এলপিজির সরকার নির্ধারিত দাম শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১০-১০-২০২৬ ১১:২৫:১৪ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
১০-১০-২০২৬ ১১:২৮:৪২ পূর্বাহ্ন
ফাইল ছবি
সরকারিভাবে এলপিজির দাম নির্ধারণ করেও বাজারে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সংকটের মধ্যে নতুন করে দাম নির্ধারণের পরও নির্ধারিত মূল্যে মিলছে না রান্নার গ্যাস। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত ১২ কেজির সিলিন্ডারপ্রতি দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও গ্রাহকদের কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত সাপ্লাই চেইনের বিভিন্ন স্তরে বাড়তি দাম নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও সেই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, সরবরাহ সংকট ও অপারেটর পর্যায়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কেনার কারণে বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের।
রাজধানীর হাতিরপুলের এক গ্রাহক জানান, গত ২ অক্টোবর ৫০ টাকা ডেলিভারি চার্জসহ ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তার খরচ হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। ওই সময় সিলিন্ডারটির সরকার নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। বেশি দামে বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করে বিক্রেতা জানান, সরবরাহ সংকটের কারণে তারও খরচ বেড়েছে। সর্বশেষ কেনা সিলিন্ডারে তার খরচ পড়েছে ২ হাজার টাকা, যা তিনি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
মিরপুরেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। সেখানে এক দোকানদার ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম জানিয়েছেন ২ হাজার ৪০০ টাকা। মুন্সীগঞ্জের এক বিক্রেতা জাকির হোসেন জানান, সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখের পর তিনি আর গ্যাস পাননি। নতুন করে গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে ডিলারও নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেননি। তবে নতুন সিলিন্ডার পেলে তার দাম পড়বে ২ হাজার ২০০ টাকা।
সাপ্লাই চেইনের বিভিন্ন স্তরে বাড়তি দাম
বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, অপারেটর কোম্পানির কাছ থেকে একজন ডিলার বা পরিবেশকের ১২ কেজির সিলিন্ডার কেনার কথা ১ হাজার ৭৪২ টাকায়। ডিলারের মুনাফা ৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার মুনাফা ৪০ টাকা ধরে গ্রাহক পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।
কিন্তু বাস্তবে ডিলার পর্যায়েই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। মুন্সীগঞ্জের গ্রিন এলপিজির ডিলার মোজাম্মেল জানান, ১৮ সেপ্টেম্বরের পর তার কাছে আর গ্যাস সরবরাহ করা হয়নি। নতুন দাম নির্ধারণের পরও অপারেটর তার কাছে প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৯৯০ টাকা দাম চেয়েছে, যেখানে নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৭৪২ টাকা।
তার দাবি, সরবরাহ সংকটে সেপ্টেম্বর মাসে ২০ হাজার সিলিন্ডার বিক্রির বিপরীতে তিনি সর্বোচ্চ ২ হাজার সিলিন্ডার পেয়েছেন। গ্যাসবাহী গাড়ি কয়েক দিন ধরে মোংলায় আটকে থাকায় পরিবহন খরচও বেড়েছে। এসব খরচ সামলাতে তাকে প্রতি সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রির দাবি জানাতে হচ্ছে।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতিও অপারেটর পর্যায়ে বাড়তি দাম নেয়ার অভিযোগ তুলে বিইআরসিকে চিঠি দিয়েছে। সমিতির দেয়া তথ্যে, নতুন মূল্য নির্ধারণের পর বিভিন্ন অপারেটর ডিলারদের প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৪০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। যদিও কয়েকটি কোম্পানি নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামেও সিলিন্ডার দিচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, অপারেটরদের বাড়তি দাম এবং পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ বৃদ্ধির কারণে ডিলাররা নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে পারছেন না। তার দাবি, এভাবে বিক্রি করতে গেলে অনেক পরিবেশক পুঁজি হারাবেন এবং ঋণ পরিশোধেও সমস্যায় পড়বেন।
আমদানি থাকলেও কেন সংকট
বাংলাদেশে এলপিজি আমদানির ৯৮ শতাংশের বেশি বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে হয়। বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩২ থেকে ৩৩টি কোম্পানির লাইসেন্স থাকলেও এলপিজি আমদানি করছে ১০ থেকে ১২টি কোম্পানি।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন। আমদানির পরিমাণ প্রায় একই থাকলেও বাজারে সরবরাহ সংকট কেন তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আমদানিকারক ও অপারেটরদের কেউ কেউ বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় ও প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় এলপিজির খরচ বেড়েছে। আবার যেসব কোম্পানি নিজেরা আমদানি না করে অন্য অপারেটরদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করে, তারাও পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে।
গ্রিন এলপিজির জিএম আহসান হাবিব হিরো বিবিসি বাংলাকে জানান, তার প্রতিষ্ঠান গত দুই বছর ধরে সরাসরি এলপিজি আমদানি করছে না। অন্য অপারেটরদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করে সরবরাহ করে তারা। সেপ্টেম্বরে দুই হাজার টন চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১৫০ টন গ্যাস পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অন্যদিকে, এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক দাবি করেন, আমদানির কোটা এবং লাইসেন্স পেতে নানা ধরনের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা সরবরাহ ব্যবস্থাকে জটিল করেছে। দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তির সুযোগ সীমিত থাকায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে গ্যাস সংগ্রহের খরচও বেড়েছে বলে তার দাবি।
তবে আমদানি হওয়া গ্যাসের পরিমাণের সঙ্গে বাজারে সরবরাহের ঘাটতির সম্পর্ক এবং কোথাও মজুত করে বাড়তি মুনাফা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি। কয়েকটি কোম্পানি বিজ্ঞাপন দিয়ে মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস
এলপিজির নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় সারা দেশের জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছে। জেলা প্রশাসকরা ডিলারদের সঙ্গে আলোচনা করার পাশাপাশি অভিযানও পরিচালনা করছেন।
অন্যদিকে, বিইআরসি জানিয়েছে, আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে সংকটের কারণ অনুসন্ধানে কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনের মাধ্যমে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে আমদানি, বোতলজাতকরণ, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রির প্রতিটি স্তরে বাড়তি দামের অভিযোগের মধ্যে সাধারণ গ্রাহকের জন্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সরকার নির্ধারিত মূল্য থাকলেও সেই দামে রান্নার গ্যাস না পাওয়ায় কার্যত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে দামের নিয়ন্ত্রণ।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স