ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ , ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুয়াকাটায় বিচ কার্ণিভাল ঘিরে বাড়তি উচ্ছ্বাস

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২২-১০-২০২৬ ০৪:১৬:৩৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২২-১০-২০২৬ ০৪:৩৯:২৯ অপরাহ্ন
কুয়াকাটায় বিচ কার্ণিভাল ঘিরে বাড়তি উচ্ছ্বাস ফোকাস বাংলা নিউজ
দুর্গাপূজার ছুটির সঙ্গে একদিনের সরকারি ও দুই দিনের সাপ্তাহিক ছূটিতে সাগরকন্যা কুয়াকাটা এখন পর্যটকের পদভারে মুখরিত হয়ে আছে। আর এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কুয়াকাটা কার্ণিভাল-২০২৬। ফলে ভিড় রয়েছে উপচেপড়া। সবনিয়ে গোটা কুয়াকাটা এখন উৎসবের শহরে পরিণত হয়েছে। ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার থেকেই পর্যটকের আনাগোনা শুরু হয়। ইতোমধ্যে তারকা মানের এবং আধুনিক মানের সেবা সংবলিত হোটেলগুলো ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত বুক্ড হয়ে আছে। এছাড়া মাঝারি ও ছোট মানের হোটেলগুলোও এখন ৯০ শতাংশ কক্ষে গেস্ট রয়েছে। পুজার ছুটির সঙ্গে সরকারি আরো মোট পাঁচ দিনের ছুটির মোক্ষম সুযোগকে কাজে লাগিয়ে হোটেল-মোটেল রিসোর্ট মালিকরা এখন চুটিয়ে ব্যবসা করছেন। তবে খাবার হোটেলে ও অভ্যন্তরীণ অটো-ভ্যানসহ যানবাহনে জুলুম চলছে বলে অধিকাংশ পর্যটকের অভিযোগ। 

দুর্গাপূজার উৎসব শেষ হওয়ায় আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কুয়াকাটা সৈকতে পর্যটকের উপচেপড়া ভিড় শুরু হয়েছে। গোটা সৈকতজুড়ে বেলা ১১ টা থেকে পর্যটকরা গোসলে মত্ত হয়ে আছেন। ঘুরছেন পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্যমন্ডিত স্পটগুলো। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পর্যটকরা সকাল থেকে রাত অবধি ঘুরছেন কুয়াকাটা সৈকতসহ আশপাশ এলাকায় ঘুরছেন। পর্যটক দম্পতি রিয়াজউদ্দিন-সাবিকা পারভিন জানান, সকালে হোটেল থেকে নাস্তা করে তাঁরা প্রথমে লাল কাঁকড়ার সৈকতখ্যাত গঙ্গামতি, কাউয়ার চর ঘুরেছেন। তবে লালকাঁকড়া দেখতে না পেয়ে তাঁরা হতাশা ব্যক্ত করেন। এ দম্পতি দেখেছেন রাখাইনদের মিশ্রিপাড়ার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী সীমা বৌদ্ধবিহার। রাখাইন জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন। এখন সাগরে গোসল করবেন। তারপরে দুপুরের খাওয়া শেষে হোটেলে ফিরবেন। বিকেলে লেম্বুরচর ঘুরবেন। এসব দৃশ্য দেখে তাঁরা মুগ্ধ হয়েছেন। তবে ব্যবস্থাপনার সংকট আছে বলে মনে করছেন তাঁরা। 

দেখা গেছে, সৈকতের বেলাভূমি থেকে স্পিবোটে চড়ে, আবার ওয়াটার বাইকে সাগরের অগভীর এলাকায় চক্কর দিচ্ছেন কেউ কেউ। শত শত পর্যটক সৈকতের বেলাভূমের বেঞ্চিতে বসে উপভোগ করছেন সাগরের নির্মল প্রকৃতি। ঢেউয়ের ছুটে আসা পথ কীভাবে কিনারে এসে যেভাবে মিশে যায়- পলকহীন চোখে এসব দেখছেন। আবার কেউ পায়ের পাতা ভেজানো পানিতে নেমে নীরবে হাঁটছেন। উপভোগ্য এসব দৃশ্য আসলে বর্ণনায় তোলা যায় না। নানা কায়দায়, নিজস্ব চিন্তা ও দর্শণে উপভোগ করছেন কুয়াকাটাকে। কেউ কেউ ঘুরছেন রাখাইন পল্লীতে। দেখছেন তাঁদের নিজস্ব জীবনযাত্রার চিত্র। দেখতে ভুলছেন না আড়াই শ’ বছরের পুরনো নৌকা। অনেকে রাখাইনদের শত বছরের পুরনো বৌদ্ধবিহারগুলো পরিদর্শন করছেন। এখানকার ইতিহাস ঐতিহ্যের খবর নিচ্ছেন। নিজের জানাকে সমৃদ্ধ করছেন কেউ কেউ।

লম্বা ছুটির মধ্যে ২৩ ও ২৪ অক্টোবর দুই দিনের কুয়াকাটা কার্নিভাল-২০২৬ যোগ হওয়ায় পর্যটনকেন্দ্রটিতে তৈরি হয়েছে বাড়তি উচ্ছ্বাস। ইতোমধ্যে দেশ বরেণ্য সঙ্গীত তারকারা এখানে উপস্থিত হয়েছেন। স্থানীয় শিল্পীরাও প্রস্তুতি নিয়েছেন সঙ্গীতানুষ্ঠানের। আজ শুক্রবার প্রত্যুষে উদ্বোধনী দিনের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে থাকছে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে গঙ্গামতি সৈকত পর্যন্ত ৬কিলোমিটার বিচ ম্যারাথন। সেখানে গিয়ে সবাই মিলে সূর্যোদয়ের মনোরম দৃশ্য অবলোকনের প্রস্তুতি রয়েছে। এনিয়ে সাজসজ্জা, প্রচার-প্রচারণা ও নানা আয়োজনের প্রস্তুতি শেষের পথে।

লম্বা ছুটি ও বিচ কার্ণিভাল-কুয়াকাটা ঘিরে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন কুয়াকাটার হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, খাবার হোটেলসহ পর্যটননির্ভর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যবসায়ীরা। প্রায় ৩০০ হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট, দেড় শতাধিক খাবার হোটেল এবং পর্যটনকেন্দ্রিক অন্তত তিন সহস্রাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখন ব্যস্ত পর্যটক সেবায়। সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য, পাঁচদিনের ছুটি ও কার্নিভালের সম্মিলিত আয়োজনে এবার জমে উঠেছে কুয়াকাটার পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্য।

কার্ণিভালকে ঘিরে দেশবরেণ্য ও স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঘুড়ি উৎসব, তারকাদের অংশগ্রহণে বিচ ফুটবল, ক্রিকেটসহ নানা আয়োজন রাখা হয়েছে। পর্যটকদের জন্য একাধিক ইভেন্ট বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে এ আয়োজন ঘিরে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনের উপস্থিতিতে প্রস্তুতি সভাও হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিটি ইভেন্টের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে নিয়মিত সভা করা হয়েছে। এমপি মোশাররফ হোসেন এসব কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন।

পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. শামীমুজ্জামান জানান, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়ের আব্দুর রহিম সাকি এমপি, পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, পিরোজপুরের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মিজ সুলতানা জামান জুঁই এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরীর।

সরেজমিনে হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উন্নতমানের হোটেলগুলোতে ইতোমধ্যে শতভাগ কক্ষ বুকিং রয়েছে। কুয়াকাটার আধুনিক তারকামানের হোটেল প্রেসিডেন্ট পার্কের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এমজি মোর্শেদ খান জানান, তাঁদের হোটেলের সব কক্ষ ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত বুকিং রয়েছে। আগত অতিথিদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে তাঁরাও প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। একই তথ্য দিলেন সাধারণ মাঝারিমানের তাজওয়ার আবাসিক হোটেলের পরিচালক রণজিৎমিত্র।

কুয়াকাটার হোটেল-মোটেল এসোসিয়েশন সভাপতি মোতালেব শরীফ বলেন,‘ অসংখ্য পর্যটকের আগম ঘটেছে। তাঁদের সংগঠনের আওতাধীনসহ মোট প্রায় ৩০০ আবাসিক হোটেলে আসা পর্যটকের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কোন ধরনের কোন ব্যত্যয় ঘটলে তাঁদেরকে অবগত করানোর জন্য তিনি বললেন।

তবে খাবার হোটেলগুলোতে গত দুইদিন পর্যন্ত উপচেপড়া ভিড় রয়েছে। যেন কে কার আগে গিয়ে সিটে বসবেন এমন প্রতিযোগিতা চলছে। খাবার হোটেলগুলোতে গলাকাটা দাম নেওয়ার এন্তার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাসনিম আহসান নামের এক পর্যটক জানালেন, তাঁদেরকে বাসি ফ্রিজিং করা মাছ খাওয়ানো হয়েছে। দামও অনেক বেশি রাখা হয়েছে। তারপরও ভিড়ের কারণে দর কষাকষি করার কোন সুযোগ নেই। পর্যটকরা একই ক্ষোভে জানালেন, অভ্যন্তরীণ পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্যের কথা। পৌরসভার নিয়ম হিসেবে কুয়াকাটা চৌরাস্তা থেকে জনপ্রতি অটোভ্যান ভাড়া লেম্বুরবন পর্যন্ত ৪০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু সেখানে ৬০-৮০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। একইভাবে মিশ্রিপাড়াম গঙ্গামতি, কাউয়ারচর, তিন নদীর মোহনা সর্বত্রই মাত্রারিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। সায়রা পারভিন-জামাল হায়দার দম্পতি জানালেন, তাঁরা গঙ্গামতি থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে কাউয়ার চরে গেছেন আর আসছেন সেখানে ৬০০ টাকা মোটরসাইকেল ভাড়া নেওয়া হয়েছে। এটাকে তাঁদের ভাষায় জুলুম বলা হয়েছে। একটা ডাব বিক্রি হচ্ছে ১৫০-২৫০ টাকা করে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পান দোকানি বললেন, এদের রাজনৈতিক সিন্ডিকেট গডফাদার রয়েছে। বিগত ১৫ বছর ধরে এমনটাই করে আসছেন। এ কারণেই পর্যটকরা এখানে আসলে আর দ্বিতীয়বার আসতে চায় না। এছাড়া অধিকাংশ পর্যটকরা বিচ নোংরা বলে মন্তব্য করেছেন। তবে কুয়াকাটা পৌরপ্রশাসক ইয়াসীন সাদেক জানালেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আরিফুজ্জামান জানান, পর্যটকের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিতে সকল ধরনের আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শৃঙ্খলা বজায়ে ট্যুরিস্ট পুলিশ, থানা পুলিশ নৌপুলিশ, এসআরবির টহল রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ সেবার জন্য বিশেষ মেডিকেল টিম ও অস্থায়ী টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে বিচ কার্ণিভাল ও কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকের জন্য। মোটকথা কুয়াকাটা এখন পর্যটকের পদভারে মুখরিত রয়েছে।

 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ