ঢাকা , শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ , ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর আধিপত্যের সূচনা যেভাবে

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১০-১০-২০২৬ ০১:৪৩:৫৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১০-১০-২০২৬ ০১:৪৩:৫৬ অপরাহ্ন
​পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর আধিপত্যের সূচনা যেভাবে ​ছবি: সংগৃহীত
ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সংবিধান বাতিল, রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার এবং সেনাবাহিনীর হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক যাত্রা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। ইস্কান্দার মির্জার ঘোষিত সামরিক শাসন শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের ক্ষমতাকেই কেড়ে নেয়। আর জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠা পায় দীর্ঘ এক সামরিক কর্তৃত্বের ধারা, যার প্রভাব দেশটির রাজনীতি ও রাষ্ট্রকাঠামোয় সুদূরপ্রসারী হয়ে ওঠে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ১১ বছরের মাথায়, ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর নেমে আসে বড় বিপর্যয়। প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা সংবিধান বাতিল করেন, পার্লামেন্ট ভেঙে দেন এবং সামরিক আইন জারি করেন। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বহু রাজনীতিককে গ্রেপ্তার করা হয়। এভাবেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার সম্ভাবনা কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়।

এই ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনায় মির্জার সহযোগী ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান। পরবর্তী সময়ে নিজের স্মৃতিকথায় আইয়ুব জানান, ১৯৫৪ সাল থেকেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার অংশ হয়ে উঠেছিল। তখন তিনি সেনাপ্রধানের পাশাপাশি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনীতিকদের প্রতি মির্জা ও আইয়ুব—দুজনেরই ছিল অবজ্ঞার মনোভাব।

১৯৫৯ সালের শুরুর দিকে পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সেই নির্বাচন দেশটিকে প্রতিবেশী ভারতের মতো সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারত। কিন্তু ক্ষমতালোভী মির্জা ও আইয়ুব রাজনীতিকদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রায় নয় বছর পর, ১৯৫৬ সালে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, আইয়ুব খুরোসহ দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার প্রচেষ্টায় একটি সংবিধান প্রণীত হয়েছিল। সেই সংবিধানের মধ্য দিয়েই সংসদীয় সরকারব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হয়।

এর আগে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন ইস্কান্দার মির্জা। ১৯৫৬ সালের সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার ধারার আদলে প্রণীত ওই সংবিধানে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

কিন্তু ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর মির্জা নিজেই সেই সংবিধান বাতিল করেন, যে সংবিধানের ভিত্তিতে তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনা, দর-কষাকষি ও সমঝোতার মাধ্যমে গড়ে ওঠা সাংবিধানিক কাঠামো এক ঘোষণাতেই ভেঙে পড়ে।

সামরিক আইন জারির পর ইস্কান্দার মির্জা জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করেন। এই সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল ক্ষমতার এক নির্মম পরিহাস। নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে গিয়ে মির্জা এমন একজন সেনাপ্রধানকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন, যিনি অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করবেন।

মির্জা ও আইয়ুব—দুজনই ছিলেন ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে দক্ষ। তবে শেষ পর্যন্ত আইয়ুবের সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক কৌশলের কাছে মির্জা পরাজিত হন।

সামরিক শাসন জারির পর মির্জা একটি মন্ত্রিসভা গঠন করেন। সেই মন্ত্রিসভায় স্থান পান লারকানার বিদেশে শিক্ষিত তরুণ আইনজীবী জুলফিকার আলী ভুট্টো। মির্জার ছেলে হুমায়ুন মির্জার বন্ধু ভুট্টো মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়ে এতটাই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন যে প্রেসিডেন্টকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি এমন মন্তব্যও করেছিলেন, যা রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাঁর ধারণা ছিল, ইতিহাসে মির্জাকে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চেয়েও মহান ব্যক্তি হিসেবে স্মরণ করা হবে।

কিন্তু সামরিক শাসন ঘোষণার পরের ২০ দিন মির্জা ও আইয়ুবের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। আইয়ুব যে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে আইয়ুব ও তাঁর অনুগত কর্মকর্তারা মির্জাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে কতটা অজ্ঞ ছিলেন, তা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে প্রকাশ পায়।

জেনারেল বুরকি, কে এম শেখ, মুসা ও ইয়াহিয়া খানসহ আইয়ুবের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, একই রাষ্ট্রে দুজনের হাতে ক্ষমতা থাকতে পারে না। ফলে মির্জাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তাকে করাচিতে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনে পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইয়াহিয়া খানও। সেখানে মির্জাকে বন্দুকের মুখে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর তাঁকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী নাহিদ মির্জাসহ বিমানে করে কোয়েটায় পাঠানো হয়। নাহিদ এর আগে তেহরানে পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত একজন ইরানি নৌ-কর্মকর্তাকে বিয়ে করেছিলেন। কয়েক দিন পর মির্জা ও নাহিদকে লন্ডনে নির্বাসনে পাঠানো হয়। জীবনের বাকি সময় তিনি বিদেশেই কাটান; পাকিস্তানে আর ফিরতে পারেননি।

২৭ অক্টোবর থেকে পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চলে আসে আইয়ুব খানের হাতে। তিনি একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নতুন মন্ত্রিসভায় সামরিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য ছিল, যদিও কয়েকজন বেসামরিক ব্যক্তিকেও রাখা হয়েছিল। তরুণ ভুট্টোও দ্রুত নিজের অবস্থান পাল্টে আইয়ুবের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, তার প্রাথমিক ইঙ্গিত এই ঘটনাতেই দেখা যায়।

আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তানের বিচার বিভাগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ মুনিরের নেতৃত্বাধীন উচ্চ আদালত ‘প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব’ বা ডকট্রিন অব নেসেসিটি প্রয়োগ করে সামরিক শাসন ও ক্ষমতা দখলকে আইনি বৈধতা দেওয়ার পথ তৈরি করে। এই সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের পক্ষে একটি বিতর্কিত দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়।

বিচারপতি মুনির এর আগেও একই ধরনের বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন। ১৯৫৪ সালে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ গণপরিষদ ভেঙে দিলে স্পিকার মৌলভি তমিজউদ্দিন খান এর বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু মুনিরের নেতৃত্বাধীন আদালত সেই চ্যালেঞ্জ খারিজ করে দেয়। তখনও ‘প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব’ ব্যবহার করা হয়েছিল।

চার বছর পর আইয়ুবের ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রেও একই বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হয়। মুনির আইয়ুবের ক্ষমতা গ্রহণকে ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল এবং ওই বিপ্লবগুলোর ঐতিহাসিক চরিত্র এক ছিল না। ফলে বিচার বিভাগের এই অবস্থান সাংবিধানিক শাসনের পরিবর্তে সামরিক কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করে।

ক্ষমতায় বসেই আইয়ুব খান পাকিস্তানকে নিজের রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে পরিণত করেন। ১৯৫৯ সালে তাঁর সরকার ইলেকটিভ বডিজ ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডিন্যান্স বা ইবিডিও জারি করে। এর মাধ্যমে রাজনীতিকদের একটি বড় অংশকে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্বল করে প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

কোনো যুদ্ধে বিশেষ বীরত্ব প্রদর্শনের প্রেক্ষাপট ছাড়াই আইয়ুব নিজেকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেন। তাঁর শাসনের প্রথম চার বছর পাকিস্তান সরাসরি সামরিক আইনের অধীনে পরিচালিত হয়।

১৯৬২ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়নের পর সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হলেও প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নতুন সংবিধানের মাধ্যমে আইয়ুব নিজের ক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। সর্বজনীন ভোটাধিকারের পরিবর্তে মাত্র ৮০ হাজার সদস্যের একটি নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়।

এই নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্যদের বলা হতো ‘বেসিক ডেমোক্র্যাটস’। তাঁরাই প্রেসিডেন্ট এবং অন্যান্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নির্বাচনে অংশ নিতেন। পাকিস্তানে একটি জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি প্রাদেশিক পরিষদ গঠন করা হলেও এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা সীমিত ছিল। গভর্নর নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতাও প্রেসিডেন্টের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল।

ফলে প্রাদেশিক প্রশাসনও আইয়ুবের রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানে জেনারেল আজম খান ও গোলাম ফারুকের মতো ব্যক্তিদের নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রভাব ছিল স্পষ্ট।

১৯৬২ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন আবদুল মোনেম খান। তিনি ছিলেন স্বল্পপরিচিত বাঙালি আইনজীবী এবং আইয়ুবের ঘনিষ্ঠ সমর্থক। পশ্চিম পাকিস্তানে কালাবাগের নবাব মালিক আমির মোহাম্মদ খান বেশ কয়েক বছর গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন। পরে সেনাপ্রধানের পদ থেকে অবসর নেওয়া জেনারেল মোহাম্মদ মুসা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। পরবর্তী সময়ে নবাবকে তাঁর এক ছেলে হত্যা করেন। ঘটনাটি পারিবারিক বিরোধের জেরে ঘটেছে বলে প্রচার করা হয়েছিল।

বেসামরিক রাজনীতিকের পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় আইয়ুব খান মুসলিম লীগকে বিভক্ত করেন। দলটির একটি অংশকে নিয়ে তিনি গঠন করেন কনভেনশন মুসলিম লীগ। এর মাধ্যমে তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করেন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পাশাপাশি দলীয় রাজনীতির ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।

আইয়ুবের শাসনের দশ বছরে পাকিস্তানে এমন একটি বেসামরিক-সামরিক ক্ষমতাকাঠামো গড়ে ওঠে, যা রাজনৈতিক দল ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দেয়। প্রশাসনের একাংশ এবং সংবাদমাধ্যমের একটি অংশের তোষামোদও তাঁর শাসনকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলে। তাঁর স্মৃতিকথা ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’ বা ‘প্রভু নয়, বন্ধু’ অন্যের হাতে লিখিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

১৯৬৩ সালে মোহাম্মদ আলী বগরার মৃত্যুর পর জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। আইয়ুব সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান দ্রুত ঘটতে থাকে।

১৯৬৫ সালে আইয়ুব ও ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের পরিণতিতে দুই দেশই চাপে পড়ে এবং ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে আইয়ুব খান তাসখন্দ ঘোষণা প্রাথমিকভাবে স্বাক্ষর করেন।

কিন্তু এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্ক তৈরি হয়। ভুট্টো ঘোষণাটিতে একটি ‘গোপন ধারা’ রয়েছে বলে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি সরকার থেকে বেরিয়ে আসেন এবং একসময় যাঁর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁর উত্থান ঘটেছিল, সেই আইয়ুব খানের বিরুদ্ধেই প্রচার শুরু করেন।

ভুট্টোর এই অবস্থান পরিবর্তন পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক। আইয়ুবের মন্ত্রিসভায় তাঁর প্রবেশ যেমন ক্ষমতাসীনদের প্রতি আনুগত্যের পরিচয় বহন করেছিল, তেমনি পরবর্তী সময়ে সরকারের বিরোধিতা তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথ প্রশস্ত করে।

আইয়ুব খানের শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চনা এবং কেন্দ্রীয় শাসনের কর্তৃত্ববাদী আচরণ বাঙালির মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হন।

শেখ মুজিবকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে আইয়ুব সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। সরকারের লক্ষ্য ছিল, এই মামলার মাধ্যমে মুজিবের রাজনৈতিক জীবন শেষ করে দেওয়া এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করা।

কিন্তু ফল হয় উল্টো। আগরতলা মামলা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক প্রতিবাদের জন্ম দেয়। শেখ মুজিবের প্রতি জনসমর্থন বাড়তে থাকে এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। যে মামলা দিয়ে তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত আইয়ুববিরোধী আন্দোলনকে তীব্র করে তাঁর পতনের পথ তৈরি করে।

আইয়ুবের সমর্থকেরা তাঁকে এশিয়ার চার্লস দ্য গলের সমতুল্য নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইতেন। তাঁর শাসনকালকে বলা হতো ‘উন্নয়নের দশক’। কিন্তু উন্নয়নের এই প্রচারণার আড়ালে দুই পাকিস্তানেই গণতান্ত্রিক অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ তাঁর শাসনের গ্রহণযোগ্যতাকে ক্রমশ দুর্বল করে দেয়।

১৯৬৯ সালের শুরুতে আইয়ুব খান গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়েন। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করতে তিনি বাধ্য হন। শেখ মুজিবুর রহমানকে রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর আগে খান আবদুল ওয়ালি খান ও ভুট্টোকে গ্রেপ্তার করা হলেও আন্দোলনের চাপে তাঁদেরও মুক্তি দিতে হয়।

এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দেয়, সামরিক শক্তি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আইয়ুবের শাসনব্যবস্থা গণআন্দোলনের মুখে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।

১৯৬৯ সালের মার্চে আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও তিনি গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখেননি। ১৯৬২ সালের সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় পরিষদের স্পিকার আবদুল জব্বার খানের হাতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব যাওয়ার কথা থাকলেও আইয়ুব সেই পথ অনুসরণ করেননি। পরিবর্তে তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা তুলে দেন।

ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই আবার সামরিক আইন জারি করেন। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানে গণতন্ত্রের পরিবর্তে সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এক সামরিক শাসকের বিদায়ের পর আরেক সামরিক শাসকের আগমন প্রমাণ করে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের মূলে ছিল শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় সামরিক বাহিনীর প্রভাব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা।

ইস্কান্দার মির্জা ও আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। মির্জা লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটান। সেখানে তাঁকে শেষ পর্যন্ত একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপকের কাজ করতে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তিনি নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।

১৯৬৯ সালের নভেম্বরে লন্ডনে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু ইয়াহিয়া খান তাঁর মরদেহ পাকিস্তানে সমাহিত করার অনুমতি দেননি। ফলে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে তেহরানে দাফন করেন।

অন্যদিকে, ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে আইয়ুব খান মারা যান অনেকটা বিস্মৃত ও উপেক্ষিত অবস্থায়। যে ক্ষমতা ধরে রাখতে তিনি পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষমতাও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে স্থায়ী করতে পারেনি।

১৯৫৮ সালের অক্টোবরের সামরিক অভ্যুত্থান পাকিস্তানের ইতিহাসে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রবণতার সূচনা করে। পরবর্তী সময়ে দেশটি আরও তিন দফা সামরিক শাসনের মুখোমুখি হয়—জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জেনারেল জিয়াউল হক এবং জেনারেল পারভেজ মোশাররফের শাসনামলে।

আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের দুই বছর পর নিজেকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেছিলেন। আর পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় জেনারেল আসিম মুনিরকে সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট বেসামরিক সরকারের উদ্যোগে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়েছে।

পাকিস্তানের ইতিহাসে বারবার সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণ, সংবিধানের স্থগিতকরণ এবং বেসামরিক রাজনীতির ওপর হস্তক্ষেপ একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করলে তা কি দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে?

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনা এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিণতি দেখায়, সামরিক শক্তির মাধ্যমে সাময়িকভাবে ক্ষমতা সংহত করা সম্ভব হলেও তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, সাংবিধানিক শাসন ও জনগণের রাজনৈতিক অধিকারকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে। পাকিস্তানের পরবর্তী ইতিহাস সেই সংকটেরই ধারাবাহিক প্রতিফলন।

বাংলাস্কুপ/বিশেষ প্রতিনিধি/এইচকে/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ