ঢাকা , শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ , ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খলিষখালী বাজারে দিনে ২০০ মণ দুধ বিক্রি হয়

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৭-১১-২০২৬ ০২:৪৮:২১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৭-১১-২০২৬ ০২:৪৮:২১ অপরাহ্ন
খলিষখালী বাজারে  দিনে  ২০০ মণ দুধ  বিক্রি হয় ছবি : সংগৃহীত
ভোর থেকেই সাইকেল, ভ্যান বা বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে আশপাশের গ্রামের কৃষক, খামারি ও গৃহস্থরা ড্রাম, বালতি ও হাড়িতে করে দুধ নিয়ে আসতে শুরু করেন। তাদের অপেক্ষায় থাকেন ক্রেতারা। যত বেলা বাড়তে থাকে ততই জমে উঠতে থাকে দুধ বেচাকেনা। এভাবেই প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ মণ দুধ কেনাবেচা হয় সাতক্ষীরার তালা উপজেলার শতবর্ষী  খলিষখালী বাজারে।  এই বাজারে দুধ বিক্রি করে পাওয়া টাকা অনেক পরিবারের বাড়তি আয়ের একটি অন্যতম উৎস।

স্থানীয়রা জানানা, সময়ের সঙ্গে বাজারের চেহারা বদলেছে, বেড়েছে মানুষের আনাগোনা, গড়ে উঠেছে নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তবে, ভোর হলেই ফিরে আসে পুরোনো সেই ব্যস্ততা। মাগুরা, ইসলামকাটি, সরুলিয়া ও খেশরা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে দুধ নিয়ে খলিষখালীর দুধের বাজারে আসেন বিক্রেতারা। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি দুধের দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা। তবে দুধের মান, সময় ও ক্রেতাভেদে দাম কিছুটা কমবেশি হয় বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

খলিষখালী ও আশপাশের এলাকায় গরু পালন এখন অনেক পরিবারের নিত্যদিনের কাজের অংশ হয়ে উঠেছে। অধিকাংশ মানুষের বাড়িতে পালন করা হচ্ছে এক থেকে দুটি করে গরু। অনেকে আবার গড়ে তুলেছেন ছোট খামার। নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত দুধ বাজারে বিক্রি করে সংসারে বাড়তি আয় করছেন তারা।

পাকশিয়া গ্রামের মনোরঞ্জন মন্ডলের বাড়িতে রয়েছে গরুর খামার। তার খামারে ১২ থেকে ১৫টি গরু রয়েছে। বর্তমানে ছয়টি গাভি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কেজি দুধ পান তিনি। প্রতিদিন সকালে সেই দুধ নিয়ে আসেন খলিষখালী বাজারে।

মনোরঞ্জন মন্ডল বলেন, “৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে, কখনো এর চেয়েও কম দামে দুধ বিক্রি করতে হয়। এই দুধ বিক্রির টাকা দিয়েই সংসার ভালোভাবে চলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয়ও করতে পেরেছি।”

বাগমারা গ্রামের পল্লী চিকিৎসক শাহিদুল ইসলামের রয়েছে কয়েকটি গাভি। প্রতিদিন তিনি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লিটার দুধ পান। নিয়মিত বাজারে দুধ বিক্রি করে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটান এই চিকিৎসক। 

শাহিদুল ইসলাম বলেন, “খলিষখালী দুধের বাজারের কারণে আশপাশের গ্রামের মানুষ বাড়িতে গাভি পালন করছেন। সাতক্ষীরা জেলার মধ্যে খলিষখালীর মতো দুধের বাজার আর কোথাও নেই। এ বাজারের ইতিহাসও অনেক পুরোনো।”

মাদরা গ্রামের হরি মন্ডল প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ কেজি দুধ নিয়ে বাজারে আসেন বিক্রির জন্য। তিনি জানান, প্রতি কেজি দুধ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি করেন।

খলিষখালী বাজারে দুধ কেনাবেচার সঙ্গে কয়েক দশক ধরে যুক্ত রয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। কাদিকাটি গ্রামের সঞ্জয় দাস ও বিষ্ণু কুমার দাস, সরুলিয়ার শুভঙ্কর ঘোষ, দুলাল ঘোষ ও সমীর ঘোষ এবং রাজেন্দ্রপুর গ্রামের মৃত্যুঞ্জয় ঘোষসহ অনেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে এ ব্যবসা করছেন।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজারের অনেক পরিবর্তন হলেও দুধের কেনাবেচা কমেনি। বরং আশপাশের এলাকায় গরু পালন বাড়ায় দুধের সরবরাহও বেড়েছে। এ ব্যবসা করে অনেকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন এবং পরিবার নিয়ে স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করছেন। সরুলিয়া থেকে আসা ক্রেতারাও নিয়মিত এ বাজার থেকে দুধ কেনেন। পরে এসব দুধ পাটকেলঘাটা, সাতক্ষীরা, খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকার হোটেল, মিষ্টির দোকান ও খাবারের প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়।

অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক সুনীল দে বলেন, “সাধারণ সময়ের তুলনায় ঈদ, পূজা, বিয়ে ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দুধের চাহিদা বেড়ে যায়। দুধ দিয়ে দই, মিষ্টিসহ নানা ধরনের খাবার তৈরি করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে একসঙ্গে বেশি দুধের প্রয়োজন হওয়ায় বাজারে ক্রেতার সংখ্যাও বাড়ে। তখন দামও কিছুটা বেড়ে যায়।”

খলিষখালী বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমিদার আমলের ইতিহাস। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, জমিদার ননী বসুর দান করা জমিতে খলিষখালী বাজারের গোড়াপত্তন হয়। সেই সময় থেকেই এ এলাকা ধীরে ধীরে স্থানীয় মানুষের কাছে পণ্য কেনাবেচার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।

স্থানীয় প্রবীণ চন্ডীচরণ হোড় বলেন, “খলিষখালী এলাকায় একসময় জমিদারদের বসতি ছিল। সেই সময় থেকেই দুইটি বাজারের গোড়াপত্তন হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে। প্রায় শত বছর ধরে বাজার দুটি মানুষের কেনাবেচার কেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে।”

ডা. কামাল কুমার দাস বলেন, “খলিষখালী বাজারের ইতিহাস অনেক পুরোনো। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, জমিদার ননী বসুর দান করা জমিতে এ বাজারের গোড়াপত্তন হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে বাজারের পরিধি বেড়েছে, কিন্তু এর ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছে। ভোর থেকেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে বাজারের চারপাশ জমে ওঠে। বিশেষ করে দুধের বাজার বসার সময় এখানে আলাদা এক কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়। সকালেই মূলত দুধের কেনাবেচা হয় এবং বেলা ১১টার মধ্যে তা শেষ হয়ে যায়।”

বাজারের পাশে রয়েছে একটি পুরোনো বটগাছ। গাছটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কয়েকটি চায়ের দোকানসহ ছোটখাটো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ভোরে দুধের বাজার বসার সময় এসব দোকানেও মানুষের ভিড় দেখা যায়। পুরোনো বটগাছ, বাজারের ব্যস্ততা আর দুধের হাট- সব মিলিয়ে খলিষখালীর ভোর যেন স্থানীয় জীবনেরই একটি চেনা দৃশ্য।

দুধের এই জমজমাট বাজারের আড়ালে রয়েছে খামারি ও গৃহস্থদের নানা দুশ্চিন্তাও। তাদের মতে, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুধের দাম না পাওয়া গেলে গরু পালন করে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়বে। পাশাপাশি কোল্ড স্টোরেশ ব্যবস্থা থাকলে দূরের ক্রেতাদের কাছেও দুধ সরবরাহ করা সহজ হবে এমনটি মনে করছেন খামারিরা।

বাড়িতে গরু পালনকারী খলিষখালী গ্রামের আবু বক্কর সরদার বলেন, “গরুর খাবার, চিকিৎসা, শ্রমিকের মজুরি ও খামার পরিচালনার খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে দুধ উৎপাদনের খরচও বাড়ছে।”

ভোরের দুধের বাজারের পাশাপাশি খলিষখালীতে বর্তমানে তিনটি দুধ সংগ্রহকেন্দ্র চালু হয়েছে। দুপুর ও সন্ধ্যায় গাভি থেকে দ্বিতীয় দফায় সংগ্রহ করা দুধ এসব সংগ্রহকেন্দ্রে বিক্রি করেন খামারি ও গৃহস্থরা। ফলে দুধ বিক্রির জন্য স্থানীয় মানুষের সুযোগও বেড়েছে। নির্দিষ্ট স্থান ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।

খলিশখালী বাজারের ব্যবসায়ী শেখ আব্দুল হান্নান জানান, বাজারের পরিধি বাড়লেও সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী জায়গার অভাবে কেনাবেচায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে খামারিদের। তাই ঐতিহ্যবাহী এই বাজারের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সুনির্দিষ্ট স্থানে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের জোর দাবি জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

তালা উপজেলা প্রাণিসম্পাদ কর্মকর্তা ডা. মাছুম বিল্লাহ বলেন, গরু পালনের ক্ষেত্রে সুষম খাবার, নিয়মিত টিকাদান ও রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে খামারিদের সচেতন থাকতে হবে। দুধ দোহন, সংরক্ষণ ও পরিবহনের সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও জরুরি। এতে দুধের মান ভালো থাকবে এবং খামারিরাও ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এফ. এম. মান্নান কবীর বলেন, “শত বছরের ঐতিহ্য আর প্রতিদিন সকালে দুধ কেনাবেচার কোলাহলে মুখরিত থাকে খলিষখালী বাজার। খামারি ও গৃহস্থদের উপস্থিতিতে জমে ওঠে দুধ বেচাকেনা। এই দুধ বিক্রির আয়েই সংসারে নতুন স্বচ্ছলতার মুখ দেখছেন শত শত পরিবার।”

তিনি বলেন, “প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষে থেকে হাটে শৃঙ্খলা ও আধুনিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট বাজার পরিচালনার বিষয়ে নেওয়া হবে পদক্ষেপ।”
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ