ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ , ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তালিকায় বাংলাদেশিরাও

সৌদিতে এ বছর ৫৯ বিদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ২২-১০-২০২৬ ০৩:১৮:৫৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২২-১০-২০২৬ ০৩:২০:০০ অপরাহ্ন
সৌদিতে এ বছর ৫৯ বিদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ​ছবি: সংগৃহীত
চলতি ২০২৬ সালে সৌদি আরবে উচ্চ হারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস (ইএসওএইচআর)।

জার্মানির বার্লিনভিত্তিক স্বাধীন, অলাভজনক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ইএসওএইচআর সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য নথিবদ্ধ করে। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় এ বছরও সৌদি আরব বিশ্বের সর্বাধিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।

সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে চলতি বছরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত দেশটিতে মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা দুই হাজারে পৌঁছেছে। পূর্ববর্তী যেকোনো শাসনামলের তুলনায় এই সংখ্যা সর্বোচ্চ।

পরিসংখ্যানে মৃত্যুদণ্ড ও নাগরিকদের জাতীয়তা

ইএসওএইচআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। এ সময়ে ৫৯ জন বিদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৫৪ শতাংশ। অন্যদিকে সৌদি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ৪৯, যা মোট সংখ্যার ৪৬ শতাংশ।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বিদেশিদের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া, উগান্ডা ও আফগানিস্তানের নাগরিক রয়েছেন।

অপরাধের ধরন

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কার্যকর হওয়া ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৭১টি মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৬৬ শতাংশ। হত্যাকাণ্ডের মামলায় ২৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা প্রায় ২৩ শতাংশ। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় কার্যকর হয়েছে ৯টি মৃত্যুদণ্ড, যা প্রায় ৮ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ সময়ে কার্যকর হওয়া ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৩টি, অর্থাৎ ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ, এমন অপরাধের জন্য দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে ইচ্ছাকৃত হত্যার সম্পর্ক ছিল না। আন্তর্জাতিক আইনে ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’ বলতে যে সীমিত পরিসর বোঝানো হয়েছে, এসব মৃত্যুদণ্ড তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাজার ধরন অনুযায়ী, ৮৪টি মৃত্যুদণ্ড বিচারকদের একক বিবেচনামূলক ক্ষমতা বা ‘তাজির’ শাস্তির ভিত্তিতে কার্যকর করা হয়েছে। এটি মোট সংখ্যার ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ।

এ ছাড়া ১০৮টি মামলার মধ্যে ৯১টির বিষয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ইএসওএইচআর বা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো সংস্থা আগাম তথ্য জানতে বা নথিবদ্ধ করতে পারেনি। এসব মামলা মোট সংখ্যার ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ। সংস্থাটির মতে, এ চিত্র সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি তুলে ধরে।

মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বেশি

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রধান কারণ ছিল মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ। নথিবদ্ধ ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৭১টিই এ ধরনের অপরাধে কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট সংখ্যার ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৯ জন বিদেশি নাগরিক। মোট মৃত্যুদণ্ডের ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ এ শ্রেণির অপরাধে বিদেশিদের বিরুদ্ধে কার্যকর হয়েছে। এ অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশিদের মধ্যে ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিকের সংখ্যা বেশি।

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় মৃত্যুদণ্ড

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তিদেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। বিশেষায়িত ফৌজদারি আদালতের এসব মামলায় কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের হার মোট সংখ্যার প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে গত জুনে সৌদ আল-ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা। জাতিসংঘের নির্বিচার আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ এর আগে তাঁর আটকাদেশকে বেআইনি ও অযৌক্তিক বলে বিবেচনা করেছিল।

এ ছাড়া ৯ এপ্রিল সৌদি কর্তৃপক্ষ আলী আল-সুবাইতি নামের এক অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোর মধ্যে ১২ বছর বয়সে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগও ছিল।

মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে আরও অনেকে

ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, শৈশবে সংঘটিত কথিত অপরাধের জন্য সৌদি আরবে এখনো অন্তত পাঁচজন মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ তাঁদের কয়েকজনের আটকাদেশকে বেআইনি ঘোষণা করে মুক্তির আহ্বান জানিয়েছিল। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁদের জীবন রক্ষায় বা জাতিসংঘের সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়নি বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

এ ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের অভিযোগে দণ্ডিত আরও ৪৯ জন মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শেখ সালমান আল-আওদা ও শেখ হাসান আল-মালিকি। ২০১৮ সাল থেকে সরকারি কৌঁসুলিরা তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আসছেন। তবে তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।

সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বন্দীদের বিষয়ে তথ্যও নথিবদ্ধ করেছে ইএসওএইচআর। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, খামিস মুশাইত কারাগারে ৫৮ জন ইথিওপীয়, নাজরান কারাগারে আরও পাঁচজন ইথিওপীয় ও পাঁচজন সোমালীয় এবং তাবুক কারাগারে আটজন মিসরীয় বন্দী রয়েছেন।

সংস্থাটি এসব বন্দীর মামলায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পেশাদার দোভাষীর অভাব, আইনি সহায়তা না পাওয়া, বিচারিক প্রক্রিয়া বুঝতে না পারা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া।

ইএসওএইচআরের সঙ্গে কথা বলা বন্দীরা জানিয়েছেন, তাঁরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুদণ্ডের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের কয়েক দিনের জন্য অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা হয়েছে এবং বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর হঠাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সবশেষ পরিস্থিতি

ইএসওএইচআরের মতে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান সৌদি আরবে দ্রুতগতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রবণতা তুলে ধরে। সংস্থাটির অভিযোগ, আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা এবং প্রকাশ্যে ঘোষিত আইনি প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন ও শিশু অধিকার সনদের অধীনে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

অন্যায্য বিচার, নির্যাতন, বৈষম্য ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরব বিশ্বের সর্বাধিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশগুলোর মধ্যে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ