ঢাকা , বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬ , ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রণোদনার বীজ-সার নিয়ে ক্ষোভ

তাহিরপুরে বোরো আবাদে ব্যস্ত কৃষক

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৪-১১-২০২৬ ০২:১৪:১৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৪-১১-২০২৬ ০২:১৪:১৯ অপরাহ্ন
তাহিরপুরে বোরো আবাদে ব্যস্ত কৃষক ছবি : সংগৃহীত
দেশের অন্যতম বৃহৎ হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে শুরু হয়েছে বোরো মৌসুমের বীজতলা তৈরির কাজ। বর্ষায় পানিতে থইথই করা হাওরের বিস্তীর্ণ বুকে শুষ্ক মৌসুমে ফলবে সোনালি ধান। বছরের একমাত্র প্রধান ফসল বোরো ধানকে ঘিরেই আবর্তিত হয় এখানকার কৃষকদের জীবন জীবিকা। তবে গত মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও ধানের গুণগত মানের অবনতিতে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছিলেন কৃষকরা। সেই ক্ষতি কাটিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায় এবার আগেভাগেই বীজতলা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা। তবে কৃষি প্রণোদনার আওতায় সঠিক সময়ে বীজ ও সার না পাওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে কৃষকদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, অনেক সময় বীজতলা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পর কৃষি অফিস থেকে বীজ ও সার দেওয়া হয়। ফলে এসব সরকারি সহায়তা কাজে না এসে নষ্ট হচ্ছে।

উপজেলার শনি ও মাটিয়ান হাওরসহ বিভিন্ন হাওরপাড় ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বীজতলা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। কেউ বীজতলায় পানি দিচ্ছেন, কেউ জমির আইল মেরামত করছেন, আবার কেউ কোদাল ও পাওয়ার টিলার দিয়ে মাটি প্রস্তুত করছেন। বীজতলায় ভিটামিন ও জৈবসার প্রয়োগসহ ধানের বীজ বপনের প্রতিটি ধাপ গুরুত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করছেন তারা।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর জলাবদ্ধতায় হাওরের অনেক জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি ব্র্যাকের শক্তি-২ ও ৭৭৭ জাতের ধানের উৎপাদন ও গুণগত মান নিয়েও হতাশ হতে হয়েছে অনেককে। কষ্ট করে ধান ঘরে তুললেও অপরিপক্বতা ও মানের অবনতির কারণে বাজারে ন্যায্যমূল্য পাননি তারা। প্রতি মণ ধান ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। অথচ এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে এক হাজার টাকারও বেশি।

গত মৌসুমের ধান বিক্রি করতে না পারায় অনেক কৃষক এখনো আর্থিক সংকটে রয়েছেন। এরপরও বছরের একমাত্র বোরো মৌসুম হাতছাড়া করতে চান না তারা। ফলে ধারদেনা কিংবা বিভিন্নভাবে অর্থের জোগান দিয়ে নতুন মৌসুমের চাষাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এবার ধানের জাত নির্বাচনে সতর্ক হয়েছেন কৃষকরা। গত বছর ক্ষতিগ্রস্ত শক্তি-২ ও ৭৭৭ জাতের পরিবর্তে বিএডিসির ৬৭ ও ৯২, ব্রি হাইব্রিড ধান-৮, সিনজেন্টার ১২০৩, শক্তি-৩, জনকরাজ, অগ্রণী-৭, হিরা-১৯ ও ২১ জাতের বীজের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে হাইব্রিড জাতের বীজ কিনতে ঝুঁকছেন অনেকে।

শনির হাওরপাড়ের কৃষক মিল্লাদ হোসেন বলেন, এ বছর দ্রুত হাওরের পানি কমে যাওয়ায় গত বছরের তুলনায় প্রায় এক মাস আগেই বোরো ধানের বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করেছি। ৩০ কেয়ার জমির জন্য ৬০ কেজি বীজ কিনে বীজতলা তৈরি করেছি। এর মধ্যে বিএডিসির ৬৭ জাতের ৪০ কেজি, সিনজেন্টার ১২০৩ জাতের ১২ কেজি এবং জনকরাজ জাতের ৮ কেজি বীজ রয়েছে। গত বছরের উৎপাদিত ধান ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে না পেরে লোকসান গুনতে হয়েছে। তাই এবার ভালো ফলন ও ভালো দাম পাওয়ার আশায় জাত নির্বাচনে সতর্ক হয়েছি।

মাটিয়ান হাওরপাড়ের কৃষক আলম মিয়া বলেন, গত বছর ১০ কেয়ার জমির মধ্যে পাঁচ কেয়ারে ব্র্যাকের চিকন জাতের শক্তি-২ এবং বাকি পাঁচ কেয়ারে মোটা জাতের ধান চাষ করেছিলাম। শক্তি-২ জাতের ধান অপরিপক্ব হওয়ায় বাজারে চিকন ধানের স্বাভাবিক দামের চেয়ে মণপ্রতি ২০০ টাকা কম পেয়েছি। অন্যদিকে মোটা ধান বিক্রি করতে হয়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। এতে উৎপাদন খরচও ওঠেনি। তাই এবার ১০ কেয়ার জমির জন্য সিনজেন্টার ১২০৩ জাতের বীজ নিয়েছি। পাশাপাশি আরও দুই কেয়ার জমির জন্য মোটা জাতের জনকরাজ বীজ সংগ্রহ করেছি।

মাটিয়ান হাওরপাড়ের আরেক কৃষক আলী হোসেন বলেন, প্রতিবছর তিনি ৮ থেকে ১০ কেয়ার জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেন। এবারও আট কেয়ার জমির জন্য বীজ সংগ্রহ করেছেন। তিনি বলেন, দুই কেজি বীজ কিনতে দেড় মণ ধান বিক্রি করতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, লাভবান হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিবছর কৃষি অফিস থেকে বীজ ও সার দেওয়া হলেও অনেক সময় তা কৃষকদের প্রয়োজনের সময় পাওয়া যায় না। অনেকের বীজ বপনের কাজ শেষ হওয়ার পর এসব সহায়তা দেওয়া হয়। তখন কৃষকরা সরকারি বীজ হাঁস-মুরগির খাবার হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হন। আমরা চাই, কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সময়ে বীজ ও সার বিতরণ করা হোক।

ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল বাতেন সেন্টু বলেন, এ বছর ৫০০ মণ ধান উৎপাদন করেছিলেন। কিন্তু সারা বছর বাজারে ধানের দাম কম থাকায় ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারেননি। চিকন জাতের ধান কোনোমতে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছেন। আর মোটা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত ধান বিক্রি করতে হয়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। অথচ প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে এক হাজার টাকার বেশি। তাই এবার ৩০ কেয়ার জমির বেশির ভাগ অংশে বিএডিসির ৬৭ ও ৯২, ব্রি হাইব্রিড ধান-৮ এবং সিনজেন্টার ১২০৩ জাতের বীজ নিয়েছেন। কিছু জমিতে জনকরাজ জাতের বীজও লাগাবেন।

তিনি আরও বলেন, এ সময় কৃষকরা বাজার থেকে প্রতি মণ ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা দরে বীজ সংগ্রহ করছেন। কৃষি প্রণোদনার আওতায় কৃষি অফিস থেকে সঠিক সময়ে বীজ ও সার দেওয়া হলে কৃষকদের আর্থিক চাপ ও হতাশা কিছুটা কমত।

তাহিরপুর বাজারের বীজ ডিলার সামায়ূন কবির বলেন, গত বছর শক্তি-২ ও ৭৭৭ জাতের ধানের দাম কম পাওয়ায় এবার কৃষকরা বিকল্প জাতের বীজের দিকে ঝুঁকছেন। বিএডিসির ৬৭ ও ৯২ জাতের বীজ এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ থেকে ২০ টন বিক্রি হয়েছে। বাজারে নতুন আসা বিএডিসির ব্রি হাইব্রিড ধান-৮ জাতের চাহিদাও ভালো। এ জাতের প্রায় এক টন বীজ বিক্রি হয়েছে। এছাড়া সিনজেন্টার ১২০৩ জাতের বীজ প্রায় তিন টন বিক্রি হয়েছে। কৃষকদের মধ্যে এসব জাতের বীজের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে তাহিরপুর উপজেলার ২৩টি হাওরে ১৮ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বীজতলা তৈরির কাজ চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় তিন থেকে চার হাজার হেক্টর জমিতে চারা উৎপাদনের চাহিদা অনুযায়ী বীজতলা তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পুরো নভেম্বর মাসজুড়েই হাওরাঞ্চলে বীজতলা তৈরির কার্যক্রম চলবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, এবার যথাসময়েই বোরো ধানের বীজতলা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, ধান রোপণের মৌসুমও যথাসময়ে শুরু হবে। প্রতিবছর কৃষি অফিস থেকে হাওরের বোরো চাষিদের মধ্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়। তবে এ বছর বীজ ও সার বিতরণের বিষয়ে এখনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে দ্রুত কৃষকদের হাতে বীজ ও সার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ