চাঁচড়ার বাবলাতলা মাছের হাট
পাঁচ ঘণ্টায় ২ কোটি টাকার রেণু-পোনা বিক্রি
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৬-০৯-২০২৬ ০৩:৩৮:৫৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৬-০৯-২০২৬ ০৩:৩৮:৫৩ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
পূর্ব আকাশে তখনো আলো ফোটেনি। এরই মধ্যে যশোরের চাঁচড়া বাবলাতলায় সড়কের দুই পাশে বসে গেছেন শত শত মাছের পোনা বিক্রেতা। বড় বড় হাঁড়িতে নানা প্রজাতির মাছের পোনা নিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় তারা। কেউ পোনা দেখছেন, দামদর করছেন। কেউ আবার পোনা গুনে অক্সিজেনভর্তি ব্যাগে তুলে দিচ্ছেন ক্রেতার হাতে। ভোরের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঁকডাকে জমে ওঠে দেশের অন্যতম বড় এই রেণু-পোনার মোকামে।
প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যেই মূল বেচাকেনা শেষ হয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতিদিন এই মোকামে অন্তত ২ কোটি টাকার মাছের পোনা বেচাকেনা হয়। তাদের হিসাবে, দেশের মোট রেণু-পোনার চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ এখান থেকে সরবরাহ করা হয়। এ বাণিজ্যকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন ২ হাজার মানুষ। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সড়কের পাশে চলে পোনা কেনাবেচা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর শহরতলীর চাঁচড়া ও আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাধিক ছোট-বড় হ্যাচারি। এসব হ্যাচারিতে প্রতিবছর রুই, কাতলা, মৃগেল, কই, শিং, টেংরা, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু ও পোনা উৎপাদন হয়। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর এসব পোনা ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
বর্তমানে চাঁচড়া বাবলাতলার মোকামে সক্রিয় ব্যবসায়ী রয়েছেন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ জন। প্রতিদিন ট্রাক, পিকআপ, বাসের ছাদ এমনকি ট্রেনেও করে পোনা পাঠানো হয় ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বরিশাল, ভোলা, ফরিদপুর ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। এই মোকামের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে আরও অন্তত ২ হাজার মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শিং মাছের পোনা প্রতি হাজার ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, টেংরা প্রতিটি দেড় টাকা, তারা বাইন প্রতিটি তিন টাকা, স্বরপুঁটি প্রতি হাজার ১ হাজার ৫০০ টাকা, চিতল প্রতিটি ৬০ টাকা এবং থাই পাঙ্গাস প্রতিটি তিন টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মিনারকার্প প্রতি কেজি ৮০০ টাকা এবং পাবদা প্রতি হাজার ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া রুই প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, মৃগেল ২২০ থেকে ২৮০ টাকা, কাতলা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং সিলভার কার্প ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত বাড়ায় মাছ চাষিদের মধ্যে পোনা কেনার আগ্রহ বেড়েছে। ফলে মোকামে ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনাও বেড়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
যশোর জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে জেলার হ্যাচারিগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির মোট ৪৭ হাজার ১৫৭ কেজি রেণু উৎপাদন হয়েছে। জেলার নিজস্ব চাহিদা ছিল ১৯ হাজার ৩১৭ কেজি। চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত ২৭ হাজার ৭৩৪ কেজি রেণু-পোনা দেশের অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা হয়েছে।
তবে জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির হিসাবে, চাঁচড়া ও আশপাশের এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক হ্যাচারি রয়েছে। যশোর জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ফিরোজ খান বলেন, আশির দশকে যশোরে বাণিজ্যিকভাবে মাছের রেণু উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে জেলার হ্যাচারিগুলো থেকে প্রতিদিন ২ কোটি টাকার রেণু-পোনা বিক্রি হচ্ছে।
শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারেও এগিয়ে যাচ্ছেন এখানকার উদ্যোক্তারা। গুণগত মানের রেণু উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও পানি সাশ্রয় এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় মৎস্য পদক (স্বর্ণপদক) পেয়েছেন যশোরের হ্যাচারি ব্যবসায়ী আমিরুল হক।
চাঁচড়া ডালমিল এলাকার ন্যাশনাল ফিশ হ্যাচারির এই স্বত্বাধিকারী জানান, গত অর্থবছরে তার হ্যাচারিতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা মূল্যের ১০ হাজার কেজি রেণু উৎপাদন হয়েছে। সোলার প্যানেল ব্যবহারের কারণে তার হ্যাচারিতে বিদ্যুৎ খরচ প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি পানি পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির অপচয়ও কমানো হচ্ছে।
যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, যশোরের হ্যাচারি শিল্প দেশের মৎস্য উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, শহরের চাঁচড়া এলাকায় ৮০ শতক জমির ওপর ১৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক মাছের পোনা বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে পোনা উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয়সহ আধুনিক মানের নানা সুবিধা রয়েছে। তবে সেখানে পোনা ব্যবসায়ীরা বরাদ্দ নিচ্ছেন না। সেখানে ব্যবসায়ী ও পোনা উৎপাদকরা গেলে এ খাতটি আরও সম্প্রসারণ হবে।
তিনি আরও বলেন, পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটির নিচতলার ১১ হাজার বর্গফুট জায়গায় কার্পজাতীয় মাছের পোনা বিক্রির জন্য ৩২০ বর্গফুটের ৫১টি সিস্টার্ন (হাউজ) নির্মাণ করা হয়েছে। সিস্টার্নে পানি শাওয়ারিং ও অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। দেশী প্রজাতির ছোট মাছের পোনা বিক্রির জন্য দোতলায় ৭ হাজার ৯০০ বর্গফুট জায়গা রয়েছে। সেখানে ৭০ জন ব্যবসায়ী বড় হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে পোনা বিক্রি করতে পারবেন। মাছের গাড়ি সরাসরি দোতলায় নেওয়ার জন্য র্যাম্প পদ্ধতির সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য স্বয়ংক্রিয় জেনারেটরও স্থাপন করা হয়েছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও জায়গা বরাদ্দ নিতে বিক্রেতারা আগ্রহ দেখাননি। তারা রোদ-বৃষ্টিতে পুড়ে ওই সড়কের পাশেই কেনাবেচা করছেন।
যশোর মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দীন চৌধুরী সুমন বলেন, এখানকার পোনার মান ভালো হওয়ায় সারা দেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সমস্যা ও পরিবহন জটিলতা এ খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে যশোরের হ্যাচারি ও রেণু-পোনা ব্যবসা আরও বিস্তৃত হবে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স