ঢাকা , বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬ , ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার ৩২ রুটের ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের পরিকল্পনা

গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৭-১০-২০২৬ ১২:৪৮:১৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৭-১০-২০২৬ ১২:৪৮:১৪ অপরাহ্ন
গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকার ৯৮টি বিদ্যমান বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি রুটে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছে সরকার। ফ্র্যাঞ্চাইজি বাস সেবা মডেলের আওতায় প্রতিটি রুটে কেবল একটি কোম্পানিই বাস চালাবে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) প্রস্তাবিত এই নতুন ব্যবস্থায় একই রুটে একাধিক কোম্পানির পরিবর্তে 'এক রুট, এক কোম্পানি' ভিত্তিতে ফ্র্যাঞ্চাইজি বাস পরিচালনা করা হবে। 

এছাড়া রুটভিত্তিক বাসের সংখ্যা, পরিচালনাকারী কোম্পানি, কাউন্টার, ডিপো ও লে-ওভার পার্কিং নির্ধারণের পাশাপাশি বাসের জন্য নির্দিষ্ট স্পেসিফিকেশন ও ন্যূনতম মানদণ্ড বেঁধে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে পরিকল্পনায়। 

প্রস্তাবিত ৩২টি রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা, মালিক-শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্তি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্ধারণসহ বিভিন্ন বিষয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাসমালিক, শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে মতবিনিময় করেছে ডিটিসিএ। অংশীজনদের পর্যালোচনার জন্য পরিকল্পনাটি ইতিমধ্যে সচিবালয়ে পাঠানো হয়েছে।

ডিটিসিএ জানিয়েছে, আলোচনার পর ৩২ রুটের প্রস্তাবটি প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। সংস্থাটির প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন ৩২ রুটের গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশই বিদ্যমান রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই রুটগুলোর মাধ্যমে ঢাকা বিমানবন্দর, গাবতলী, মহাখালী, কুড়িল, গুলিস্তান, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, সদরঘাট, কাঁচপুর, সাভার, টঙ্গী, গাজীপুর ও কেরানীগঞ্জের মতো রাজধানীর প্রধান পরিবহন কেন্দ্রগুলোকে একই নেটওয়ার্কের আওতায় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত ৩২টি রুটের মধ্যে রয়েছে নন্দনপার্ক–ডেমরা, নন্দনপার্ক–কাঁচপুর, দিয়াবাড়ী–সদরঘাট, শ্রীপুর–ঢাকেশ্বরী মন্দির, কোনাবাড়ী–কেরানীগঞ্জ, গাবতলী–শিমুলতলী, ঘাটারচর–সালনা, নবীনগর–বাবুবাজার, সাভার–কাঁচপুর, গাবতলী–ডেমরা, গাবতলী–কুড়িল, কাঁচপুর–গাজীপুর ও সাভার–আড়াইহাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুট। পরিকল্পনায় বাসের জন্য সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ও ন্যূনতম মান নির্ধারণের প্রস্তাবও করা হয়েছে, যা বাস পরিচালনাকারীদের মেনে চলতে হবে।

ডিটিসিএর ডেপুটি প্ল্যানার ধ্রুব আলম বলেন, যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিটি রুটে বাসের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। তিনি বলেন, 'বাসগুলোকে একীভূত করা হলে স্বাভাবিকভাবেই মালিক ও বাসের সংখ্যা কিছুটা কমে আসবে। রুটের যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় বাসের ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট করা হবে।'

প্রস্তাবিত ৩২টি রুটের মধ্যে যাত্রী চাহিদা, বাসের প্রাপ্যতা ও সড়কের অবস্থা বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে ১২ মিটার দীর্ঘ ৫২ আসনের আধুনিক বাস চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।

রুটগুলো হলো—রুট ২১-এ বেরাইদ–খিলগাঁও রেলগেট, রুট ১-এ টিটিপাড়া–সদরঘাট, রুট ২৭-এ কাঁচপুর–গাজীপুর চৌরাস্তা, রুট ৫-এ নন্দনপার্ক (জিরানী)–ডেমরা এবং রুট ৪-এ শ্রীপুর–ঢাকেশ্বরী মন্দির।

এর মধ্যে রুট ২১-এর দৈর্ঘ্য ১৯.৫৮ কিলোমিটার। এ রুটে দৈনিক যাত্রী চাহিদা ১ লাখ ২০ হাজার ৮৭৮ জন। রুট ১-এর দৈর্ঘ্য ৫৬.১৬ কিলোমিটার এবং দৈনিক যাত্রী চাহিদা ৮৬ হাজার ৫০৯ জন।

রুট ২৭-এর দৈর্ঘ্য ৪৩.৬৫ কিলোমিটার এবং দৈনিক যাত্রী চাহিদা ৮৫ হাজার ২৬৬ জন। রুট ৫-এর দৈর্ঘ্য ৪১.৬২ কিলোমিটার, এ রুটে দৈনিক যাত্রী চাহিদা ৬০ হাজার ৮৯০ জন। আর রুট ৪-এর দৈর্ঘ্য ৫৪.২৭ কিলোমিটার এবং দৈনিক যাত্রী চাহিদা ৫৮ হাজার ৯১০ জন। 

রাজধানীজুড়ে যাত্রী ও যানবাহনের ওপর চালানো সমীক্ষার ভিত্তিতে রুট পুনর্বিন্যাসের এ পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।

ডিটিসিএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চালু থাকা ৯৮টি রুটে ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর বোর্ডিং-অ্যালাইটিং (ওঠা-নামা) এবং ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রীর অরিজিন-ডেস্টিনেশন (যাত্রার শুরু ও গন্তব্য) সমীক্ষা করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকার ৫২টি স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা করা হয়েছে। একইসঙ্গে ড্রোনের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং করা হয়েছে।

সমীক্ষায় ঢাকার সড়ক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার চিত্রও উঠে এসেছে। ঢাকার মোট প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে বাস চলাচলের উপযোগী সড়ক রয়েছে মাত্র ২৮০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬৮ কিলোমিটার ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১২ কিলোমিটার সড়ক বাস চলাচলের উপযোগী।

এ পরিকল্পনায় স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য ২৫টি চক্রাকার (সার্কুলার) বাস রুট চালুরও প্রস্তাব রয়েছে। এসব রুটের মাধ্যমে মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি মূল সড়কে ব্যাটারি রিকশার চলাচল কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তবে চক্রাকার রুট চালু করতে ব্যাটারি রিকশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট চালকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থার কথাও পরিকল্পনায় বলা হয়েছে। 

ধ্রুব জানান, রুট নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলতি মাসেই সম্পন্ন করা হবে। 

তিনি বলেন, 'এক রুটে এক মালিক বা কোম্পানির আওতায় কীভাবে বাস পরিচালনা করা যায়, তা নিয়ে চলতি সপ্তাহেই আমরা আবার মালিক সমিতির সঙ্গে বসব। তারা প্রস্তাব করবেন কোন রুটে কোন কোম্পানি বাস চালাবে।' 

ধ্রুব আরও বলেন, 'প্রস্তাবিত ৩২টি রুট যে একেবারে চূড়ান্ত, তা নয়। এতে পরিবর্তন বা পরিমার্জন আসতেই পারে এবং তাদেরও বিভিন্ন মতামত থাকতে পারে।'

কোন রুটে কত যাত্রী হতে পারে, তা ধরে একটি বিজনেস মডেল তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। 'আশা করছি, সব কার্যক্রম এই মাসের মধ্যেই শেষ হবে। [সড়ক পরিবহন ও সেতু] মন্ত্রীর নির্দেশনায় যে মিটিং হয়েছে, তা মূলত প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র। আমাদের চেষ্টা থাকবে ৩২টি রুট না হলেও যতগুলো সম্ভব, তার মধ্যে অন্তত কিছু রুট চালু করা এবং সংশ্লিষ্ট মালিকদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা'

তিনি জানান, প্রতিটি রুটে বাসের সংখ্যাও চাহিদা অনুযায়ী সমন্বয় করা হবে।

'উদাহরণস্বরূপ, কোনো রুটে যদি ৬০টি বাসের প্রয়োজন থাকে কিন্তু বর্তমানে ১০০টি বাস চলে, তবে অতিরিক্ত এবং ফিটনেসবিহীন, লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলো বাতিল করা হবে।' 

ধ্রুব আরও বলেন, 'অচল ও অনুপযোগী বাস বন্ধ রাখার বিষয়ে মালিক সমিতিও নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।'

পরবর্তী ধাপে বাসের তালিকা যাচাই, বাসের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং কাউন্টার নির্দিষ্ট করে বাস চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তবে বাসের ডিপো, কাউন্টার কিংবা সময়সূচির মতো বিস্তারিত বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ