ্চল এবং জাপানের দক্ষিণ উপকূলের কাছাকাছি নিয়মিত চলাচল করছে দেশটির যুদ্ধজাহাজগুলো। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরেও তাদের উপস্থিতি বেড়েছে। পাশাপাশি এডেন উপসাগরেও নিয়মিত নৌবহর পাঠাচ্ছে বেইজিং।
চীনা নৌযানের চলাচল পর্যবেক্ষণকারী নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সময়েই তাইওয়ানের আশপাশের জলসীমায় গড়ে ছয়টি চীনা যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করে। সামরিক মহড়ার সময় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি এর প্রায় তিন গুণ।
এ অঞ্চলে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে ভূখণ্ডগত বিরোধ রয়েছে চীনের। তবে বেইজিংয়ের লক্ষ্য শুধু নৌযানের সংখ্যা বাড়ানো নয়। উপকূলীয় জলসীমার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডে নিজেদের দাবি জোরদার এবং ভবিষ্যতে কোনো সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকানোর সক্ষমতা অর্জন করতে চায় দেশটি।
যেভাবে নৌবাহিনীকে অপ্রতিরোধ্য করল চীন
সমুদ্রে চীনের এই উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে দেশটির বিশাল জাহাজ নির্মাণশিল্প। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজ নির্মাতা দেশ চীন। প্রতিবছর বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক জাহাজের অর্ধেকেরও বেশি তৈরি হয় দেশটিতে। বিশাল কনটেইনার জাহাজ থেকে শুরু করে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজ- সব ধরনের জাহাজ নির্মাণে সক্ষম চীনের শিপইয়ার্ডগুলো।
এখন একই শিল্প সক্ষমতা ব্যবহার করে দ্রুতগতিতে যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে দেশটি। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিশ্বাস, সমুদ্রের ওপর নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে একটি দেশের বৈশ্বিক অবস্থানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরপরই কমিউনিস্ট পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতাদের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে চীনকে ‘সামুদ্রিক মহাশক্তি’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
চীনা প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন, পশ্চিমা দেশগুলো কীভাবে সমুদ্রপথ ব্যবহার করে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার করেছে। এ সময় তিনি ১৫ শতকের চীনা অ্যাডমিরাল ঝেং হের সমুদ্রযাত্রার কথাও তুলে ধরেন। ঝেং হের নৌবহর হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে আফ্রিকার পূর্ব উপকূল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সেখান থেকে পণ্যসামগ্রীর পাশাপাশি জিরাফও নিয়ে ফিরেছিল তারা।
পরবর্তী সময়ে চীন বিদেশে সম্প্রসারণের পথ থেকে সরে এসে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। শি জিনপিং ১৯ শতকের আফিম যুদ্ধের কথাও স্মরণ করেন, যখন পশ্চিমা শক্তিগুলো সমুদ্রপথে চীনে আক্রমণ চালিয়েছিল। সামগ্রিক নৌবহরের হিসাবে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে। অর্থাৎ গড়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো আকারে বড়। তবে বেইজিং এখন আগের চেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে এবং অনেক দ্রুতগতিতে বহর সম্প্রসারণ করছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের পর্যালোচনা করা মার্কিন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত চীন ৭১টি বড় যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন যুক্ত করেছে। এর মধ্যে শুধু গত বছরই যুক্ত হয়েছে ১৯টি।
একটি দ্বীপ হয়ে উঠছে যুদ্ধজাহাজ তৈরির কারখানা
এই সম্প্রসারণের বড় একটি অংশ দেখা যায় সাংহাইয়ের কাছে অবস্থিত চাংসিং দ্বীপে। দ্বীপটির পাশাপাশি অবস্থিত দুটি শিপইয়ার্ডে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজ তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে চীনের সবচেয়ে আধুনিক কিছু যুদ্ধজাহাজ।
মে মাসের স্যাটেলাইট ছবিতে সেখানে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ দেখা যায়। একই সময়ে দুটি উভচর যুদ্ধজাহাজ, দুটি ক্রুজার, তিনটি ডেস্ট্রয়ার, দুটি ফ্রিগেট এবং কয়েকটি ছোট নৌযান নির্মাণ অথবা মেরামতের কাজ চলছিল। মাত্র পাঁচ বছর আগেও ওই এলাকার কিছু অংশ ছিল খোলা মাঠ।
২০২৩ সালে একটি শিপইয়ার্ডের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হওয়ার আগেই সেখানে ৪০ হাজার টন ওজনের ‘সিচুয়ান’ জাহাজ নির্মাণ শুরু করেন শ্রমিকেরা। ‘ড্রোন ক্যারিয়ার’ হিসেবে পরিচিত এই জাহাজটি বিশ্বের বৃহত্তম উভচর আক্রমণকারী জাহাজগুলোর একটি। এর আকার নৌবাহিনী বিশেষজ্ঞদেরও অবাক করেছে। মাত্র দুই বছর আগে চীনের হাতে আসা উভচর যুদ্ধজাহাজগুলোর তুলনায় এটি অনেক বড় ও উন্নত।
এদিকে চলতি বছরের জুনে সাংসিং দ্বীপের জিয়াংনান শিপইয়ার্ডে নতুন শ্রেণির একটি সাবমেরিন দেখা যায়। এটি পারমাণবিক শক্তিচালিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর অর্থ, ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনের পরিবর্তে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের দিকে ঝুঁকছে চীন। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, ২০৪০ সালের মধ্যে ভারত মহাসাগর ও আর্কটিক অঞ্চলে নিয়মিত অভিযান চালাতে পারবে চীনা সাবমেরিনগুলো। এমনকি আটলান্টিক মহাসাগরেও পৌঁছানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পারে তারা।
সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাড়ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান নৌ-প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পীত সাগর থেকে পূর্ব চীন সাগর ও দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত জলসীমা। বিশ্বের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক সমুদ্রপথগুলোর কয়েকটি এই অঞ্চলে অবস্থিত। এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চায় বেইজিং। একই সঙ্গে কোনো সংঘাতের সময় মার্কিন সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ কঠিন করে তোলাও তাদের লক্ষ্য।
অন্যদিকে, এই জলসীমায় চীন যেন প্রধান সামরিক শক্তিতে পরিণত হতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে চায় ওয়াশিংটন। জাপান, তাইওয়ান ও ফিলিপাইনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ও অংশীদারদের অবস্থান এই অঞ্চলের কাছাকাছি। এসব ভূখণ্ডকে একত্রে সামরিক কৌশলবিদদের ভাষায় ‘প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল’ বলা হয়। চীনকে মোকাবিলায় পেন্টাগনের সামরিক কৌশলে এই দ্বীপশৃঙ্খলের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স