যশোরে এক মণ্ডপেই ১০১ প্রতিমা, চার যুগের কাহিনিতে সাজছে মন্দির
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১১-১০-২০২৬ ১১:৫৭:০২ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
১১-১০-২০২৬ ১১:৫৭:০২ পূর্বাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
সারি সারি ছোট-বড় প্রতিমা। এক ছাদের নিচে ১০১টি প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে সনাতন ধর্মের চার যুগের ধর্মীয় ও পৌরাণিক উপাখ্যান। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিযুগের নানা কাহিনি আর দেব-দেবীর বৈচিত্র্যময় রূপে সেজে উঠছে যশোর শহরতলির চাঁচড়া বর্মণপাড়া শ্রীহরি মন্দির। ব্যতিক্রমী এই আয়োজন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ।
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে মন্দিরটিতে সরস্বতী, শিব, রাধা-কৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, লক্ষ্মী-নারায়ণ, রাম-সীতা, হনুমান, কুম্ভকর্ণ, জগদ্ধাত্রী, কালী, মনসাসহ বিভিন্ন দেব-দেবী ও পৌরাণিক চরিত্রের প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। দুই মাস ধরে মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতে গড়ে তোলা প্রতিমাগুলোতে এখন চলছে রং ও সাজসজ্জার শেষ মুহূর্তের কাজ।
আয়োজকদের আশা, চার যুগের কাহিনিনির্ভর এই আয়োজন দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে সনাতন ধর্মের ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনি সম্পর্কে জানতে সহায়তা করবে। ইতোমধ্যে প্রতিমা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা আসতে শুরু করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা শিপ্রা বর্মন বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর অন্য এলাকায় প্রতিমা দেখতে যাই। এবার আমাদের গ্রামেই এত সুন্দর একটি পূজার আয়োজন হচ্ছে। এটি আমাদের অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল। ভগবান এবার সেই আশা পূরণ করেছেন। তাই আমরা অনেক খুশি।’
দীপাঙ্কর বর্মন বলেন, ‘আমাদের বর্মণপাড়ায় ১০১টি প্রতিমার মাধ্যমে সনাতন ধর্মের চার যুগ তুলে ধরা হয়েছে। এটি দেখে নতুন প্রজন্মের কাছে ধর্মীয় ইতিহাসের নানা দিক তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে। আমরাও নতুন কিছু শিখতে পারছি।’
বর্মণপাড়া গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিমুল বর্মণ বলেন, ‘সারা বিশ্বে অশান্তির মধ্যে আমরা শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে এই থিম তৈরি করেছি। সনাতন ধর্মে সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি—এই চার যুগের ধারণা রয়েছে। যুগে যুগে অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিনাশে ভগবান বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। সেই ভাবনাই প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আশা করছি, এবার এখানে প্রচুর দর্শনার্থীর সমাগম হবে।’
মন্দিরের প্রতিমাশিল্পী আকাশ মণ্ডল বলেন, চার যুগের কাহিনি তুলে ধরতে দুই মাস ধরে প্রতিমাগুলো তৈরি করেছেন তারা। রঙের কাজ প্রায় শেষ। এখনও কিছু সাজসজ্জার কাজ বাকি রয়েছে। দিন-রাত পরিশ্রম করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। দর্শনার্থীরা প্রতিমা দেখে প্রশংসা করায় তাদের কাজের আনন্দ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
৭৪৩ মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন
চাঁচড়া বর্মণপাড়ার ব্যতিক্রমী আয়োজনের পাশাপাশি যশোর জেলার আট উপজেলায় এবার ৭৪৩টি মন্দির ও মণ্ডপে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে। বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণ, রং ও সাজসজ্জার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। অনেক জায়গায় প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে সেগুলো নিয়ে যাচ্ছেন আয়োজকেরা।
যশোর শহরের বেজপাড়া সর্বজনীন পূজা মন্দিরের প্রতিমাশিল্পী শংকর মণ্ডল জানান, এবার তিনি ৩৭টি প্রতিমা তৈরি করছেন। নির্ধারিত সময়ে প্রতিমা সরবরাহ করতে দিন-রাত কাজ করছেন তিনি।
পূজা উদযাপন পরিষদ যশোরের সভাপতি দীপাঙ্কর দাস রতন জানান, গত বছরের তুলনায় এবার জেলায় ২৮টি মণ্ডপ বেড়েছে। পূজার পরিবেশ সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর রাখতে প্রতিটি মণ্ডপে ডিজের পরিবর্তে ভক্তিগীতি বাজানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে সম্প্রীতি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
দুর্গাপূজা ঘিরে জেলার মণ্ডপগুলোতে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা নেই। শঙ্কামুক্ত পরিবেশে যেন নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’
সব মিলিয়ে প্রতিমার বৈচিত্র্য, চার যুগের পৌরাণিক কাহিনি আর উৎসবের প্রস্তুতিতে শারদীয় দুর্গোৎসবকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত হচ্ছে যশোরের মণ্ডপগুলো।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স