ঢাকা , রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন্ধের পথে দেশের একমাত্র ভেনম রিসার্চ সেন্টার

মহা সংকটে ৩৭০ সাপের জীবন!

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৭-০৯-২০২৬ ১২:৫৪:০৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৭-০৯-২০২৬ ১২:৫৪:০৮ অপরাহ্ন
মহা সংকটে ৩৭০ সাপের জীবন! ফাইল ছবি
দেশের একমাত্র গবেষণা কেন্দ্রের (ভেনম রিসার্চ সেন্টার) ৩৭০ বিষধর সাপের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন গবেষকরা। সাপের বিষ থেকে প্রতিষেধক তৈরির এই গবেষণা কেন্দ্রটি অর্থের অভাবে বন্ধ হওয়ার পথে। এ অবস্থায় গবেষকদের কাছে একটি পথই খোলা রয়েছে, মারাত্মক বিষধর সাপগুলোকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু সেটিও মানুষের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। গবেষণা চালিয়ে যাবেন নাকি সাপ ছেড়ে দেবেন, সে বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে দুই মাসের মধ্যেই। একসঙ্গে এত সাপ মেরে ফেলাও বেআইনি।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ভবনের পাশে দুই হাজার বর্গফুটের এই সেন্টারে আট বছর ধরে গবেষণার জন্য লালনপালন করা হচ্ছে রাসেলস ভাইপার, পদ্মগোখরা, পিট ভাইপার, সবুজ বোড়ার মতো বিষধর সাপ। সাধারণত লোকালয়ে এসব সাপ খুবই বিরল। এ ধরনের সাপের কামড়ের পর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা না পেলে ছয় ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু অনিবার্য।

মুখ্য গবেষক অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষ জয় বলেছেন, ‘কয়েকবার সংশোধন করে ডিপিপি দিয়েছিলাম। এখনো তেমন কিছু বলার মতো সংবাদ নেই। আমরা চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছি। সাপের খাবার সরবরাহ করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। জানি না ভবিষ্যৎ কী হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ফোয়ারা তাসমীম বলেছেন, ‘ভেনম রিসার্চের একটা ডিপিপি জমা হয়েছে। অনেকগুলো ডিপিপি নিয়ে কাজ চলছে। আলাদা করে বলতে পারছি না, ওটা কোন পর্যায়ে আছে।’

শুধু সাপ নয়, এরই মধ্যে সংগৃহীত ১ কেজি ৭০০ গ্রাম সাপের বিষের কী হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে সরকারি অর্থ বরাদ্দ বন্ধ থাকায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। এতদিন ধারদেনা এবং নিজেদের পকেটের পয়সা খরচ করে এটি চালিয়ে নিয়েছিলেন গবেষকরা।

ভিআরসিতে এখন ১১ প্রজাতির সাপের সংখ্যা ৩৭০টি। সাপের খাবারের জন্য ইঁদুর উৎপাদনের একটি বিভাগ রয়েছে। নিয়মিত তাদের খাবারের জোগান দিতে হয়। মুখ্য গবেষক ও সমন্বয়ক ছাড়া এখানে ছয়জন সহযোগী গবেষক ও কর্মী রয়েছেন। বেতন, গবেষণা কর্ম এবং সাপের খাবার— সবমিলিয়ে মাসে খরচ সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা।

২০১৮ সালে ভেনম রিসার্চ সেন্টারে (ভিআরসি) গবেষণা শুরু হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অপারেশনাল প্ল্যানের আওতায়। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সাপ ধরে আনা, সেগুলো প্রতিপালন, প্রজনন— সর্বোপরি বিষ সংগ্রহ চলছিল। রাসেলস ভাইপার সাপের বিষ থেকে প্রতিষেধক তৈরির একটি ট্রায়ালও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুন থেকে প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার অপারেশনাল প্ল্যানের বরাদ্দ বন্ধ করে দিলে এই অচলাবস্থা দেখা দেয়।

প্রায় আড়াই বছর নানা চেষ্টা তদবির করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারছেন না গবেষকরা। ভিআরসির সমন্বয়ক চমেক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ হতাশার সুরে বললেন, ‘এতদিন আমরা কীভাবে চলেছি, তা কেউ খোঁজ নেয়নি। এখানে যে কিছু প্রাণী রয়েছে— সাপ, ইঁদুরগুলো কীভাবে বেঁচে আছে, তা শুধু আমরা জানি। নিজেদের পকেটের টাকা, সামান্য অনুদান আর ধারদেনা করে এগুলো বাঁচিয়ে রাখা হয় কোনোরকমে।’

আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বললেন, ‘কর্মীদের বলে দিয়েছি চাকরি দেখতে। আগামী দুই মাসের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর মধ্যে আমাদের দেনা বেড়ে ৩৫ লাখ টাকা হয়েছে। বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে নেওয়া ধার বাদ দিলাম। সবচেয়ে বড় কথা সাপগুলোর কী হবে। এগুলো মেরে ফেলা যাবে না। বন-জঙ্গলে ছেড়ে দিলে মানুষের জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে। আর এগুলো যেহেতু আবদ্ধ ছিল, তাই প্রকৃতি থেকে খাবার সংগ্রহ করতে পারবে না।’

সংকট নিরসনের জন্য প্রায় এক বছর আগে একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছিল। উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে গণ্য করার ডিপিপি স্বাস্থ্য থেকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এরপর থেকে তা থমকে রয়েছে।

১৭০০ গ্রাম বিষের গন্তব্য ও সাফল্য: ভিআরসি এরই মধ্যে বিভিন্ন সাপ থেকে ১ কেজি ৭০০ গ্রামের মতো বিষ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করেছে। পর্যায়ক্রমে এসব বিষ থেকে গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা। কিন্তু সেন্টার বন্ধ হয়ে গেলে সাপের মতো বিষের গন্তব্য কী হবে, তা জানা নেই গবেষকদের।

আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বললেন, ‘গবেষণার জন্য এত বিষ অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য ও দামি। শেষপর্যন্ত এগুলো কী হবে জানি না। অথচ আমরা রাসেলস ভাইপারের বিষ থেকে সাফল্য পেয়েছি। এরই মধ্যে রাসেলস ভাইপার সাপের বিষ সংগ্রহ করে তা মুরগির শরীরে ট্রায়াল দেওয়া হয়েছে। তাতে প্রাথমিক সাফল্যও মিলেছে। গবেষণা পরিকল্পনাসহ এই রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ের ইন্টিগ্রেটেড হেলথ উইংয়ে জমা দেওয়া হয়েছে ছয় মাসেরও বেশি আগে। সেখান থেকে কিছু জানানো হয়নি। যে কারণে পরবর্তী ধাপগুলো থমকে আছে।’

অনিরুদ্ধ ঘোষ বললেন, ‘মুরগির শরীরে রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিবডি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। প্রচলিত অ্যান্টিভেনমের মতোই এটি কার্যকর। মূল্যায়ন শেষ হলে পরবর্তী ধাপগুলোয় এগিয়ে যাওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য প্রজাতির বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরির কাজ চলার কথা ছিল। কিন্তু এখন তা অনিশ্চিত।’

দেশে প্রতি বছর ৪ লাখ মানুষকে সাপে কাটে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মারা যায়। আমাদের দেশে যে অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করা হয়, তা ভারতের। সাপের ভৌগোলিক পরিবেশ এবং প্রজাতিগত ভিন্নতার কারণে সব সময় এসব ওষুধ কাজ করে না। এজন্য দেশে বিচরণকারী সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরির কাজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন গবেষক ও চিকিৎসকরা। সূত্র: আগামীর সময়

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ