ঢাকা , রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারি নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো দুই কর্মকর্তার বিষয়ে 'রহস্যজনক নীরবতা'

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৭-০৯-২০২৬ ০৪:৩০:০৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৭-০৯-২০২৬ ০৬:১১:৫১ অপরাহ্ন
সরকারি নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো দুই কর্মকর্তার বিষয়ে 'রহস্যজনক নীরবতা' ​ছবি: এআই
সরকারি নির্দেশ অবজ্ঞা করে দেশের বাইরে রয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের সাবেক যুগ্মসচিব ড. শেখ মনিরুজ্জামান এবং ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও যুগ্মসচিব মীর নাহিদ আহসান। তাঁরা ২০২৪ সালে বহি:বাংলাদেশ ছুটি নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করলেও এখনো যোগদান করেননি, যা সুস্পষ্টভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধির লঙ্ঘন। 

ড. শেখ মনিরুজ্জামান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এবং মীর নাহিদ আহসান কানাডায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে একাধিকবার চিঠি পাঠালেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের 'রহস্যজনক নীরবতা' সংশ্লিষ্ট মহলে গুঞ্জন ছড়াচ্ছে। তবে, মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় কমিটির তরফে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে।

সূত্র জানায়, এ ধরনের অনুপস্থিতির ঘটনা শুধু বিদ্যুৎ বিভাগেই নয়, একাধিক মন্ত্রণালয় ও দপ্তর/বিভাগে রয়েছে। চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী ছুটির বাইরে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে তাকে উপস্থিত হওয়ার জন্য নোটিশ ও সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। তারপরও হাজির না হলে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগের এই দুই কর্মকর্তা দেড় বছরের বেশি সময় ধরে অনুপস্থিত থাকার পরও বরখাস্ত তো দূরের কথা, কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থারও মুখোমুখি হননি। এতে করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ভুল বার্তা যাচ্ছে বলে সূত্রের দাবি।

বিদ্যুৎ বিভাগের সাবেক যুগ্মসচিব ড. শেখ মনিরুজ্জামান ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রে যান। নির্ধারিত ছুটি শেষ হওয়ার পাঁচ মাসেও তিনি কর্মস্থলে যোগ না দেয়ায় ২০২৫ সালের ২৮ মে জনপ্রশাসনের সিনিয়র সচিব বরাবর চিঠি দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। 

বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. নবীরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, বিদ্যুৎ বিভাগের সাবেক যুগ্মসচিব ড. শেখ মনিরুজ্জামান (পরিচিত নম্বর: ১৫০৭৮) গত ৩০ আগস্ট, ২০২৪ তারিখ Factory Acceptance Test (FAT)-এ অংশগ্রহণের নিমিত্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গমন করেন। FAT সম্পাদন ও প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ তারিখ কর্মস্থলে যোগদান করার সূচি নির্ধারিত ছিল। ৩১ আগস্ট, ২০২৪ তারিখ তাকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA)-এ সদস্য পদে বদলিপূর্বক নিয়োগ প্রদান করা হয়। তার ২৮ আগস্ট, ২০২৪ তারিখের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে ১৫-০৯-২০২৪ থেকে ১২-১২-২০২৪ তারিখ পর্যন্ত ৮৮ (আটাশি) দিন পূর্ণ গড় বেতনে ছুটি মঞ্জুর করা হয়।

চিঠিতে আরো জানানো হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবস্থানকালীন সময়ে তিনি ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ তারিখ এ বিভাগের যুগ্মসচিব (প্রশাসন)-এর ই-মেইল (js.admin@pd.gov.bd) মারফত জানিয়েছেন, তার শরীরের টিউমার সদৃশ স্কিন ট্যাগ ফেটে যাওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবস্থান করা প্রয়োজন ফলে ইতোপূর্বে মঞ্জুরিকৃত ৮৮ দিনের অর্জিত ছুটিকে (১৫-০৯-২০২৪ থেকে ১২-১২-২০২৪ তারিখ) বহিঃবাংলাদেশ ছুটিতে রূপান্তরের আবেদন জানান। পরবর্তীতে তার আবেদন মাননীয় উপদেষ্টার নিকট উপস্থাপন করা হলে তা অনুমোদনের পূর্বেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৭ অক্টোবর, ২০২৪ তারিখের ৮৮৪ নম্বর প্রজ্ঞাপন মোতাবেক ২১ অক্টোবর, ২০২৪ তারিখে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-এ যোগদানের নির্দেশনা প্রদান করা হয় অন্যথায় ঐদিন অপরাহ্ণ হতে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (Stand Released) বলে গণ্য হবেন। ফলে তার বহিঃবাংলাদেশ ছুটির আবেদন মঞ্জুর করা সম্ভব হয়নি।

বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে আরো জানানো হয়, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের স্মারক নম্বর: ০৩.১৪.২৬৯২.৮৭৬.০৩১.২৩৬.২০.১০৩২; তারিখ: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ মোতাবেক জানা যায় যে, উল্লিখিত দপ্তরে সদস্য পদ শূন্য না থাকায় দায়িত্ব প্রদান ও বেতন ভাতা প্রদান করা সম্ভব নয় মর্মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের iBass++ পর্যালোচনায় দেখা যায় তিনি সেপ্টেম্বর/২০২৪ মাস হতে এ বিভাগের বাজেট থেকে বেতন ভাতা গ্রহণ করছেন না এবং ৩০ আগস্ট, ২০২৪ তারিখ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গমনের পর এ বিভাগে যোগদান করেননি।

অন্যদিকে, মীর নাহিদ আহসান ডেসকোর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্বপালনকালে ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর ছুটি নিয়ে কানাডা যান। তিনিও সময়মত যোগদান না করায় বিভাগীয় মামলা দায়েরের উদ্যোগ নেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। এর অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর অভিযোগের বিবরণীসহ চিঠি পাঠানো হয়। এতে স্বাক্ষর করেন বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব ফারজানা খানম।

অভিযোগ বিবরণীতে বলা হয়, 
১/ মীর নাহিদ আহসান (পরিচিতি নম্বর-১৫২২৪), যুগ্মসচিব ও নির্বাহী পরিচালক হিসেবে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) লি. এ কর্মকালে বিদ্যুৎ বিভাগের ০২/১০/২০২৪ তারিখের ২৭.০০.০০০০.০৮৮.০৮.০১.০২৩.৬৩৪ সংখ্যক সরকারি আদেশের মাধ্যমে তাঁর অনুকূলে ১০/১০/২০২৪ হতে ০৩/১১/২০২৪ তারিখ পর্যন্ত অথবা ছুটি ভোগের তারিখ হতে ২৫ (পঁচিশ) দিনের বহিঃবাংলাদেশ অর্জিত ছুটি মঞ্জুর হওয়ায় তিনি ২২/১০/২০২৪ তারিখে দেশ ত্যাগ করে কানাডা গমন করেন; এবং

০২। তিনি ১৬/১১/২০২৪ হতে ১৫/১২/২০২৪ তারিখ পর্যন্ত আরও ৩০ দিন বহিঃবাংলাদেশ ছুটি বর্ধিতকরণের নিমিত্ত ১০/১১/২০২৪ তারিখে সচিব, বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বরাবর ইমেইল মারফত আবেদন করেন এবং উক্ত আবেদনের কপি ডেসকো'র ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ই-মেইলেও প্রেরণ করার পর ডেসকো লি. হতে ২১/১১/২০২৪ খ্রিঃ তারিখে বিদ্যুৎ বিভাগকে অবহিত করা হয়। তাঁর প্রার্থীত ১৬/১১/২০২৪ হতে ১৫/১২/২০২৪ তারিখ পর্যন্ত আরও ৩০ দিন বহিঃবাংলাদেশ ছুটি বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক অনুমোদিত না হওয়া সত্ত্বেও তিনি কর্মস্থলে যোগদান করেননি মর্মে ডেসকো লি. হতে ২০/০৩/২০২৫ তারিখের ২৭.২৪.০০০০.০০১.১২.০০১.২৫.৩৫৩ সংখ্যক স্মারক মারফত বিদ্যুৎ বিভাগকে অবহিত করা হয়; এবং

০৩। তাঁকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৮/১১/২০২৪ তারিখের ০৫.০০.০০০০.১৩২.১৯.২০৪.২৪ (অংশ-১)-১০৩৭ সংখ্যক প্রজ্ঞাপন মারফত পরিচালক, খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোতে বদলিপূর্বক প্রেষণে পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় কিন্তু অদ্যাবধি তিনি উক্ত বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করেননি; এবং

০৪। তাঁর অনুকূলে অনুমোদিত ২৫ দিন (২২/১০/২০২৪ থেকে ১৫/১১/২০২৪ তারিখ পর্যন্ত) এবং বহিঃবাংলাদেশ ছুটি বর্ধিতকরণের প্রার্থীত সময় ৩০ দিন উত্তীর্ণ হওয়ার পরও অদ্যাবধি তিনি কর্মস্থলে যোগদান করেননি অর্থাৎ তিনি অনুমোদিত ২৫ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি ভোগের পর অননুমোদিতভাবে ৬০ দিনের অধিক কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন;

০৫। তিনি আইনসংগত কারণ ব্যতিরেকে সরকারের আদেশ/নির্দেশ অবজ্ঞা করেছেন;

০৬। জনাব মীর নাহিদ আহসান (পরিচিতি নম্বর-১৫২২৪), যুগ্মসচিব ও নির্বাহী পরিচালক, ডেসকো লি. এর উপর্যুক্ত কার্যকলাপ সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩(খ) ও ৩(গ) অনুযায়ী যথাক্রমে 'অসদাচরণ' ও 'পলায়ন' কর্মে লিপ্ত থাকার পর্যায়ভুক্ত শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, ড. শেখ মনিরুজ্জামান এবং মীর নাহিদ আহসানের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য একাধিকবার চিঠি ও তাগাদাপত্র পাঠানোর পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এটি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ভুল বার্তা দিচ্ছে। এতে করে অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হবে। 

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাস্কুপকে জানান, যারা অনুপস্থিত রয়েছেন, চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাঈদ আহমেদ আসলাম রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাস্কুপকে বলেন, বিষয়টি আমি জানতাম না। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটিয়ে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিয়েছিলাম। ফ্যাসিস্ট সরকার বিগত ১৬ বছর ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি করে বাংলাদেশকে অপরিসীম দুর্ভোগে ফেলেছিল। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছে। এই সরকার কোনো রকমের অনিয়ম-দুর্নীতিকে প্রশয় দেয় না। 

শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ আসলাম আরো বলেন, আগামী ১৪ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে বিষয়টি আমি তুলব এবং সবার সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

বাংলাস্কুপ/বিশেষ প্রতিবেদক/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ