‘মৃত্যুদণ্ড দৃশ্য’ সরাসরি দেখাতে চায় পেন্টাগন, আপত্তি ধর্মীয় নেতাদের
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১৩-১০-২০২৬ ০৩:০৭:১৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৩-১০-২০২৬ ০৩:০৭:১৪ অপরাহ্ন
নিদাল হাসান। ছবি: সংগৃহীত
ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ক্যাথলিক সেনাসদস্যদের এ কাজে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির সামরিক বাহিনীর ক্যাথলিকদের ধর্মীয় সেবার দায়িত্বে থাকা আর্চবিশপ টিমোথি ব্রগলিও। তার প্রশ্ন, ‘প্রতিপক্ষকে প্রকাশ্যে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র কি সন্ত্রাসীদের মতো আচরণ করতে চায়?’
২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যার দায়ে সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা নিয়ে এই বিতর্ক শুরু হয়েছে। আগামী ৩ ডিসেম্বর ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এ ঘটনার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দেওয়া এক বিবৃতিতে ব্রগলিও বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দায়িত্বে থাকা ক্যাথলিক সেনাসদস্যদের এ কাজ থেকে অব্যাহতি চাওয়া উচিত। কারণ, এমন কাজে অংশ নেওয়া ক্যাথলিক চার্চের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, হুইলচেয়ারে চলাফেরা করা একজন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য বিশ্বজুড়ে প্রচার করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কী অর্জন করতে চায়? তার মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর যে ভাবমূর্তি রয়েছে, এমন আয়োজন তা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের যুক্তি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখলে গুরুতর অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে মানুষ সতর্ক হবে। গত সপ্তাহে তিনি এ পরিকল্পনার কথা জানান। তার বক্তব্য, মানুষকে অপরাধের পরিণতি বুঝতে দেওয়া প্রয়োজন।
তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে আপত্তি উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনেও। সমালোচকদের আশঙ্কা, একজন বন্দির মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করলে তা সহিংসতার প্রদর্শনীতে পরিণত হতে পারে। পাশাপাশি ওই দৃশ্য যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রচারের উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।
শিকাগোর আর্চবিশপ কার্ডিনাল ব্লেইজ কাপিচও সোমবার পরিকল্পনাটির নিন্দা জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, ফায়ারিং স্কোয়াডে একজন মানুষকে হত্যার দৃশ্য সম্প্রচার করা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বর্বরতার প্রদর্শনী।
এর আগে শনিবার (১০ অক্টোবর) পোপ লিও চতুর্দশও মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেন। যদিও তিনি হাসানের মামলার কথা সরাসরি উল্লেখ করেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে পোপ বলেন, মৃত্যুদণ্ড মানুষের মর্যাদা ও অবিচ্ছেদ্য অধিকারের ওপর আঘাত। তার মতে, মৃত্যুদণ্ড ছাড়াই কার্যকর আটকব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। অপরাধীদের সংশোধন ও ফিরে আসার সুযোগও রাখা যায়।
বর্তমানে ৫৬ বছর বয়সী নিদাল হাসান ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যা করেন। হামলায় ৩০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। সে সময় তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীতে কর্মরত একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর থেকে তিনি হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামলার ঘটনাস্থল ফোর্ট হুডেই একই সময়ের কাছাকাছি সময়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আয়োজন করা হতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন সামরিক বাহিনীতে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির নেই বলে জানিয়েছেন হেগসেথ। ১৯৪৫ সালে সেনাসদস্য এডি স্লোভিককে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সামরিক দায়িত্ব থেকে পালানোর অপরাধে তার সাজা কার্যকর করা হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দিয়েছেন। তবে শনিবার তিনি জানান, মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তার যুক্তি, এমন দৃশ্য দেখানো হলে অন্যরা একই ধরনের অপরাধ করা থেকে বিরত থাকতে পারে।
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। এ বছরের এপ্রিলে তিনি ফায়ারিং স্কোয়াডসহ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আরও কয়েকটি পদ্ধতির অনুমোদন দেন। এর আগে মাদক ব্যবসা থেকে রাষ্ট্রদ্রোহের মতো অপরাধের শাস্তি হিসেবেও মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে কথা বলেছেন তিনি।
হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন নির্ধারিত হলেও তা সরাসরি সম্প্রচার করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে এখন শুধু একজন দণ্ডিত ব্যক্তির শাস্তি নয়, বরং রাষ্ট্রের হাতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য জনসমক্ষে তুলে ধরার উদ্দেশ্য ও নৈতিকতা।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচকে/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স