ঢাকা , রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬ , ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টিআইবির প্রতিবেদন

মনোনয়ন বাণিজ্যে জড়িত শীর্ষ ৩ দল

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০১-১১-২০২৬ ০২:৩৯:৩৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০১-১১-২০২৬ ০২:৩৯:৩৬ অপরাহ্ন
মনোনয়ন বাণিজ্যে জড়িত শীর্ষ ৩ দল ছবি : সংগৃহীত
দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চায় চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলে মনোনয়ন বাণিজ্য হয়ে থাকে।

তাছাড়া শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন, নীতিনির্ধারণ ও প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া ব্যক্তিনির্ভর এবং পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৃণমূলের মতামত উপেক্ষিত হচ্ছে। একই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ পদ আঁকড়ে থাকায় নেতৃত্বের পরিবর্তন ও জবাবদিহির সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে দেশের অন্যতম বড় দল ক্ষমতাসীন বিএনপির কাউন্সিল হয়নি এক দশক।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

রবিবার (১ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির মেঘমালা সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রতিবেদনের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

এতে জানানো হয়, দেশের প্রধান ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে ‘মনোনয়ন বাণিজ্যের তথ্য পেয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। মাঠপর্যায়ে একটি আসনের নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে প্রার্থীর ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের তথ্য দলগুলোর নেতাদের কাছ থেকেই পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যমান রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১০টিতে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব দলের মধ্যে রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা এবং বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দলগুলো প্রকাশ্যে মনোনয়ন বাণিজ্যের বিষয়টি অস্বীকার করলেও এটি যে মাঠপর্যায়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত, তা বিভিন্ন সময়ে দলীয় প্রতিনিধিদের বয়ানেই উঠে এসেছে। তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেই এ সব তথ্য পাওয়া গেছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ নির্বাচনে একজন প্রার্থী কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেন, সেখানে নির্বাচন কমিশনে পুরো দল মিলে বছরে মাত্র ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দেয়। দলগুলোর এই আর্থিক অস্বচ্ছতার কারণে পর্দার আড়ালে বা টেবিলের নিচে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন এবং অবৈধ অর্থায়নের পথ সুগম হচ্ছে বলে মনে করে টিআইবি।

প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের সংকট তুলে ধরা হয়েছে।

এতে উল্লেখ করা হয়, একটি প্রধান রাজনৈতিক দল দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনও কাউন্সিল আয়োজন করেনি। অবশ্য উপস্থিত সাংবাদিকরা সেই দলটির নাম জানতে চাইলে জানানো হয় ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একাদশ আনুষ্ঠানিক কাউন্সিল করেনি।

এ সময় ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নিয়মিত কাউন্সিল ও তৃণমূলের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হওয়ায় সাধারণ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে পড়ছে। এতে দলগুলো ভেতর থেকে শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে শুধু ওপরের স্তরের মুষ্টিমেয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব বাছাইয়ের অনীহার কারণে পরিবারতন্ত্র ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক কর্তৃত্বপরায়ণতা ক্রমাগত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। দেশে বর্তমানে অন্তত ১০টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে নির্ধারিত হচ্ছে। 

টিআইবির গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৩২টি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের সময়কাল বিশ্লেষণ করে উল্লেখ করা হয়, ১২টি দলের প্রধান ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে পাঁচটি দলের প্রধানের নেতৃত্বের মেয়াদ ১০ থেকে ২০ বছর এবং সাতটি দলের প্রধান ২০ বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্বে রয়েছেন। বাকি ২০টি দলের প্রধানের নেতৃত্বের মেয়াদ ১০ বছরের কম।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান ৪৫ বছর এবং বিএনপির দলীয় প্রধান ৪১ বছর দায়িত্বে ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির দলীয় প্রধান পদে পরিবর্তন এসেছে।

এ ছাড়া জেলা, উপজেলা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিগুলোকে মূলত কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, নির্বাচনি প্রচারণা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। দলের নীতি ও কৌশল নির্ধারণে তৃণমূলের মতামত দেওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় জানানো হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠনেও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দিষ্ট মেয়াদের উল্লেখ নেই। এর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের গঠনতন্ত্রে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও সুস্পষ্ট বিধান পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, নাগরিক ঐক্য ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের গঠনতন্ত্রে স্থানীয় কমিটির মেয়াদ সম্পর্কে কোনও বিধান নেই। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটি স্থানীয় কমিটি গঠনের নিয়মাবলি নির্ধারণ করে। স্থানীয় পর্যায়েও একই ব্যক্তি দীর্ঘদিন নেতৃত্বে থাকার প্রবণতা রয়েছে।

টিআইবি জানায়, ২০১৩ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী, দলীয় প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট দলে ন্যূনতম তিন বছর সক্রিয় সদস্য থাকার শর্ত বাতিল করা হয়। অথচ ওই পরিবর্তন এখনও বহাল রয়েছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার সুস্পষ্ট শর্ত নেই। মাত্র ছয়টি দলের গঠনতন্ত্রে প্রার্থীর যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, সততা ও দলের প্রতি আনুগত্যের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব শর্তও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। মূলত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি দলগুলোর গণতান্ত্রিক চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে মনে করে সংস্থাটি। 

 
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ