বিনিয়োগ খরায় প্রবৃদ্ধি নামবে ৩.৪ শতাংশে: বিশ্বব্যাংক
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
০৭-১০-২০২৬ ০১:০৪:০৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৭-১০-২০২৬ ০১:০৪:০৯ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
বিনিয়োগে স্থবিরতা, রপ্তানি আয়ের গতি কমে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও কমিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাস বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশে।
এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলে তা করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে অর্জিত ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়েও কম হবে। অর্থাৎ, মহামারির বছর বাদ দিলে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এটি হবে অন্যতম বড় ধাক্কার ইঙ্গিত।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এর অক্টোবর সংস্করণে বাংলাদেশের অর্থনীতির এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে ঢাকায় বিশ্বব্যাংক অফিসে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগে মন্থরগতি অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এসব চাপ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এই পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি ফেরার সম্ভাবনা কম। ফলে আগের পূর্বাভাসের তুলনায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আরও নিচে নামানো হয়েছে।
তবে আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি। ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক।
এক বছরের ব্যবধানে পূর্বাভাসে বড় পতন
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বিশ্ব ব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে। গত ১৬ জুন প্রকাশিত সংস্থাটির ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস’ প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
এরও আগে গত ১৪ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল বিশ্ব ব্যাংক।
অর্থাৎ, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বিশ্ব ব্যাংকের পূর্বাভাস ৬ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সর্বশেষ ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছে বিএনপি সরকার। বিশ্ব ব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস সেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।
গত অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের ঘরে
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মন্থরগতির চিত্র ফুটে উঠেছে সর্বশেষ সরকারি হিসাবেও। গত ১০ জুন বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জিডিপির সাময়িক হিসাব প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এতে বলা হয়, ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হারে বেড়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য প্রথমে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছিল তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেই লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনে। শেষ পর্যন্ত ওই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে।
এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির পর বড় পতন
গত দেড় দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চ হারকে তুলে ধরেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। পরে সংশোধিত হিসাবে তা ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশে নেমে আসে। এখন পর্যন্ত এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি।
কিন্তু এর পরের অর্থবছরেই করোনাভাইরাস মহামারির আঘাতে প্রবৃদ্ধি নেমে যায় ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে।
২০২০-২১ অর্থবছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশে ওঠে। পরের অর্থবছরে তা ৭ শতাংশ ছাড়ালেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে আবার কমে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশে নেমে আসে।
এরপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে থাকে। বিনিয়োগে দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয়ের গতি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে দাঁড়ায়।
এখন বিশ্ব ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও নেমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে ঠেকতে পারে। অর্থাৎ, বিনিয়োগ ও উৎপাদন কর্মকাণ্ডে গতি না ফিরলে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে—এমনই বার্তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচকে/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স