৭০০ বছরের ঐতিহ্য, আজও ওড়ে জালালি কবুতর
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০১-১১-২০২৬ ০২:৩১:২৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০১-১১-২০২৬ ০২:৩১:২৬ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
সিলেটের হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজারে গেলে সবার আগে চোখে পড়ে একঝাঁক কবুতর। মাজারের আঙিনা, ছাদ আর আশপাশের স্থাপনায় বিচরণ করে ওরা। কখনো দলবেঁধে আকাশে ডানা মেলে, কখনো নেমে আসে ভক্তদের ছিটিয়ে দেওয়া খাবার খেতে। মানুষের ভিড়, কোলাহল কিংবা আনাগোনায় তাদের মধ্যে তেমন কোনো ভয় দেখা যায় না। মাজারে আসা দর্শনার্থীদের কাছে এই কবুতরগুলো কেবল পাখি নয়; এগুলো দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, ভালোবাসা ও ঐতিহ্যের অংশ। স্থানীয় মানুষের কাছে ওরা পরিচিত ‘জালালি কবুতর’ নামে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কবুতরগুলো এলো কোথা থেকে? কে এনেছিল এদের? আর কেনইবা মানুষ এদের এত সম্মান আর ভালোবাসার চোখে দেখে? প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই কবুতরগুলোর ইতিহাস প্রায় সাতশ বছরের পুরোনো। কথিত আছে, দিল্লির বিখ্যাত সুফি সাধক হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) হজরত শাহজালালকে (রহ.) একজোড়া কবুতর উপহার দিয়েছিলেন। সেই কবুতর জোড়ার বংশধরই আজকের জালালি কবুতর। প্রচলিত লোককথায় আজও সেই ইতিহাস বেঁচে আছে। ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকা সেই কাহিনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে।
দুই সাধকের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কাহিনি:
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট চা-বাগান, পাহাড়, টিলা ও সুরমা নদীর জন্য পরিচিত। একই সঙ্গে শহরটির রয়েছে দীর্ঘ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ‘৩৬০ আউলিয়ার দেশ’ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের ইতিহাসে হজরত শাহজালালের (রহ.) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শহরের প্রাণকেন্দ্রের একটি টিলায় অবস্থিত তাঁর মাজারে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ জিয়ারত করতে আসেন।
প্রচলিত জীবনীমূলক বর্ণনা অনুসারে, হজরত শাহজালালের (রহ.) জন্ম আনুমানিক ১২৭১ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কোথাও ইয়েমেনের কথা বলা হয়েছে, আবার কোনো কোনো বর্ণনায় তুরস্কের কুনিয়া অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তিনি শাহজালাল ইয়ামেনি নামেই বহুল পরিচিত।
কথিত আছে, শৈশবে মা-বাবাকে হারানোর পর তাঁর লালন-পালন ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার দায়িত্ব নেন তাঁর মামা সুফি সাধক সৈয়দ আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দী (রহ.)। তাঁর কাছেই শাহজালালের ধর্মীয় শিক্ষা ও সাধনার সূচনা হয়। পরে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে আসেন এবং সিলেট অঞ্চলে তাঁর আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র গড়ে তোলেন।
শাহজালালের (রহ.) জীবনকে ঘিরে প্রচলিত একটি কাহিনিতে বলা হয়, তাঁর মামা তাঁকে একমুঠো মাটি দিয়ে পূর্ব দিকে যাত্রা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেখানে সেই মাটির রং, গন্ধ ও স্বাদের সঙ্গে স্থানীয় মাটির মিল পাওয়া যাবে, সেখানেই তাঁর গন্তব্য। এই নির্দেশ অনুসরণ করে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে তিনি সিলেটে পৌঁছান বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অনুসারীদের সংখ্যাকে কেন্দ্র করেই ‘৩৬০ আউলিয়া’র পরিচিতি গড়ে উঠেছে বলে প্রচলিত আছে।
দিল্লি থেকে সিলেটে একজোড়া কবুতর:
জালালি কবুতরকে ঘিরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় কাহিনিটির সূত্রপাত দিল্লিতে। লোকমুখে প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, সিলেটে আসার পথে হজরত শাহজালাল (রহ.) দিল্লিতে অবস্থান করেন। সে সময় সেখানে ছিলেন চিশতিয়া সুফি তরিকার বিখ্যাত সাধক হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.), যিনি ‘মাহবুবে ইলাহী’ নামে পরিচিত ছিলেন।
শাহজালালের আগমনের খবর পেয়ে নিজামুদ্দিন আউলিয়া তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন। দুই সাধকের মধ্যে আধ্যাত্মিক আলোচনা ও ভাববিনিময় হয়। বিদায়ের সময় অতিথিকে স্মারক উপহার দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন নিজামুদ্দিন আউলিয়া। দুনিয়াবি সম্পদের প্রতি অনাসক্ত একজন সাধককে কী উপহার দেওয়া যায়—এমন ভাবনা থেকেই তিনি একজোড়া ধূসর-নীলচে রঙের কবুতর উপহার দেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
কাহিনি অনুসারে, শাহজালাল (রহ.) সস্নেহে কবুতর জোড়া গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী যাত্রায় সঙ্গে নিয়ে আসেন। সিলেটে বসতি গড়ার পর কবুতরগুলো তাঁর খানকাহ প্রাঙ্গণে থাকতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে তাদের বংশবৃদ্ধি ঘটে। এভাবেই একজোড়া কবুতর থেকে বহু কবুতরের জন্ম হয় এবং একপর্যায়ে এগুলো জালালি কবুতর নামে পরিচিতি পায়।
কেন এত সম্মান জালালি কবুতরের:
হজরত শাহজালাল (রহ.) ১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন বলে প্রচলিত জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর মাজারকে কেন্দ্র করে পরে সিলেটের মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে একটি বিশেষ ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। সেই ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে মাজার প্রাঙ্গণে বিচরণ করা কবুতরগুলোও।
স্থানীয় মানুষের কাছে কবুতরগুলো হজরত শাহজালালের (রহ.) স্মৃতিবাহী পাখি। ফলে এগুলোর প্রতি যত্নশীল থাকা এবং ক্ষতি না করাকে অনেকে ধর্মীয় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে দেখেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, কবুতরকে আঘাত করা বা হত্যা করা অনুচিত। এ কারণে মাজার এলাকায় কবুতরগুলোর জন্য তৈরি হয়েছে তুলনামূলক নিরাপদ এক পরিবেশ।
জালালি কবুতর নিয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মাজারে আগত অনেক দর্শনার্থী নিজেরাই এগুলোর খাবারের ব্যবস্থা করেন। ধান, গম ও ভুট্টা কিনে পাখিদের সামনে ছড়িয়ে দেন। মাজারের আশপাশে কবুতরের খাবারও বিক্রি হয়। অনেকে এই খাবার দেওয়াকে সওয়াবের কাজ মনে করেন। এভাবেই ধর্মীয় অনুভূতি, পাখির প্রতি মমতা এবং স্থানীয় ঐতিহ্য পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে। এক প্রজন্মের দেখা কবুতর পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠে। ফলে পাখিগুলো হয়ে ওঠে শহরের চেনা দৃশ্যের পাশাপাশি একটি জীবন্ত ঐতিহ্য।
মাজার ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পরিচিতি:
জালালি কবুতরের পরিচিতি শুধু শাহজালালের (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণেই সীমাবদ্ধ নেই। সিলেটের বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানেও এই নাম পরিচিত। মাজার প্রাঙ্গণে কবুতরের ঝাঁক দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে ওরস ও অন্যান্য ধর্মীয় আয়োজনে যখন দেশ-বিদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমবেত হন; তখন মানুষের ভিড়ের ওপর দিয়ে উড়ে বেড়ানো কবুতরগুলো এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করে। দর্শনার্থীদের কেউ তাদের ছবি তোলেন, কেউ খাবার দেন, আবার কেউ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পাখিগুলোর ওড়াউড়ি দেখেন।
এ দৃশ্য সিলেটের ধর্মীয় পর্যটন ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গেও যুক্ত। মাজারে আসা অনেক মানুষের কাছে জিয়ারতের অভিজ্ঞতার একটি অংশ হয়ে থাকে কবুতর দেখা ও তাদের খাবার দেওয়া। ফলে জালালি কবুতর শুধু অতীতের কোনো কাহিনির স্মারক নয়, বর্তমানের জনজীবনেরও পরিচিত অনুষঙ্গ।
বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সহাবস্থানের প্রতীক:
একজোড়া কবুতরকে কেন্দ্র করে প্রচলিত সাতশ বছরের কাহিনি ইতিহাস, জনশ্রুতি ও ধর্মীয় আবেগের এক মেলবন্ধন। এর প্রতিটি বিবরণ ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত না হলেও জালালি কবুতরের প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের মমতা দৃশ্যমান বাস্তবতা। এই মমতা পাখিগুলোর জন্য একটি আশ্রয় তৈরি করেছে, যেখানে মানুষ তাদের উপস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে এবং খাবার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
আজকের দিনে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতার আলোচনা যখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে; তখন জালালি কবুতরের ঐতিহ্যও নতুনভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো প্রাণীর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা যদি তাকে নিরাপদে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেয়, তবে সেই বিশ্বাসের ইতিবাচক দিকটি স্বীকার করতেই হয়। একই সঙ্গে পাখিগুলোর সুস্থতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং উপযুক্ত খাদ্যের বিষয়েও সচেতন থাকা জরুরি।
সিলেটের আকাশে জালালি কবুতরের ওড়াউড়ি কেবল একটি পরিচিত দৃশ্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জনপদের স্মৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককথা ও প্রাণীর প্রতি মমতার দীর্ঘ ইতিহাস। দিল্লি থেকে একজোড়া কবুতর উপহার পাওয়ার কাহিনি সত্য হোক বা লোকবিশ্বাসের অংশ—সিলেটের মানুষের হৃদয়ে এই পাখিগুলোর যে বিশেষ স্থান তৈরি হয়েছে, সেটিই তাদের ঐতিহ্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিচয়।
সাতশ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে মাজার প্রাঙ্গণে আজও ডানা মেলে জালালি কবুতর। মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসার সঙ্গে সহাবস্থানের এই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়, কখনো কখনো একটি ছোট্ট প্রাণীও একটি শহরের পরিচয় ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স